ধর্ষণ ও বিয়ে: প্রসঙ্গ বাংলাদেশ

অর্পিতা শামস মিজান:

বাংলাদেশে ধর্ষণের যে বাজে অবস্থা তাতে কী করা যেতে পারে তা সম্পর্কে আলোচনায় এমন আলাপ উঠে এসেছে যে তাড়াতাড়ি ছেলেমেয়ে সবার বিয়ে দিয়ে দেয়া উচিত।

আলাপ ১: বিয়ে ধর্ষণ থামাবে।

বিয়ে ধর্ষণ থামাতে পারে না কারণ-

১। ধর্ষণ যৌন আকাংক্ষার কোন বিষয় নয়, এটা ক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়। এখন এই ক্ষমতা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, লিঙ্গ বৈষম্যের ফলে সৃষ্ট পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা যেকোনটাই হতে পারে। যেমন বৃটিশরা যখন ভারতীয়দের বা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনি বাংলাদেশী নারীদের ধর্ষণ করেছে, তা যৌনাকাঙ্ক্ষায় না বরং ক্ষমতা দেখাতে। এ কারণে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে হেরে যাওয়া বা বিরোধী পক্ষের দলের নারীদের, আত্মীয়াদের ওপর হামলা করা হয়। নাৎসি ক্যাম্পে প্রচুর ইহুদি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, কারণ জার্মানরা তাদের গর্ভধারণের মাধ্যমে শিশু ভূমিষ্ঠ করতে চাইতো। লাতিন আমেরিকায় নারীদের সাদারা ধর্ষণ করেছিল যেন ক্রিওলের মাধ্যমে লাতিন পুরুষদের চিহ্নকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়। নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, এমনকি তুষার যুগের আগে গোত্র ভিত্তিক যে সমাজ, যেখানে যৌন মিলন আজকের তুলনায় অবারিত ছিল, এমনকি ৮-১০ বছরের শিশুরাও যৌনাচারের নকল করতো, সেই সমাজেও ধর্ষণ ছিল।

২। এই কারণেই পুরুষ পুরুষকে ধর্ষণ করতে পারে। ধর্ষণ মানে আপনার শরীরের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণকে চরমভাবে লঙ্ঘন করা, এই লঙ্ঘনের অপমান সাংঘাতিক। সেই অবদমনের জন্যই ধর্ষণ করা হয়।

৩। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে চেনে না, জানে না এমন নারীকে একজন পুরুষ কেন ধর্ষণ করবে? এখানেও ক্ষমতা। পুরুষতান্ত্রিকতা শেখায় যে পুরুষই মানুষ, নারী আসলে দমিয়ে রাখার জিনিস, সে মানুষ না, মেয়ে মানুষ। তাই আমার যদি একটা মেয়ে দেখে মনে হয়, আরে একে নিয়ে তো রগড় করা যায়, তো আমি ধর্ষণ করবো। ঠিক যে কারণে রাস্তার কুকুরকে, পুকুরের ব্যাঙকে মানুষ ঢিল মারে, সেই একই মনস্তত্ত্ব।

৪। পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার আরেক সমস্যা হলো, এমন সমাজে কোন অবহেলিত, জীবনযুদ্ধে জর্জরিত পুরুষ যখন দেখে একজন নারী তাঁর চেয়ে এগিয়ে গেছে, তার পৌরুষ তখন জেগে উঠে এবং বলে, এই মেয়েকে তাঁর জায়গা দেখিয়ে দেয়া উচিত। আমি চাকরি পাই না, আর এই খা** চাকরি করে? দেশ বিদেশ ঘুরে? দেখি তো তোর শরীর নষ্ট করে, তখন তোর কয় পয়সা দাম থাকে?

৫। পুরুষতন্ত্র শেখায় নারীর সম্মান তাঁর ভ্যাজাইনা/ যোনিপথে। তাই ধর্ষণকামী পুরুষ ভাবে ধর্ষণ করতে পারা মানে জিতে যাওয়া, দমন করা, কে আসল ক্ষমতার অধিকারী তা দেখিয়ে দেয়া।

আলাপ ২:  কম বয়সে অর্থাৎ ১৮ এর  নিচে কিশোর-কিশোরি অবস্থাতেই (বাল্য) বিবাহ দেয়া উচিত।

১। বাল্যবিবাহ যে মতান্তরে ধর্ষণের সামিল, সেটা মানুষের মাথায়ই আসে না। বাল্যবিবাহ হলেও ধর্ষণ থামবে না, কারণ যৌন মিলন কেবল তখনই মিলন যখন উভয় পক্ষের সম্মতি থাকে। একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক, সে যদি ১৭ বছরের-ও হয়, সেক্ষেত্রে সে জেনে বুঝে সম্মতি দিতে পারে না। সম্মতি যদি না থাকে, তাহলে তা ধর্ষণ। আমাদের দেশে মান্ধাতার আমলের আইনে বলা আছে স্ত্রীর বয়স ১৩ এর কম হলে বৈবাহিক মিলন ধর্ষণ হবে, যার মাধ্যমে বাল্যবিবাহের একরকম স্বীকৃতি দেয়া হয়। পৃথিবী যেখানে এগিয়ে গিয়েছে, সেখানে আমরা বাল্যবিবাহ থামানো না, উলটো ধর্ষণ থামানোর জন্য ধর্ষণকে বৈধতা দেয়ার আলাপে মত্ত!

২। কচি মেয়ের সাথে মুশকো জোয়ান বা কাছাকাছি দুই কিশোর-কিশোরী,সবরকম বাল্যবিবাহই অপরাধ। কেন? বাল্যবিবাহের মাধ্যমে একজন শিশু (মতান্তরে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির) স্বার্থহানি হয়। বিয়ে এমন একটি সম্পর্কে যার সাথে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক দায়দায়িত্ব জড়িত। বিয়ের মাধ্যমে যৌনমিলন বৈধতা পায়, কাজেই বাল্যবিবাহের পর যৌনমিলন অপরাধ ভাবা হয় না। অথচ চিকিৎসাশাস্ত্র বলে যে কৈশোরে মানুষের শরীর যৌন মিলনের প্রতিক্রিয়ার জন্য পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয় না। এটি মেয়েদের জন্য বেশি প্রযোজ্য। ঋতুবতী হলেই মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হয় বলে একটা কথা আছে। তারা এটা ভুলে যান যে ডিম্বাণু তৈরি মানেই যে গর্ভাশয় ভ্রুণ বইবার জন্য শক্তপোক্ত প্রস্তুত হয়েছে, তা না। অনেক মেয়ের নয় বছর বয়সে ঋতু হয়। ১০ এ বিয়ে দেই আমরা তাহলে, নাকি?

২। বিয়ে করলেই বাচ্চা নিতে হবে কে বললো?

যে পরিবার বাল্যবিবাহ সমর্থন করে, সে পরিবার জন্ম নিয়ন্ত্রণে আস্থা রাখে ? এর ফলে ঐ মেয়েটির নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ নষ্ট হচ্ছে, একটি কিশোর সময়ের আগেই দায়িত্বে জর্জরিত হয়ে যাচ্ছে, এটা আমরা ভাবি না। আমাকে একজন বললো, ওরা বন্ধুর মতো থাকবে, সংসার তো মা-বাপ চালাবে, তারা তো আছেই। তা মা-বাপ যদি সংসার চালায়, তাহলে ছেলের বিয়ে দিয়ে আরেকটা সংসার তৈরির কথা ভাবা কেন? আর আমাদের মতো সমাজে, মেয়ে (ঘরের বোউ) শুয়ে বসে খাচ্ছে, এটা মেনে নেবে শ্বশুরবাড়ি? বাক্যবাণে জর্জরিত করবে না? ঘরের বৌ শিক্ষার সুযোগ পাবে? চাকুরির সুযোগ পাবে? আর যদি বলেন, মেয়ের জন্য “স্বামীর’ টাকাই সব, তাহলে আপনি আসলে মেয়েদের হাতের মুঠয় রাখতে চান। আপনি ধর্ষণ নিয়ে চিন্তিত না, কারণ আপনি ভাবেন ধর্ষণ আসলে নারী স্বাধীনতার ফল।

৩। কম বয়সে বিয়ে দিলেই কিন্তু স্পাউসের প্রতি সহজাত ভালোবাসা জন্মায় না। ১৬ তে বিয়ে হলো, ২৪ এ মনে হলো এই মানুষের কথাবার্তা আমার ভালো লাগে না। তাছাড়া বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ হবে মানে তো এই না যে সারা বিশ্ব তা অনুসরণ করবে। পৃথিবী নিজের মতো এগোবে। বাল্যবিবাহ হওয়া মেয়ে/ ছেলে যদি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে, পড়াশোনা শিখে, পৃথিবী সম্পর্কে জেনে তাঁর বিয়ে কী বোঝার আগেই হয়ে যাওয়া বিয়ে থেকে থেকে মুক্ত হতে চায়, তখন? এমনকি ইসলাম ধর্মেও (রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কিনা তাই বললাম) খায়ের উল বুলঘ নামে একটা নিয়ম আছে, যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের পর প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে সুযোগ দেয়া হয়, চাইলে সে বিয়ে থেকে বের হয়ে আসবে। এখানে শর্ত থাকে যে যৌন সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। তা যারা বলছেন যে বিয়ে দিলে যৌনকাম চরিতার্থ হয়, কাজেই বিয়ে দিলে ধর্ষণ থামে, তারা ভাবুন যে কম বয়সে বিয়ে দিলে সেখানে যৌন সম্পর্ক না হওয়া বাস্তবসম্মত কিনা!

৪। বিয়ের দায়িত্ব নিতে পরিপক্ক হওয়া লাগে না, ১৮ এর কমে না হোক, ১৮ হলেই বিয়ে দেয়া উচিত

কম বয়সে নিজের সক্ষমতা, নিজের আশা আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে মানুষের ( এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদেরও) স্পষ্ট জ্ঞান থাকে না। ফলে কম বয়সে হওয়া বিয়েতে ক্ষমতার/ সমতার ভারসাম্য না থাকলে হয় দাম্পত্য কলহ, দাম্পত্য সহিংসতা হবে (যদি মেয়ে/ ছেলে অসহায় হয়, কারণ সহ্য করা ছাড়া সে কিছু করতে পারবে না), নয়তো বিয়ে ভাঙবে, নয়তো পরকীয়া হবে, কারণ মানুষ প্রকৃতিগতভাবে মুক্ত থাকতে চায়। যার সাথে ঘর করি, তার সাথে মন না মিললে কেবল শরীর দিয়ে তো বেশিদিন চলে না।

তো পরকীয়ার ক্ষেত্রেও পুরুষের সুযোগ বেশি, কারণ ছেলেদের বাইরে যাওয়ার, মেলামেশার সুযোগ মেয়েদের চেয়ে বেশি।

আরেকটা উত্তর হবে, মেয়েদের বেশি পড়াশোনা শেখানো উচিত না। তাই তো?

দেখুন, বিয়ের মধ্যেও কীভাবে ক্ষমতা চলে আসছে। বিয়ের সাথে ক্ষমতাই যদি না থাকে, তো যৌতুক আসল কীভাবে? দেনমোহর কত হবে এই নিয়ে বাজারের মতো দরাদরি হয় কেন? স্ত্রীধন কেমন হবে তা নিয়ে তর্ক হয় কেন?

বাংলাদেশীরা এবং বাঙ্গালিরা বিয়েপাগল। আমাদের সবকিছু বিয়েকেন্দ্রিক। পড়াশোনা কী নিয়ে করবো, কেমন চাকুরি করবো, কেমনভাবে কথা বলবো, চালচলন কেমন হবে, সবকিছুর পেছনে থাকে বিয়ে। “ওমা! ছেলেমানুষ ছবি আঁকবি? তা বৌকে খাওয়াবি কীভাবে? সেকী, মেয়ে মানুষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হবে? রাস্তার মিস্ত্রিগুলোর সাথে সারাদিন হাতাহাতি করবে? বিয়ে হবে কীভাবে?” এমনকি আমাদের সমাজে একদম ন্যাদা বাচ্চাদের ব্যাপারেও বিয়ে নিয়ে মজা করা হয়। কার বিয়েতে কী পরা হবে, কেমন অনুষ্ঠান হবে, তা বিয়ে ঠিক হওয়ার আগেই আলাপের বিষয়। অবস্থা দেখলে মনে হয়, মানব জীবনের পরম লক্ষ্য বিয়ে, মানবজীবনের মোক্ষলাভ কেবল বিয়ের মাধ্যমেই সম্ভব।

বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই, বিয়ে কেবল একটা উৎসব না, তার চেয়েও বড় কথা বিয়ে একটা বিশাল দায়িত্ব এবং এই দায়িত্ব যখন-তখন অপ্রাপ্তবয়স্কের ওপর চাপিয়ে দেয়া।

শেয়ার করুন:
  • 424
  •  
  •  
  •  
  •  
    424
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.