এবার চলুন, ভাবনার কালো পর্দাটা সরাই …

সাবিরা শাওন:

সম্প্রতি সারাদেশে ধর্ষণ ও গা শিউরে উঠা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমাজের একটা (নির্দিষ্ট) শ্রেণির সরব ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলছে৷ তারা প্রতিবাদ স্বরূপ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তাদের সাধুবাদ জানাই ও ব্যক্তিগতভাবে তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছি।

এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও সবাই সরব এখন। এমনকি বর্তমানে প্রোফাইল পিকচার ব্ল্যাক করে দেওয়ার মাধ্যমে এই ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের জোরালো অবস্থান ঘোষণা করছে। এবং এই প্রতিবাদটাকেও সম্মান জানাই। কারণ আমাদের এক হওয়া জরুরি, ভীষণ জরুরি। সেটা না হয় ভার্চুয়াল জগত থেকেই শুরু হোক।

তবে আক্ষেপের জায়গা যে থেকেই যায়। অনেকদিনের জমানো ক্ষোভ আর অভিজ্ঞতা বলছে আমাদের এই আহাজারির শেষ যে এখানেই! কয়েকদিন পর সবার প্রোফাইলে আবার রঙিন ছবি ঘুরে ফিরে আসবে, অথচ এই প্রতিবাদ পরিণতি পাবে না। কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি পরিচর্যাকারীদের দেশে আর যাই হোক না কেন সুবিচার কেউ পায় না।

এবার তাই চলুন না নিজেদের ভাবনার কালো পর্দাটা একটু সরিয়ে দেখি। কোন মন্ত্রবলে আমরা এমন রাবণ লঙ্কার সীতা হয়ে উঠলাম?

তার আগে বলে নেই, আমাদের সরকারি নীতি নির্ধারকেরা যতদিন না উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন ততদিন পর্যন্ত আমাদের আহাজারির অপর নাম অরণ্য রোদন-ই থাকবে। তাই বলে আমরাও যে কিছু করতে পারি না তা কিন্তু নয়। আমরাও পারি।

সুপ্রিমিসি অথবা আধিপত্য শব্দটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু এই শব্দের বিস্তারে আমাদের ভূমিকাটাই শুধু অজানা। একমত না? আচ্ছা, দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন। কিন্তু একবার মিলিয়ে দেখুন তো..

★ নিজের ঘরের কাজে সাহায্য না করার জন্য মেয়েটাকে যতটা কথা শুনিয়েছেন তার কত অংশ আপনার ছেলেকে বলেছেন? বলেন নি তো! ফলাফল… অপেক্ষা করুন।

★ ছেলে মানুষ বাইরে থাকবে এটাই পৌরুষ। মানলাম। কিন্তু স্কুল কলেজ পড়ুয়া একটা ছেলে অনেকটা সময় বাইরে কাটাচ্ছে। কি করছে, কোথায় যাচ্ছে সে খোঁজ নিয়েছেন কখনো? নাকি অগাধ আস্হায় প্রশ্র‍য় দিয়েছেন দিনের পর দিন। হ্যাঁ, বলছি এর জন্য কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে!

★ একসাথে আপনার পুরুষ সঙ্গীটির সাথে কোথাও যাচ্ছেন। এইসময় পাশের হুড খোলা রিক্সায় খোলা চুলে শাড়ি পরা একটা মেয়েও যাচ্ছে। দু’হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। চোখে কাজল আঁকা। কী সুন্দর নির্মল একটা দৃশ্য!!! ঠিক এই সময় আপনার সঙ্গীটি বলে উঠলো, “ মাগী”। কী করেছেন তখন আপনি? হ্যাঁ, কী-ই বা করার আছে। পুরুষ মানুষ ওরকম এক আধটু করেই থাকে। এতে দোষের কী?

★ মেয়েকে রাস্তায় কোন বখাটে বিরক্ত করেছে শুনলে কী করেছেন? মেয়ে বড় হলে এমন হওয়াটা স্বাভাবিক বলে মেয়েকে উল্টো বুঝিয়েছেন মুখ বুঁজে চলতে। ভয় পেয়েছেন প্রতিবাদ করতে, আইনের সাহায্য নিতে। অথবা অবস্থা বেগতিক দেখলে বিয়ের ব্যবস্থা । ব্যস, এইতো?

কিন্তু কেন? বিচার পাবেন না, বখাটেরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। এর জন্য? কেন মেয়েকে বলেননি তখন, মুখোমুখি হও, প্রতিবাদ করো। প্রতিটি পরিবার যদি তাদের কন্যাটিকে এই মন্ত্র দিতো, বিশ্বাস করেন অপরাধী একটু হলেও ভয় পেতো।

★ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ছেলে-মেয়েকে মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ দিয়েছেন। ভালো কথা। জানতে চেয়েছেন কখনো ফোনের উপযোগিতা আসলে কতটা? ওহ, অনেকেই তো আবার বহু কষ্টেসৃষ্টে এগুলো যোগাড় করে দেন। নিজেই এর ব্যবহার জানেনও না। বলছি না এই না জানা বা কিনে দেওয়াটা আপনার দোষ।

তাই বলে আপনি নির্দোষও নন। কারণ, আপনি আপনার সন্তানকে আত্ম-মূল্যায়ন বা আত্ম-নির্ভশীলতার সাথে পরিচয় করাননি।

যদি সেই মূল্যবোধ টুকুর ভাবনা প্রতিটি বাবা-মায়ের অথবা প্রিয়জনদের থাকতো তবে কবেই প্রতিটি ধর্ষককে কানে ধরে বাবা-মায়েরা পুলিশের হাতে সোপর্দ করতেন। নিজে বসে পড়তেন তাদের বিচারের জন্য। করেছেন কি কোন বাবা-মা? অথচ আমার জানামতে অধিকাংশ ধর্ষকই কোন না কোন পরিবারের সন্তান, ভাই, স্বামী এবং বাবা। সব জেনে বুঝেও যে চুপ থাকছেন এতে আপনিও যে অন্য লেভেলের পার্ভার্ট এটা কখনো স্বীকার করেছেন?

এইরকম অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা আছে যা আমরা প্রতিনিয়ত এড়িয়ে যাই বা আমরা আমরাই বলে ধামাচাপা দেই। অথচ ধর্ষণের বা নারী নির্যাতনের পিছনে সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা এবং আমাদের দায় কিন্তু কম নয়!

একটা মানুষ শুধুমাত্র যৌন আকাঙ্ক্ষার জন্যই যে শুধু এই ভয়াবহ কাজটা করে তা কিন্তু নয়। এর অনেকটাই থাকে নিজের ক্ষমতার প্রদর্শনের জন্য। মূলত নারীরা দুর্বল ও সহজে ভোগ্য এই হীন ভাবনাটাই অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের অপরাধ গুলোর মনস্তাত্ত্বিক কারণ।

আমাদের দেশের প্রতিটি সেক্টরে যে পরিমাণ নারীরা কর্মরত আছেন তারা শুধু এক সপ্তাহ সঠিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটা ব্ল্যাক আউট কর্মসূচি দিন না ফেসবুক প্রোফাইলের পাশাপাশি। দেশ লাটে উঠবে! কুম্ভকর্ণেরও ঘুম ভাঙ্গতে বাধ্য। আর অন্যসব ইস্যুতেও যদি সবাই একবার ঘর ছাড়ে তবে অপরাধীর আস্তানার ভিত নড়বেই। চাইলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এই কর্মসূচি তে সামিল হতে পারেন। যদিও তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে৷

তবে আইনের শাসন এবং এর সঠিক প্রয়োগ ব্যতীত কোনভাবেই এই অপরাধের মহামারী থেকে মুক্তি নেই। আজকের অরাজক অবস্থার জন্য অনেকাংশে শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র আমার রাষ্ট্র ব্যবস্থা দায়ী।

সেক্ষেত্রে আমাদের এই বধির রাষ্ট্রের মেরামতের জন্য আমাদের প্রত্যেকের সামাজিক আন্দোলনটা বড় বেশি প্রয়োজন। কারণ এই আন্দোলনটা জোরালো না হলে আমাদের ক্ষমতার লাটবহরধারীদের টনক নড়বে না। নষ্ট মগজধারী এই রাষ্ট্রের বিবেক-বুদ্ধি জাগ্রত করতে সামাজিক আন্দোলনের ঢেউটা শুধু ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে না হয়ে এর বাইরেও হোক। একটা নির্দিষ্ট শ্রেণিতে নয় প্রতিবাদ হোক প্রতিটি ঘর থেকে। হোক প্রতিবাদ!

আর হ্যাঁ নিজের ঘরের দায়িত্বটুকুও যেন না ভুলি। যদি আমরা এই সুপ্রিমিসির চর্চা বন্ধ না করি, আত্ম-জিজ্ঞাসার চর্চা না করি তবে আমার আপনার হাতেই জন্ম নিবে ছোট ছোট কিছু পার্ভাট। যা পরবর্তীতে এমন মহীরুহ হয়ে উঠবে যে এটাকে হাজার জন কাঠুরে লাগিয়ে উপড়ে ফেলা যাবে না।

শেয়ার করুন:
  • 55
  •  
  •  
  •  
  •  
    55
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.