অগ্নিকন্যা

মাহবুবা মোনা:

গণধর্ষণের শিকার সালমা চিনেছিল পাঁচজন ধর্ষককেই। ওরা ক্ষমতাবান তাই মুখোশ পরে আসেনি। ক্ষমতাই তাদের আসল মুখোশ। তাদের রক্ষাকবচ, আর মাথার উপর বাবাদের ছায়া। বাবাদের দোষ আর কী দিবো? শুধু এটুকু বলতে পারি বাবাদের উদ্দেশ্যে “বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা”।

জানোয়ারগুলোর চেহারা চিনতে সালমার কোন অসুবিধাই হয়নি। কারণ ওরা এ গ্রামেরই এবং সালমা প্রতিনিয়ত এদের হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। খুব ভালো করে মনের ভিতর গেঁথে নিল ওদের চেহারা। ধর্ষকগুলো খুব দয়ালু ছিল, তাই কাজ সেরে একেবারে প্রাণে মেরে ফেলেনি। হয়তো ওদের পৈশাচিক তৃপ্তির দাম দিয়ে গেল।

তিনদিন পর সালমা তার একমাত্র সম্বল, স্বামীর শেষ চিহ্ন, ছোট্ট কানের দুল জোড়া জুয়েলার্সে বিক্রি করে কিছু টাকা যোগাড় করলো। সেই টাকা দিয়ে চাল বা মসুর ডাল কিনেনি। কিনে আনলো অনেকগুলো তালা আর কেরোসিন তেল। বুদ্ধি করে কয়েক দোকান থেকে কিনলো এগুলো, যাতে কেউ সন্দেহ না করে।

একাত্তরে সালমা রাতের আঁধারে তার বাবা আর ভাইকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে যেতে দেখেছে। তাদের চোখে মুখে ছিল মুক্তির নেশা। হায়নাদের উপর ছিল প্রচণ্ড আক্রোশ। স্বাধীনতা হরণের অপরাধে তাদের উপর খুন চেপেছিল। বাবার সেই অগ্নিমূর্তি আজ আমার উপর ভর করেছে। আশীর্বাদ করো বাবা আমাকে। আজ তোমার অগ্নিকন্যাও যুদ্ধে যাচ্ছে প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে।

গভীর রাতের ঘুটঘুটে আঁধারে সালমা আর তার কিশোর ছেলে, যে কিনা বেড়ার ফাঁক দিয়ে তার মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া বর্বরতার রাজসাক্ষী। নামলো অপারেশনে। প্রথমেই আশেপাশের সবগুলো বাড়ির দরজায় তালা লাগিয়ে দিল মায়ের নির্দেশে। এরপর সালমা শুধু পাঁচ ধর্ষকের ঘরেই কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। সবশেষে নিজের ঘর থেকে গুছিয়ে রাখা ব্যাগ বের করে তালা দিয়ে দিল। ঘরের কোণের ডালিম গাছটা থেকে বিদায় নিয়ে দুফোঁটা অশ্রু গুরুদক্ষিণা দিয়ে গেল গাছের গোড়ায়। নিজের ঘরেও আগুন ধরিয়ে দিল।

ছেলের হাত ধরে গ্রাম ছাড়লো সালমা। ধর্ষকদের ঘর থেকে চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ শোনা গেল, তবে তাঁদের বাঁচাতে বেরোতে পারলো না কেউ, সবার ঘরে তালা। সালমা নিজের ‘সম্ভ্রম’ হারানোর আর্তনাদের প্রতিধ্বনি শুনলো শুধু। এই গ্রামের মাটিতে নিজের হাতে ধর্ষকদের বিচার করে যাচ্ছে, এটাই তার বাকি জীবনের শক্তি আর আত্মতুষ্টি।

মনে মনে প্রচণ্ড আফসোস হলো তার, ধর্ষকদের পরিবারের বাকি সদস্যদের জন্য। তাঁদেরও দিতে হলো জীবন, অমানুষ জন্ম আর লালন পালনের অপরাধে।
কেন পারলো না মানুষ বানাতে, কেন দিতে পারলো না সঠিক শিক্ষা? তবে তারাও পাক শাস্তি।

অনির্দিষ্ট জীবনের পথে পা বাড়ালো নিয়তির কাছে হার না মানা যোদ্ধা অগ্নিকন্যা সালমা। আর নির্দিষ্ট গন্তব্যে ছুটছে ট্রেনটা, কিন্তু এ পথ সালমার অজানা। শুধু এটুকু তার জানা, নিজের ‘সম্ভ্রম’ নিয়ে খেলতে আসা কাউকেই ছাড় দেবে না সে জীবন চলার পথে। অনেক বছর আগে কিশোরী সালমাও তার স্কুল শিক্ষক পরিমলকে দেয়নি ছাড়। তার বুকে হাত দেয়ার অপরাধে হাতে কামড়ে মাংস তুলে ফেলেছিল। কয়েকজন মিলেও ছাড়াতে পারেনি পরিমলের হাত। সারা স্কুলময় রই রই ফেলে দিয়েছিল সালমা। পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাকে। গ্রামের একমাত্র স্কুলে আর তার পড়া হলো না। খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় সালমার। জীবন পরিক্রমায় একে একে আপনজনরা সবাই পাড়ি জমায় জীবনের ওপারে।

যুদ্ধ শেষে ফিরে না আসা মুক্তিযোদ্ধা বাবার অসহায় মেয়ে, স্বীকৃতি পায়নি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের। যেই ট্যাগটা রাজাকারের সন্তানরাও নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে।

গরীব স্বামীর সংসারে মানবেতর জীবন যাপন করা সালমা খুশিই ছিল তার স্বামী আর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে। অনিশ্চিত জীবনে রেখে হায়নাদের হাওলা করে হঠাৎ একদিন এক্সিডেন্টে মারা যায় তার স্বামী। ভিটেমাটি বলতে এই একটুকরো জমি ছাড়া আর কিছুই নেই। স্বামীর মৃত্যুর পর অকূল সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকে সালমা। পেটের যোগান দিতে কচুরি পানার মতো ভাসতে থাকে জীবনের স্রোতে। যতোটা-না যুদ্ধ করছে পেটের ক্ষুধা মেটাতে, তার চেয়ে বেশি যুদ্ধ করতে হচ্ছে তার শরীরের প্রতি অন্যদের ক্ষুধা মেটাতে।

নিজেকে রক্ষা করতে করতে ক্লান্ত সালমা সেদিন রাতেও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। একদল শকুন তার ঘরের নড়বড়ে দরজাটা ভেঙে হুড়মুড় করে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার গায়ে। আতঙ্কিত ঘুম ভাঙা কিশোর ছেলে লুকিয়ে ভাঙা বেড়া দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘরের বাইরে। একজন টের পেয়ে ওকে বেঁধে ফেললো বেড়ার ওপাশে ঘরের খুঁটির সাথে। সালমার হাত-পা আর মুখ বেঁধে পালাক্রমে রাতভর ওরা ধর্ষণ করলো তাকে। বিবস্ত্র রক্তাক্ত সালমার এতো বছর ধরে রক্ষা করে আসা ‘সম্মান’ এক রাতে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। মিশে গেল মাটিতে, হুমকি দিয়ে গেল এলাকা ছাড়ার, এই ঘরটা ওদের চাই। মাদক সেবনের আঁকড়া বানাবে এই ঘর। এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে গেল তারা।

সালমা ওদের কথা রেখেছে, এক সপ্তাহের মধ্যেই গ্রাম ছাড়ছে, তবে ওদের শেষ করে দিয়ে। সে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে নিজের সম্মান রক্ষার লড়াইটা নিজেকেই করতে হয়। অন্যদের ভরসায় থাকলে চলে না। একাত্তরে ওর মা, বাবাকে আটকাতে চেয়েছিল, বলেছিল তোমরা বাপ বেটা একসাথে যুদ্ধে চলে যেও না। আশেপাশের অনেকের নাম বলে মা অনুরোধ করেছিল বাবাকে, ওরা তো মুক্তিযুদ্ধে গেছে, আপনারা না গেলে হয় না?

তখন বাবা হেসে উঠে মাকে বলেছিল,
নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই নিজের। অন্যরা কী করবে তার দিকে চেয়ে না থেকে, নিজের সাধ্যমত প্রতিরোধ করতে হবে।

মাহবুবা মোনা,
নোয়াখালী থেকে।

শেয়ার করুন:
  • 536
  •  
  •  
  •  
  •  
    536
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.