আসুন, আমাদের বিচার আমরা করি

উমায়রা আহমেদ:

একটা সময় আমার মা’র খুব আফসোস ছিল- আমার মেয়েটা আর দশজন মেয়ের মতো মেয়েসুলভ না, হাঁটা চলা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই রুক্ষ আর ব্যাটাছেলে ভাব! কোন কোমলতা নেই! ছোটবেলা থেকেই আমার চুল ছোট করে কাটা থাকতো। বেশিরভাগ সময় আমি খালি পায়ে থাকতাম। স্যান্ডেল-জুতা পায়ে দিতাম না, ব্যবহার করতাম না কোন টাইপ ক্রিম, লোশন অন্যান্য প্রসাধনী। আমাকে কোমলমতি বানানোর জন্য আমার মা চান্স পেলেই আমার চুলে, হাতে- পায়ে, মুখে তেল-ক্রিম-লোশন লাগিয়ে দিত, হার্বাল এটা সেটা মেখে দিত, সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় জুতা পরাতো। কিন্তু সুন্দর হওয়ার চাইতে আমার ব্রুসলি- ম্যাকগাইভার কিংবা মাইক টাইসনের মতো হাত-পা-বডি শক্ত করার দিকে আগ্রহ ছিল বেশি।

আমি বাড়ির বড় মেয়ে, জয়েন্ট ফ্যামিলিতে চাচাতো-ফুপাতো ভাই বোনের সাথে একসাথে বড় হয়েছি। তাদের সাথে ক্রিকেট- ফুটবল, চোর -ডাকাত- বাবু -পুলিশ খেলেছি, শক্তি পরীক্ষা করতে এর ওর সাথে পাঞ্জা লড়েছি। বিল্ডিং এর পাইপ বেয়ে নিচ তলা থেকে তিনতলা উঠেছি, ছয় ফিট দেয়ালের উপর দিয়ে তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে দৌড়ানোর কম্পিটিশন করেছি, উঁচু উঁচু দেয়াল টপকেছি, গাছে উঠেছি, দেড়তলা, দুইতলার সিলিং থেকে লাফ দিয়েছি। কখনো সিলিং ধরে ঝুলে থাকা, সিঁড়ির রেলিং বেয়ে নীচে নামা কিংবা হাত দিয়ে কাঠ- রড বাঁকানো, লাঠি ভাঙা… আমার খেলাধুলা ছিল এসবই। প্রায় সময় খেলতে গিয়ে ভাই কিংবা বন্ধুদের কাছে মার খেয়ে, হাঁটু-কনুই ছিলে বাসায় এসেছি এবং বাসায় এসে পুনরায় মার খেয়েছি, অপমান লাগতো খুব! এই কারণে মনে হতো- আমার অনেক শক্তি দরকার। আমার হাত, আমার মুষ্টি অনেক শক্ত আর খসখসে করতে হবে। আমাকে একটা ঘুষি দিলে আমি যেন পাঁচটা দিতে পারি। এজন্য আমি দেয়ালে ঘুষি আর লাথি মেরে একা একা কিক বক্সিং খেলতাম। এই ছিলাম আমি!

আমি নারী হয়েছি আমেরিকা এসে। এখানে চলাফেরা এবং পোশাক স্বাধীনতা আছে, এখানে নারী সৌন্দর্য দেখলে কেউ অশালীন কথা বলে চোখ দিয়ে গিলে খায়না। দেশে থাকতে শাড়ি কেন, অন্য কোন একটা শালীন পোশাক পরেও সুবিধা করতে পারিনি। সুন্দর পোশাক পরে সেজেগুজে বাইরে বের হলেই মনে হতো আশেপাশের নোংরা চোখগুলো ফুল বডি স্ক্যান করছে, লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, হায়নার মতো হাসছে, রেপ করছে। তখন ইচ্ছা করতো জ্বলন্ত কাঁটা চামচ দিয়ে তাদের সবগুলো চোখ তুলে নিই! দেশে কখনোই রাস্তা-ঘাটে হাঁটতে স্বচ্ছন্দ বোধ করতাম না, প্রাণ খুলে হাসতে পারতাম না, সবসময় ভুরু কুঁচকে চোখ মুখ শক্ত করে রাখতাম।

বাংলাদেশে বোধয় খুব কম মেয়েই আছে একুশে বই মেলা, বানিজ্য মেলা, ওপেন এয়ার কন্সার্ট, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান, শপিং সেন্টারের মতো পাবলিক গ্যাদারিং, রাস্তা ঘাটে, রেস্টুরেন্ট কিংবা পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশনে মোলেস্টেশনের শিকার হয়নি। আগে মেয়েরা লজ্জায় বলতে পারতোনা, এখন অনেকেই বলে। জ্ঞান-বুদ্ধি হবার পর কোনটা গুড টাচ, কোনটা ব্যাড সেটা নিজে বুঝে অন্যকে সেভাবেই ট্রিটমেন্ট দিয়েছি। হুম! আমি দূর্বল ছিলামনা কখনোই। নিজেই পিটিয়েছি সেইসব অমানুষদের যারা আমাকে ইউনিভার্সিটি, পাবলিক প্লেসে ব্যাডলি টাচ করেছে কিংবা করার চেষ্টা করেছে। জনসমক্ষে রাস্তায় ইভ টিজার, মোলেস্টারদের পিটিয়েছি। কলার ধরে কিল-ঘুষি, লাথি-জুতা মেরেছি, কানে ধরে উঠবস করিয়েছি। মোটকথা আমার সমস্ত শক্তি আমি তাদের উপর ব্যায় করেছি। কোন মেয়েকে চোখের সামনে মোলেস্টেড হতে দেখলে চোর কিংবা ছিন্তাইকারি বলে গণধোলাই খাইয়েছি। কারণ, আমার চোখে এরাও রেপিস্ট। আমার বিশ্বাস এরপর তারা মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার সাহস করেনি। আমার এসব কাজ কর্ম দেখে আমার মা, বাবা, আত্মীয় স্বজন, আমার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে খুব অস্বস্তিবোধ করতো, দুঃশ্চিন্তায় থাকতো। এমনো হয়েছে আমি রাস্তায় বদ লোকজন পিটাচ্ছি, আর আমার মা কিংবা বন্ধুরা আমাকে ধরে টানছে! বলছে – “তুষি, হইসে থাম! থাম! পাগল হয়ে গেলি নাকি!!” একসময় আমাকে নিয়ে লোকে সমালোচনা করেছে, হাসি তামাশাও করেছে।

অনেকেই আমাকে বোঝাতো- মেয়েদের অনেক কিছু মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। রাগ,মেজাজ, মর্দানি শুধু পুরুষদের শোভা পায়। কারো কথা আমি শুনিনি। আমি দূর্বল হতে চাইনি, শুধু স্বাধীনচেতা আর শক্তিশালী হতে চেয়েছিলাম। আমি একটা কথাই বুঝেছিলাম বুঝেছিলাম, আমাকে আত্মরক্ষা করা শিখতে হবে। হ্যাঁ! আমি এমনই ছিলাম, এখনো আছি। আমি এগ্রেসিভ, আর আমার মতে প্রয়োজনে মেয়েদের রাফ আর এগ্রেসিভ হওয়া উচিৎ।

আজকে আমরা রেইপের মতো জঘন্য ঘটনা নিয়ে বলছি, আলোচনা করছি, লিখছি, ছবি এঁকে, ইলাস্ট্রেশন করে, গ্রাফিক্স করে, প্রোফাইল পিকচার ব্ল্যাক করে, ফ্রেম চেঞ্জ করে কিংবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে “রেপিস্টদের বিচার চাই- ফাঁসি চাই” প্রতিবাদ করছি। বিশ্বাস করেন! এসবে কিসসু হবে না! কয়দিন পর সব আবার আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আগে সাথে বাবা, ভাই কিংবা স্বামী থাকলে মেয়েরা নিরাপদ বোধ করতো, এখন আর সেটাও হয় না। মেয়েরা নিজের ঘরের লোকের সামনেই লাঞ্ছিত হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে, রেইপড হচ্ছে। রেপিস্ট ধরা পড়ে না। কিংবা ধরা পড়লেও বিচার হয় না, পলিটিক্যাল পাওয়ার খাটিয়ে জামিনে বের হয়ে যায়। এটাই বাংলাদেশ!

মাঝে মাঝে মনে হয়, ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য তো পিপিই আছে। রেপিস্ট, মোলেস্টার থেকে বাঁচার জন্যও যদি এমন বিশেষ পোশাক থাকতো…! সেন্সর বিশিষ্ট পোশাক, যেটা শরীরে কোন প্রকার “অড-ব্যাড টাচ” পাওয়ার সাথে সেটাকে বৈদ্যুতিক সিগনালে রূপান্তরিত করে সাথে সাথে এ্যালার্ম বাজানো শুরু করবে, পুলিশ কল করবে এবং সেই সাথে আত্মরক্ষার জন্য ইলেক্ট্রিক শকের ব্যবস্থা করবে। অনেক মেয়ে বেঁচে যেত, মূল্যবান জীবনগুলো রক্ষা পেত!

প্রতিদিনের রেইপের নিউজ, সরকারের নির্লিপ্ততা দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত আর রেইপ ভিক্টিমরা অসহায়-বিপর্যস্ত।
প্রশাসনের কাছে এখন শুধু একটাই চাওয়া- আত্মরক্ষার এই বিশেষ পোশাক দিতে না পারেন, রেপিস্টদের বিচার করতে না পারেন.. মেয়েদেরকে আত্মরক্ষার জন্য ধারালো অস্ত্র বহন করার বৈধতা দেন, আর নাহলে এইসব রেপিস্টদের প্রকাশ্যে ছেড়ে দিয়ে গণধোলাইয়ের অনুমতি দেন!! আমাদের বিচার আমরা করি!!

শেয়ার করুন:
  • 84
  •  
  •  
  •  
  •  
    84
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.