এই ভাতার সমাজ এবং রাষ্ট্রের মুখে আমি কষে লাত্থি মারি

সামিনা আখতার:

বেগমগঞ্জের নারী নির্যাতনের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর বাংলাদেশের একটা মানুষও কি বলেছে যে এই ঘটনাটি ঘটেছে নারীটির পোশাকের কারণে?

সাধারণভাবে আবালরা নারীর পোশাককেই ধর্ষণের কারণ মনে করলেও নারী নির্যাতনের এই ভিডিও দেখার পর বাংগালী অন্তঃতপক্ষে এইটুকু বুঝেছে যে ধর্ষণ বা নির্যাতন শুধু কাপড় দিয়ে ঠেকানো যায় না। মানুষের সামনে এটিও খুব স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন হচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে অপক্ষমতা প্রদর্শনের একটি মারাত্মক অস্ত্র। বেগমগঞ্জের সেই নারীটি রাষ্ট্রর অপক্ষমতার ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা সেইসব মাস্তানদের কথা শোনেনি, যার পরিণতি ছিল এই ভয়াবহ নির্যাতন। বেগমগঞ্জ ভিডিও হচ্ছে একটি ব্যর্থ- দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র এবং সরকারের জলন্ত প্রমাণ।

অথচ দেখুন বাবুনাগরী কী বলেছে?
তার কথা হচ্ছে, ধর্ষণ আর নারী নির্যাতন রোধে পর্দাকে বাধ্যতামূলক করা হোক।

তা, কী বুঝলেন? আপনার দৃষ্টিকে কোনদিকে ঘুরিয়ে দেয়া হলো বুঝলেন তো? আপনার দৃষ্টিকে সবসময় রাখা হবে নারীর শরীরের দিকে। এবং তাতে আপনি রাষ্ট্রের সমস্ত সেক্টরগুলো যারা গুরুত্বপূর্ণ অপকর্মগুলোর সাথে জড়িত, তার দিকে খেয়াল না করে, খেয়াল করবেন নারী কী কাপড় পরেছে, অথবা পরে নাই তার দিকে! আর আমাদের মতো আবালের দেশে এই নারী ইস্যুর বাজার দর যে অন্য ইস্যুর চাইতে বেশি এইটা ব্যবসায়ীরা ভালো করেই জানেন। আর সেজন্যই অনলাইনে ভেসে যাওয়া হাজার হাজার ওয়াজের ভিডিওতে নারী ইস্যুর মতো মুখরোচক ইস্যু আর কোনটাও পাবেন না। আর এই যে সেই কোন কাল থেকে এই হাজার হাজার ওয়াজ শুনে আসছি তার ফল কী হয়েছে বাংলাদেশে? দুর্নীতি কমেছে? ঘুষ কমেছে? খাদ্যে ভেজাল কমেছে? যৌতুক দেয়া-নেয়া কমেছে? মাদক ব্যবসা কমেছে? এইসব কি ধর্মীয় ইস্যু নয়?

কিন্তু ধর্মীয় উন্নয়ন হয়েছে একটাই। সেটা হলো নারীর পোশাক বদলেছে। তো, কী বুঝলেন?
নারী শরীর হচ্ছে ব্যবসার বিশাল মাধ্যম। ব্যবসা করপোরেট সেক্টরও করে, ধর্ম ব্যবসায়ীরাও করে। কেউ উলংগ করে, কেউ মোড়াইয়া রাখে। কিন্তু প্রডাক্ট একটাই, নারী শরীর। এই দুটো সেক্টরই নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য্য আর যৌন অংগগুলোর দিকে এতোটাই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে যে পুরো জনগোষ্ঠী ভুলে যায় নারী হচ্ছে মানুষ এবং তার একটা বিশাল মস্তিষ্কও আছে। যা ব্যবহার করে সে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীও হতে পারে।

নারী কী পোশাক পরেছে না পরেছে এই নিয়াই আপনি ব্যস্ত থাকেন। অথচ রাষ্ট্র/সরকার তার পোষা মাস্তান দিয়ে আপনার ঘরের নারীর পরনের পোশাক টেনে খুলে উলংগ করে ছেড়ে দিয়েছে, আপনার খবর নাই!

আপনার কী মনে হয়, বাবুনাগরী এইটা বোঝে না যে বেগমগঞ্জসহ হাজার হাজার ধর্ষণে এইটা প্রমাণিত যে ধর্ষণ নারীর পোশাকের কারণে হয় না। বরং রাষ্ট্রের বিচারহীনতা, আইনের শাসনহীনতাই এর জন্য দায়ী! শোনেন, এইটা একটা শিশুও বোঝে। কিন্তু ধর্ম ব্যবসা বলে কথা। ব্যবসায় অনেক মিথ্যা কথাকে সত্য বানাতে হয়। আর সেই মিথ্যাকে বার বার প্রচার করতে হয়। আবার সেই ব্যবসাকে ঠিকঠাক মতো চালাইতে হইলে তো সরকারের সাথেও বনিবনা করে চলা লাগে, তাই না? তাই সরকারের বিরুদ্ধে কোন কথা নাই। অন্যদিকে নারীর পোশাককে দায়ী করলে তো অসংখ্য আবাল অনুসারীকে ঠিক রাখা গেল। এভাবে গাছেরটাও খাওয়া গেল, তলারটাও কুড়ানো হয়ে গেল।

নারীর পোশাকই যদি ধর্ষণের কারণ হতো, তাহলে এই যে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডায় যত বাংগালী আছে তারা এইসব দেশের নারীদেরকে সারাদিন শুধু ধর্ষণ করতে থাকতো, অথবা সামলাইতে না পারিয়া নিজের দণ্ড লইয়া দৌড় দিত বাংলাদেশ। কিন্তু এসে দেখে যান, অথবা এইসব দেশে থাকা নারীদের কাছে জেনে নিন তারা কেমন আছে! এইসব দেশেও ধর্ষণ যে একেবারেই নেই তা নয়, কিন্তু এর জন্য নারীর পোশাককে কেউ দায়ী করে না। এটি্কে একটি মারাত্মক ক্রাইম হিসাবেই গণ্য করা হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ব্যবসার কথা কারও অজানা নয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে ভিত্তির উপর ভর করে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল তা তেমনভাবে চললে আমরা একটা উন্নত আর শক্তিশালী রাষ্ট্র পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৭৫ পরবর্তী সমস্ত সরকারকে আমরা ধর্ম নিয়ে রাজনৈতিক গেম খেলতে দেখেছি। পঁচাত্তর পূর্ববর্তী না হলেও সাম্প্রতিক আওয়ামী সরকারও এই গেমের বাইরের থাকতে পারেনি। অথচ এই দীর্ঘ সময়টাতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটাও প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়নি বরং দিন দিন কংকালসার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের বিতর্কিত ভোট এর জলন্ত প্রমাণ। এবং কংকালসার, দুর্নীতিগ্রস্ত সমস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রভাব জনগণের উপর মারাত্মকভাবে পড়ছে।

তাহলে কী বোঝা গেল, রাজনীতিতে ধর্ম বরাবরই ব্যবহার হয়েছে, হচ্ছে একটা ঢাল হিসাবে ভিতরে তাদের দুর্নীতিকে চাংগা রাখবার জন্য। এবং এই ব্যবস্থার মারাত্মক শিকার হয়েছে, হচ্ছে নারী।

এবার আসি মিডিয়ার দিকে। সারা বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে কোথায় কী হচ্ছে সেই খবরই তো মিডিয়া আমাদেরকে দেয়, তাই না?বেগমগঞ্জের এই ঘটনাটা ৩২ দিনেও কোন মিডিয়াতে আসেনি। তাহলে বাংলাদেশ সরকারের মতো তারাও তো ভাইরালের উপরেই নির্ভরশীল, তাই না? এখন আমাকে বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের মিডিয়াগুলোর হেডলাইন বেশীরভাগ কী দেখেন?সেখানে যৌন সুড়সুড়ির কিছু পান না? এমনকি অনেক হেডলাইনের সাথে ভিতরের খবরের কোন মিল নাই, পান নাই? এবং এক মিথিলাকে নিয়ে কত খবর পড়েছেন এ পর্যন্ত? এখানেও ব্যবসা জমজমাট নারীকে নিয়ে।

বেগমগঞ্জের সেই নারীকে মিডিয়ার সাক্ষাতকারটা কি দেখেছেন? সমস্ত পুরুষ সাংবাদিক কর্মীরা কীভাবে ঐ নারীকে বার বার জিজ্ঞেস করছে, এরপর কী হয়েছে, কী করেছে, ইত্যাদি। কী জঘন্য! এতো এক্সক্লুসিভ, এতো বিভৎস একটা ভিডিও দেখার পরও পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ চায় আরও কিছু দেখতে!

নারীর প্রতি মিডিয়ার নুন্যতম সম্মানবোধ এবং নিজের পেশার পেশাদারিত্বের ছিটেফোঁটাও কি আছে?
এরপর তাকাই র‍্যাব/পুলিশের দিকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিতীয় কথাটা মনে আছে তো, যেহেতু নারীটি পুলিশের কাছে বিচার দেয়নি, তাহলে পুলিশ কী করে জানবে! মনে হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানেনই না যে মানুষ কেন পুলিশ, প্রশাসন ইত্যাদির উপর আস্থা রাখতে পারছে না! ধর্ষক দেলোয়ারের সাথে র‍্যাব সদস্যের হাসিমাখা এক ছবি ভাইরাল হয়েছে। আপনার কি মনে হয় না, এই ছবিটা বেগমগঞ্জের ঐ নারীসহ সারা বাংলাদেশের মানসিকভাবে ভেঙ্গেপড়া সমস্ত নারীর বিরুদ্ধে অপমানের এক মারাত্মক ইংগিত?

এবার আসি আপনাদের দিকে, যারা এইটা পড়ার পর ঝাঁপাইয়া পড়েবেন কিছু শব্দের অস্ত্র নিয়া, বেশ্যা, বারোভাতারী ইত্যাদি।
শোনেন, এইসব গালি যে দিবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। কারণ আমরা তো এই মাকাল ফলের মতো (উপরে লাল চকচকা, ভিতরে পোকা) সমাজ আর রাষ্ট্রের চামড়া ধরে দুই হাত দিয়া টান মারতেছি। সুতরাং এর ভিতরের নোংরা, পোকা এইসব আমার হাতে মুখে ছিঁটে আসবেই।

নারীবাদিদের পান থেকে চুন খসলেই বলেন, বারোভাতারী। অথচ বেগমগঞ্জের সেই সহজ-সরল নারীসহ যেকোনো নারীর ভাতার হচ্ছে পুরা রাষ্ট্র, পুরা সমাজ। ভাত দেয়ার ভাতার নয়। কার ঘরে কোন পুরুষ আসলো কী আসলো না, কোন পোশাক পরছে কী পরে নাই এইসব দেখার ভাতার!

এই ভাতার সমাজ আর তার রক্ষক এই রাষ্ট্রের মুখে আমি কষে লাত্থি মারি!

শেয়ার করুন:
  • 180
  •  
  •  
  •  
  •  
    180
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.