ধর্মীয় ছত্রছায়া কি মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে?

কাজী তামান্না কেয়া:

বাংলাদেশে অত্যন্ত অপরাধপ্রবণ এবং অনৈতিক একটা দেশ । এমন না যে এদেশে কোন আইন কানুন নেই, আইন আছে। তবে ধরা খেলে বিচার কাজ শেষ করতে দেরী হওয়া এবং আইনের ফাঁক ফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই অপরাধ করার প্রবণতা চলমান।
এতো গেল বিচারব্যবস্থার কথা। আবার সামাজিকভাবে ঘুষ, দুর্নীতি, মিথ্যে বলার মতো অপরাধকে অপরাধ বলে মনে না করা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার একটা বিরাট কারণ। এর বাইরে ধর্মীয় ব্যবস্থায় কি এমন কিছু আছে যা মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে? চলুন দেখে আসি।
বাংলাদেশে প্রচলিত ধর্মকে বলা হয় কমপ্লিট কোড অফ লাইফ অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এখানে পানি কীভাবে খাবেন তা যেমন বলা আছে, তেমনি বলা আছে কোন নিয়মে স্ত্রী সহবাস করবেন। শুধু তাই নয়, চুরির শাস্তি কী, হত্যার শাস্তি কী, সমকামিতার শাস্তি কী, সব উল্লেখ করা আছে। কোন কোন ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে, যেমন নারীকে দেখলে পুরুষ চোখ নিচে নামিয়ে রাখবে, আবার নারীদের জন্য বলা আছে ঢেকেঢুকে চলতে। বাস্তবে নারীরা ঢেকেঢুকে চললেও পুরুষরা কেন তাদের চোখ হেফাজতে রাখে না, সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। তেমনি চুরির শাস্তি, হত্যার শাস্তি থাকলেও এখন অব্দি সমাজ থেকে কেন চুরি বা হত্যা করা বন্ধ হয়নি, সেটা আর এক প্রশ্ন।
প্রচলিত ধর্মে পুরুষেরা মায়ের, বোনের, এবং মেয়ের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে। একজন পুরুষ তার জীবদ্দশায় কমপক্ষে তিনজন নারীর ইজ্জতের হেফাজতকারী হয়ে থাকে, তারপরও কেন বাংলাদেশে পুরুষরা ধর্ষকামী হয়? শুধু ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে পরিমাণ ছেলেদের বলাৎকার করা হয়, প্রকৃত সংখ্যাটা না জানলেও তার সংখ্যা অনেক বেশি এবং  বলাৎকারের ঘটনাগুলো অত্যন্ত বর্বর, বীভৎস্য এবং ভয়ঙ্কর। আবার আমাদের দেশে পুরুষেরা গৃহকর্মী নারীদের প্রতি, খালাতো, মামাতো বোনের প্রতি, নিজের শালীর প্রতি অর্থাৎ নিজ পরিবারের নারীদের প্রতি প্রচণ্ড রকমের কাম তাড়না বোধ করে । মানে যে দেশে শতকরা ৯০ ভাগের বেশী মানুষ ধর্ম কর্ম করেন, সেখানে অনৈতিক আচরনগুলো মানুষ কেন করছে?
আরো কিছু উদাহরণ দেই।
বাংলাদেশে কিছু কিছু সেক্টরে পাসপোর্ট অফিস, জিপিও, ব্যাংকিং সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় দুর্নীতি কিছুটা কমেছে। সেসব খবর আমরা পত্র পত্রিকায় প্রায়শই পাই। এরপরেও সরকারি কাজ কর্মে ব্যাপক ঘুষ দুর্নীতির অস্তিত্ব আছে। ঠিক একই সাথে মন্ত্রণালয়, কিংবা সরকারি অফিসগুলোতে অত্যধিক ধার্মিক কর্মচারি কর্মকর্তাদের ছড়াছড়ি। অফিস কম্পাউন্ডে বা অফিস বিল্ডিং এ নিশ্চিতভাবেই আপনি একটা মসজিদ পেয়ে যাবেন এবং অফিসে যে কাজের জন্যে যাবেন সেখানে আপনাকে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হবে, কারণ যারা কাজ করবেন তারা যোহরের নামাজ আর লাঞ্চের বিরতিতে গেছেন। এভাবে প্রতিটা অফিসে কাজে কর্মে স্থবিরতা দেখতে পাবেন।
শুধু সরকারি অফিসে কেন? ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি ডাকতে যান, সে নামাজে গেছে। ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলেন, সেও একই বিরতি নিয়েছে।  ভাবুন তো এর বিপরীত চিত্রটা – একজন খৃষ্টান পাদ্রী কিংবা পুরুত সরকারি অফিসে। বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কাজ ফেলে হাওয়া হয়ে গেছে নিজের বেহেস্ত নিশ্চিত করতে, আর আপনি বসে আছেন কখন তার প্রার্থনা শেষ হবে সেই অপেক্ষায়! তখন আপনিও মনে মনে উচ্চারণ করবেন – ফাক ইউ বাংলাদেশ!
যে কথা বলছিলাম, সারা বছর ঘুষ খাওয়ার পরেও রোজা এলে ঘুষ খাওয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে বেড়ে যায়। ধর্মের সাইন কপালে, থুতনীতে, মাথায় লাগিয়ে তারা দিব্যি চুরি, মিথ্যা বলা, প্রতারণা, ধর্ষণ, খাবারে ভেঁজাল দেওয়া, লোক ঠকানোসহ সব রকমের অপরাধ করে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে কেন তারা এমন আচরণ করেন? একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার ভিতর থেকেও তারা কেন সাধারণ স্বাভাবিক চিন্তা করা এবং সুস্থ সুন্দর জীবন-যাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
শুক্রবারে তাঁর দরবারে হাত তুললে সব অপরাধ মাফ হয়ে যায়-  ধর্ম থেকে প্রাপ্ত এরকম একটি সহজ সমাধান তাদের আরো বেশি অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ তারা বিশ্বাস করে তিনি দয়ালু, করুণাময় এবং ক্ষমা প্রদানকারী। তাই অপরাধ যাই হোক, অপরাধী ক্ষমা পাবে সুনিশ্চিত। এ রকম একটা বিশ্বাস যখন মাথার ভেতরে কাজ করে, তখন মানুষ অপরাধ করতে উদবুদ্ধ হবে না কেন, বলতে পারেন? এদেশে দাড়ি-টুপিওয়ালা সরকারি কর্মচারি ঘুষ ছাড়া ফাইল এদিক ওদিক করবে না। ছোটখাটো তদবিরে লাখ টাকা চেয়ে বসবে, এবং রোজার দিনে  এইসব ধান্ধাবাজী আরও বেড়ে যাবে।
শুধু কি সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তারাই অপরাধ প্রবণ হয়? না, সমাজের সর্ব স্তরে আপনি এদের পাবেন। মাথায় টুপি আছে এমন মাছওয়ালা আপনাকে নির্দ্বিধায় পঁচা মাছ গছিয়ে দেবে। হিজাব, বোরকা পরা নারী শপিং এ এসে দোকানের মাল দিব্যি চুরি করে নিয়ে যাবে। বিদেশের দোকানগুলোতে এরকম পোশাক পরাদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হয়। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা আছে। ভিজিএফের চাল, দুস্থ ভাতা, বয়স্ক ভাতার টাকা আপনার চোখের সামনে হাপিশ করে দেবে চেয়ারম্যান- মেম্বাররা।
কিছুদিন আগের কথা। করোনার সময় দুস্থ পরিবারগুলোর সহায়তায় সরকার আড়াই হাজার করে টাকা দিয়েছিল। সেই টাকা নিয়ে কী পরিমাণ কেলেংকারি এবং জালিয়াতি হয়েছে তা সকলের মনে আছে। আবার করোনা টেস্ট নিয়ে তো মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতোন অপরাধও সংঘটিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ সমাজে এমন কোন স্তর নেই যেখানে আপনি অপরাধ এবং অনৈতিক মানুষ পাবেন না। আবার সেই একই সমাজে এমন কোন সেক্টর পাবেন না যেখানে সাজার ভয়ে বা ধর্মে নিষেধ আছে, তাই লোকে অপরাধ করছে না।
প্রচলিত ধর্মে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কিংবা প্রযুক্তি নয়, ব্যবসা করাকে উৎসাহিত করা হয়েছে । সকালে ঘুম থেকে উঠা হতে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের অসংখ্য জিনিসের দরকার হয়। সেগুলোর জন্যে টাকার দরকার হয়। এখন শিক্ষা-দীক্ষা, এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান না থাকলে আপনি কেমন করে টাকা উপার্জন করবেন?  শুধু ধর্মগ্রন্থ মুখস্থ করলে তো  কেউ আপনাকে চাকরি দেবে না। আর দিলেও খুব ছোট লেভেলের চাকরি। ছোট চাকরিতে বেতন তো আর আহামরি হবে না। সবাই ব্যবসায় নামলে, লাভের পরিমাণ যাবে কমে।  টাকা না থাকলে বাধ্য হয়ে আপনি একসময় অন্যায়ের পথে পা বাড়াবেন। পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায় মাদ্রাসার শিক্ষক ইয়াবা চোরাচালানে জড়িত টাইপ খবর। ওদিকে স্ত্রীকে বাইরে কাজ করতে দিচ্ছেন না, সন্তান আছে কয়েকজন, আছে বৃদ্ধ বাবা-মা, অবিবাহিত ভাই-বোনের দায়িত্ব। তাদের খাওয়াতে যে টাকা লাগে তখন আপনি বাধ্য হয়ে ব্যবসায় অধিক মুনাফা করতে চাইবেন,  ঘুষ খাবেন, লোকজনকে ফাঁপড়ে ফেলে টাকা কামাতে চাইবেন।
এরপর আসি বিয়ে এবং নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায়। ধর্মের পরতে পরতে আছে কম বয়সী নারী বিয়ে করা, বহু বিবাহ এবং দাসী সেক্সের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।  ধর্ম প্রচারকদের এবং তার মনোনীত ব্যক্তিদের জীবনে এসব উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে এবং সেসব উদাহরণ অনুকরণীয় নয়, এমন কথা ধর্মগ্রন্থ উল্লেখ করা হয়নি। তাই যুগের পর যুগ ধরে, কম বয়সী নারী বিয়ে করা, বহুবিবাহ করা, কাজের মেয়েদের সাথে সম্পর্ক করার প্রবণতা রয়ে গেছে।  শুধু নিরাপত্তার অভাবে বা গরীব বাবা-মা খাওয়াতে পারছে না, সেই কারণে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। বরং বয়স বাড়লে ভালো পাত্র পাওয়া যাবে না, এই কারণটার সাথে কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার একটা বিরাট যোগ সাজশ আছে।  এছাড়াও সমাজে আছে বহু বিবাহের সমস্যা, লুকিয়ে চুরিয়ে রক্ষিতা রাখার স্বভাব, কিংবা নিজ পরিবারের ভাবী-মামী সম্পর্কীয় নারীদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখার প্রবণতা।
শুধু বিচার হচ্ছে না, লোকে শাস্তি পাচ্ছে না, সেই কারণে অপরাধ এবং অনৈতিকতা –দুই দুইটা সমস্যা আজঅকের পর্যায়ে আসেনি। তেমনি সকল রকম অপরাধ এবং অনৈতিকতা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও করছে না। সমাজের সর্ব স্তরের মানুষ একই রকম আচরন করছে। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, এখনো যারা অপরাধ বা অনৈতিক আচরণ করেনি, তারা হয় সুযোগ পাচ্ছে না অথবা তাদের দ্বারা সংগঠিত অপরাধ প্রকাশ পায়নি।
অপরাধ কমাতে হলে রাষ্ট্রকে ধর্ম এবং সংবিধান আলাদা রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় আইন ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হলে নাগরিকের কল্যাণে রাষ্ট্রের আইনকেই প্রাধান্য দিতে হবে। সেই সাথে অপরাধের শাস্তি দ্রুততম সময়ে নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মান্ধ সমাজে গোয়ার্তুমি লক্ষ্য করা যায়, থাকে আইন ভাঙ্গার প্রবণতা।  মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত একটি স্বাধীন দেশে  সুস্থ সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে হলে ধর্মান্ধতাকে নিশ্চিহ্ন করার কোন বিকল্প নেই। ধর্ম থাকবে ব্যাক্তি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ ধর্মের প্রভাবের বাইরে রাখতে হবে।
লেখক পরিচিতিঃ
Kaji Tamanna Keya, MS, MPS
Doctoral candidate
Arnold School of Public Health
University of South Carolina, USA
Email: [email protected]

 

(উইমেন চ্যাপ্টারে প্রতিটি লেখার দায়-দায়িত্ব একান্তই লেখকের, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন)

শেয়ার করুন:
  • 281
  •  
  •  
  •  
  •  
    281
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.