মনের ধর্ষণের কোনো বিচার হয় না!

অনন্যা নন্দী:

প্রতিটা ধর্ষণের পরে কিছু গতানুগতিক কথা শোনা যায়। যেমন, ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী, মেয়েরা সূর্যাস্তের পর বাড়ির বাইরে থাকলে তো ধর্ষণ হবেই, কলেজে গিয়ে প্রেমিকের সাথে ফস্টিনস্টি করলে তখন ধর্ষণ হয় না! ইত্যাদি, ইত্যাদি।
মনে হয় এই প্রথমবার আমাদের দেশে এরকম ভয়াবহ একটি ঘটনার পরও মেয়েটির কোনো দোষ খোঁজা হচ্ছে না। ভাগ্যিস ভিডিওটা ছিলো!

ধর্ষণ ছাড়াও মেয়েদের উপর পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে মারা, এসিড নিক্ষেপ, ইভটিজিং, শরীরে খারাপভাবে স্পর্শ করা ইত্যাদি প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অপরাধগুলোর বিচারের কথা কজনই বা ভাবে?

ইনবক্সে পুরুষাঙ্গের ছবি পাঠানো, প্রেম নিবেদন করে ব্যার্থ হয়ে চরিত্র নিয়ে কথা বলা, চাকরিতে প্রমোশন পেলে বস এর সাথে মেলামেশা নিয়ে গুজব রটানো, ক্লায়েন্ট এর সাথে বিছানায় শোয়া নিয়ে মুখরোচক গল্প সাজানো, ইত্যাদি ধর্ষণ না হলেও মেন্টাল হ্যারাসম্যান্ট। দুঃখের বিষয় হলো মেন্টাল হ্যারাসমেন্ট যতোই প্রখর হোক না কেন, শারীরিক হ্যারাসমেন্ট এর মতো এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না।

শরীরের জখম তো ভিডিও ভাইরাল হলে সবাই দেখতে পায়, কিন্তু মনের জখম কাউকে দেখানোও যায় না। মনের জখমে প্যানিট্রেশনের ব্যথা নেই, তবে অন্তরে রক্তক্ষরণ ঠিকই হয়। মনের জখম অর্থাৎ মেন্টাল হ্যারাসমেন্ট যে কতো ভয়াবহ তা কেবল আমার মতো ভুক্তভোগীরাই ভালো বলতে পারবে।

আমার জীবনে আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি মেন্টালি হ্যারাস এর কারণে। অবাক করার বিষয় হলো আমাকে নিপীড়নকারী মানুষগুলো আমারই কোনো সহপাঠী, বন্ধু, পাড়ার বখাটে, সর্বোপরি চারপাশের পুরুষ সম্প্রদায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন টিউশনি করে রাত দশটায় বাসায় আসতাম বলে রাস্তার পাশে পানের দোকানে লুঙ্গি হাঁটুর একটু উপরে তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ধর্ষণকামী মানুষগুলোর কতো নোংরা কটুবাক্য যে আমাকে শুনতে হতো!! পারতো না যে শুধু লুঙ্গিটা আরেকটু উপরে তুলে পুরুষাঙ্গ দেখাতে। একটা ভালো জামা পরলেও পাশ থেকে টিপ্পনি কেটে জিজ্ঞেস করা হতো যে কোন বয়ফ্রেন্ডের পকেট কেটেছি!!

কোর্টে প্র্যাকটিস করার সময় একবার সিনিয়র এর গাড়িতে লিফট নিয়েছিলাম। এখনও মনে পড়ে পাড়ার মুখে যখন গাড়ি থেকে নেমে সিনিয়রকে নমস্কার জানিয়ে বাসার দিকে আসছিলাম, পেছন থেকে কে যেনো বলে উঠেছিল, “বাহ, কোর্টে যেতে না যেতেই দেখি গাড়িওয়ালা একটাকে পটিয়ে ফেলেছে!”
কেন জানি তখন রাগ হয়নি, দুঃখে কান্না চলে এসেছিলো। বাসায় এসে মাকে কিছু বলতে পারিনি, কারণ উনার মনে মেয়ে জন্ম দেয়ার অপরাধবোধটা জাগাতে চাইনি।

ধর্ষণ কেবল শরীরের হয় না, মনেরও হয়। কিন্তু ভিডিও ভাইরাল হয় না বলে তার কোনো বিচারও হয় না।

বিবস্ত্র করে নির্যাতনের যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছে, আমি হলফ করে বলতে পারি ভিডিওটা দেখে যতোজন পুরুষ কষ্ট পেয়েছে, তার চেয়েও বেশি পুরুষের লালা ঝরেছে। তাই ভিডিওটা ভাইরাল না করে রিপোর্ট করে ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেললেই ভালো হতো।
এখন ঐ ভিডিও যতোজন দেখবে মেয়েটা ততবারই ওই পুরুষদের চোখ দিয়ে ধর্ষণের শিকার হবে।

অনন্যা নন্দী
আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী।
চট্টগ্রাম।

শেয়ার করুন:
  • 746
  •  
  •  
  •  
  •  
    746
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.