এই অভিশপ্ত জনপদে অচিরেই কন্যা সন্তান জন্ম নেয়া বন্ধ হবে

তবিবুর রহমান:

“এই অভিশপ্ত জনপদে অচিরেই কন্যা সন্তান জন্ম নেয়া বন্ধ হবে” সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে একজন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনভাবেই হতাশার কথা ব্যক্ত করেছেন। আমরা সভ্যতার কথা বলি, কিন্তু সভ্য হই না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না।’ অপরাধ এবং অপরাধীর মুখোশে গোটা সমাজ-ব্যবস্থা আজ হুমকির মুখে পড়েছে।

মানুষ কেন অপরাধ করে? সমাজবিজ্ঞান কিংবা অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় বিভিন্ন ডাইমেনশনে এর ব্যাখ্যা রয়েছে। মূলত অপরাধ হচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যাধি এবং যার উদ্ভব ঘটেছে সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিলতা থেকে। জন্মগত কিছু বিষয়ও রয়েছে। পারিবারিক শিক্ষার অভাব, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, অবহেলা-তাচ্ছিল্য-নির্যাতন-ঘৃণার মধ্যে বেড়ে ওঠা এমনকি মস্তিষ্কে ‘সেরোটনিন’ নামক একপ্রকার নিউরো ক্যামিক্যালের ঘাটতি থাকলেও মানুষ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় অপরাধী যখন অপরাধ করে ধরা পড়ার পরও অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধার দ্বারা অপরাধকে ঢেকে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে।

কারা অপরাধ করে? অপরাধীর কোন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নেই। এসময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নজর দিলে বিশেষ করে নারীদের ওপরে বর্বরোচিত যৌন সহিংসতা নিয়ে বিশ্বে বিভিন্ন দেশ আজ উত্তাল সময় পার করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এক দলিত নারীরে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। শুধু ধর্ষণ করে হত্যা করাই হয় নি, তার জিহ্বা কেটে ফেলা হয়েছে যাতে সে ধর্ষণকারীর নাম উচ্চারণ করতে না পারে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে এই ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দল এবং প্রশাসন এক হয়ে মিথ্যাচার প্রচার করছে। মৃত্যুর পর ভুক্তভোগীর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। দ্বিতীয় ঘটনা বাংলাদেশের সিলেটে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্ররাজনীতির সমর্থক দ্বারা নারী ধর্ষণের ঘটনা সারা দেশে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এর পরপরই নোয়াখালীতে নারী নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হলে জনমনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। আসলে কারা এবং কেন এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে?

যদি কখনও কারও দেশের সরকারি হাসপাতালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেটারে যাবার সুযোগ হয় তখন এর ভয়াবহতা কিছুটা হলেও উপলব্ধি হবে। পুরুষ দ্বারা নারী ধর্ষণের যেসব ঘটনা আমরা শুনে থাকি এর বাহিরেও এমন কিছু বিকৃত মস্তিস্কের মানুষ সকলের সামনে আসবে যেটি আপনার মনে গভীর রেখাপাত করবে। সৎ বাবা এমনকি নিজ পিতা কর্তৃক কন্যা ধর্ষণ, গৃহশিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী, জামাতা দ্বারা শাশুড়ী, ইমাম কর্তৃক শিক্ষার্থী, শ্বশুর দ্বারা গৃহবধূ, সহপাঠী দ্বারা সহপাঠিনী, ড্রাইভার কর্তৃক যাত্রী, চাচা কর্তৃক ভাতিজি অর্থাৎ কেউ বাদ নেই। আসলে নারীরা কোথায় নিরাপদ? নারীর ওপরে পুরুষের চরম বলপ্রয়োগ হচ্ছে ধর্ষণ। ইসলামের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে নারীদের যৌন হয়রানির শিকার হবার অভিযোগ আছে। গত শতাব্দীতে চার্চে শিশুদের ওপর যাজকদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে ২০১৫ সালে ‘স্পটলাইট’ নামে হলিউডে সিনেমা তৈরি হলে ৮৮তম একাডেমি পুরষ্কার আসরের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরষ্কারের মর্যাদা লাভ করে মুভিটি। এছাড়া ভ্যাটিকানসিটির সাবেক এক অর্থমন্ত্রী এবং পোপের শীর্ষ উপদেষ্টা শিশু যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী শিক্ষদের দ্বারা ছাত্রী হয়রানীর অহরহ অভিযোগ রয়েছে।

এখন আসি প্রতিকার নিয়ে। আসলেই কি প্রতিকার পাওয়া যায়? এর উত্তর আসলে নেই। আলোচিত না হলে প্রতিকার পাওয়া দুরূহ। ধর্ষণের সব সংবাদ প্রকাশ হয় না। সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে কিংবা ক্ষমতাসীনদের দাপটে চাপা পড়ে যায় সব। আবার কেউ সাহস করে মামলা করলেও আইন-আদালতে চরম ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলিউডের ‘পিংক’ মুভির ঘটনাপ্রবাহ দেখলেই সামান্য ধারণা আসবে যেখানে বোঝানো হয়েছে কতটা জটিল সমীকরণ এই ন্যায়বিচার।

সভ্যতার চূড়ান্ত শিখরে এসেও আমরা আধুনিকতা হতে যোজন যোজন দূরে। আমাদের আচরণ আদিম বর্বরতাকে হার মানায়। একটু চারপাশে তাকালেই আমাদের অসহায়ত্ব আমরা উপলব্ধি করি। মূলত আইনের শাসনের ব্যত্যয়ই এর মূলে কারণ। এছাড়া সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার অভাব তো রয়েছেই। দ্রুত এর সমাধান না হলে এর ব্যাপকতা সবকিছুকে গ্রাস করবে। আমরা অন্তঃসারশূণ্য এক সমাজ দেখবো যেখানে বস্তুগত উন্নয়ন আছে, কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন নেই।

লেখক,
শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.