দলবদ্ধ পিশাচের তাণ্ডবে বিবস্ত্র বাংলাদেশ

শান্তা মারিয়া:

অনেক তো হলো। বিভিন্ন উপায়ে, বীভৎস থেকে বীভৎসতর ঘটনা তো দেখছি। প্রতিটি ঘটনা যেন আগের ঘটনাটিকে কদর্যতায় ও ভয়াবহতায় ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। গত কয়েক বছরের ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের সহিংসতার কয়েকটি ঘটনা ভাবলে আজও আতংকে ঘুম ভেঙে যায়। পাঁচ বছরের একটি শিশু মেয়ের জনন অঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে বড় করা হচ্ছে ধর্ষণের সুবিধার জন্য-এই ঘটনাও তো বাংলাদেশেই ঘটেছে। এতোবড় বীভৎস ঘটনার পরও তো প্রলয় হয়নি। এখনও তো এদেশের মানুষজন খেয়ে দেয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।

পাহাড়ে একের পর এক নারীকে ধর্ষণ করছে সেটেলাররা। হত্যাও করেছে। তারপর কি করেছি আমরা? রাংগামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দারবানের দিকে তাকালে আপনি কি সবুজ প্রকৃতি দেখেন? আমি সেখানে ধর্ষণের শিকার পাহাড়ি নারীর আর্তনাদ শুনি।
পূর্ণিমার কথা আপনাদের মনে নেই? মনে নেই সুবর্ণচরের গৃহবধূর কথা? নৌকা আর ধানের শীষের বিন্দুবিসর্গ যারা জানে না, তাদেরও ধর্ষণ করা হয় এই দুই প্রতীকের দোহাই দিয়ে।

সিলেটের এমসি কলেজে যে মেয়েটি স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল তাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পরও কি সোনার দেশের সোনার মানুষরা ক্ষান্ত হয়েছে?
এরপরেও একক ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বীভৎসতায় একটি অন্যটিকে পাল্লা দিচ্ছে।
বেগমগঞ্জের এখলাসপুরের যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে সেটিও তো আসলে পুরানো ঘটনা। ৩২ দিন আগের কাহিনী। এই ৩২দিন ধরে ভিকটিম ও তার পরিবার ঘরছাড়া। কেন? কারণ সোনার ছেলে দেলোয়ার তার বাহিনী নিয়ে দলবদ্ধ ভাবে তাকে নির্যাতন ও তাকে বিবস্ত্র করেই ক্ষান্ত হয়নি। তার হুমকিতে বাড়ি ছাড়তেও হয়েছে ভিকটিমকেই। ধর্ষক দলের সাহস কতটা বাড়লে তারা নিজেরাই ভিডিও আপলোড দেয়। কারণ এটা তাদের বীরত্বের দলিল বলে তারা মনে করেছে। আর ৩২ দিন পুলিশ ও এলাকাবাসী নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিল।দেলোয়ার বাহিনী এতই শক্তিশালী? তাদের এই শক্তির উৎস কী?

গণমাধ্যমের গত সাতদিনের হেডলাইনগুলো শুধু দেখুন। মা মেয়ে গণ ধর্ষণের শিকার। স্বামীকে চিকিৎসা করাতে এসে ঢাকার মহাখালিতে না কোথায় যেন ধর্ষণের শিকার হয়েছে গৃহবধূ। আরও আরও অনেক ঘটনা। এই তো সেদিন নীলা রায় নামে একটি মেয়েকে তার ভাইয়ের সামনেই ছুরিকাঘঢ়াতে হত্যা করেছে মিজান নামে এক বীরপুরুষ। পাহাড়ি মেয়েকে গণধর্ষণ করেছে বীরপুরুষ সেটেলাররা।
হ্যা কয়েকজন গ্রেপ্তার হচ্ছে বটে। কিন্তু গ্রেপ্তার দিয়ে কি এই ধর্ষণ মহামারী ঠেকানো যাবে? ধর্ষণের জন্য নোবেল প্রাইজ থাকলে বাংলাদেশের ধর্ষকরা সেটি জয় করতে পারতো। তাদের অবশ্য ভারতের পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হতো। কিন্তু তারপরও সেখানে অন্তত মানুষ প্রতিবাদে পথে নামে। আমাদের দেশে তো তাও হয় না।

ধর্ষণের এই ভাইরাস কীভাবে বিস্তার লাভ করেছে এদেশে? একদিনে নয় নিশ্চয়ই। নারীর প্রতি অশালীন, বীভৎস মন্তব্য করতে করতে, নারীকে কেবল মাত্র যৌনবস্তু বলে প্রচার করতে করতে আর বিচারহীনতা ও ক্ষমতার প্রশ্রয়ে পার পেয়ে যেতে যেতে এই অবস্থা। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেঞ্চুরি ধর্ষক মানিক যেদিন তার শততম ধর্ষণের ঘটনাকে প্রকাশ্যে সদম্ভে উদযাপন করে এবং তারপরও তার কঠোর কোন শাস্তি হয় না; আমি নিশ্চিত বাংলাদেশে সেদিন আরও শতখানেক নতুন ধর্ষকের জন্ম হয়।
পহেলা বৈশাখে প্রকাশ্যে নারী নিগ্রহকারীদের যেদিন খুঁজে পাওয়া যায় না, শাস্তিও দেয়া হয় না সেদিনই আরও অনেক ধর্ষকের জন্ম হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে নববর্ষের রাতে যখন এক নারীর বস্ত্রহরণ হয় এবং তাদের কোন শাস্তি হয় না তখনই আজকের বেগমগঞ্জের বস্ত্রহরণকারীদের জন্ম হয়।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে যেদিন তনু ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে এবং সেই হত্যার অপরাধীরা অধরা থেকে যায়, সেদিনই আরও নতুন নতুন ধর্ষকের জন্ম হয়।
ধর্ষণ থামাতে দরকার হলো বিচার, দ্রুত বিচার এবং দণ্ড কার্যকর। এবং সেই দণ্ড কার্যকরের ছবি ভাইরাল করা। আরও দরকার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার সমতার শিক্ষা।

গলদটা আমাদের সামাজিক শিক্ষার মধ্যেও রয়েছে। ফেসবুকে নারী বিরোধী যে কী ভয়ানক মন্তব্য চোখে পড়ে। এই অমানুষগুলো এমন ভাষায় মন্তব্য করে যে বোঝা যায় এরাও পটেনশিয়াল ধর্ষক। এদের মগজে রয়েছে ধর্ষণের ভাইরাস।
এজন্য এখন সচেতন নারী পুরুষ সকলকে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদী হতে হবে রাজপথে। আমেরিকায় যেভাবে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে তেমনি প্রতিবাদ আন্দোলন হওয়া দরকার বাংলাদেশে ধর্ষণের বিরুদ্ধে। ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটারস যেমন সত্যি তেমনি উইমেন লাইফ ম্যাটারস এটাও আমাদের পাশাপাশি প্রচার করতে হবে।

আর এদেশের ক্ষমতাসীনদের বলি, শুনেছি আপনারা খুবই জনপ্রিয়। তাহলে এই ধর্ষক পিশাচগুলোকে দল থেকে বের করে দিচ্ছেন না কেন? দেশের মানুষ তো শুনি এমনিতেই আপনাদের ভালোবাসে। তাহলে এই ধর্ষকগুলোকে কি আপনাদের খুব প্রয়োজন? কেন এদের ওউন করছেন? এদের বাদ দিয়ে কি আপনাদের দল অতীতে টিকে থাকেনি? তাহলে আজ এদের বহিষ্কার করতে, চরম শাস্তি দিতে এত ভয় কিসের?

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর শত পুত্রকে হারিয়ে ধৃতরাষ্ট্র আহাজারি করেছিলেন। কিন্তু যদি সেই সর্বনাশা পাশাখেলার আসর আর দ্রৌপদীর অপমানের সময়ই তিনি দুঃশাসন, দুর্যোধনকে প্রতিহত করতেন তাহলে তাকে এই নিদারুণ শোক সহ্য করতে হত না। এত ভয়ানক পরিণতিও হত না কৌরবদের। মহারানী গান্ধারীও তখন চোখে কাপড় বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। তখনই তার উচিত ছিল নিজ পুত্রদের পরিত্যাগ করা।
বাংলাদেশে এখন যে ধর্ষকদের তাণ্ডব চলছে সেটা কুরুক্ষেত্রের চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসবে। এখনি সময় ধর্ষণ বিরোধী সকল মানুষের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার। নইলে কুরুকুলের ধ্বংস কেউ ঠেকাতে পারবে না।

শেয়ার করুন:
  • 788
  •  
  •  
  •  
  •  
    788
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.