কোন দুঃখে বুড়িয়ে যাবো?

শান্তা মারিয়া:

ফেসবুকে প্রিয় সুপ্রীতিদির জন্মদিনের স্ট্যাটাস পড়ে বড্ড ভালো লাগলো। মনে হলো আমিও এ নিয়ে কিছু কথা বলি যা হয়তো অনেকের জন্য প্রেরণা হবে।
এটা ঠিক, যখন আমার বয়স ছিল পনের-ষোলো, তখন পঞ্চাশ শুনলে মনে হতো, বাব্বা, অনেক বয়স হয়ে গেছে তো। এই মনে হওয়ার কারণও আছে। তখনকার দিনে মানুষ তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যেত। বিশেষ করে নারীরা। আমার নানী ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে মেয়ের বিয়ে দিয়ে শাশুড়ি হয়ে গিয়েছিলেন। বিপরীতে আমার অনেক বান্ধবী বিয়েই করেছে ত্রিশের পর।

আশির দশকে হলিউডে তো বটেই, বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রেও নায়কের ভূমিকায় পঞ্চাশ বছর বয়সীদের দিব্যি দেখা যেত, কিন্তু নায়িকার ভূমিকায় নয়। তার মানে এখানেও একটা বৈষম্য। পুরুষ ও নারীর বয়স এক গতিতে বাড়তো না। বায়োলজিকালি এক গতিতে বাড়লেও সামাজিকভাবে নয়। চল্লিশ বছরে একজন পুরুষ ‘যুবক’, কিন্তু নারী ‘বৃদ্ধা’। কারণ মেয়েদের ‘কুড়িতে বুড়ি’ বানিয়ে দিত সমাজ।

আর মেনোপজ এর পর তো ধরেই নেয়া হতো যে ওই নারীর জীবন শেষ। তার আর কোন চাওয়া পাওয়া নেই। তার এখন শুধু নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা করা, কিংবা বারান্দায় বসে পানের বাটা সাজানো হলো মূল কাজ।

যেহেতু সন্তানের জন্মদানকেই নারীর জীবনের প্রাইম ডিউটি বলে মনে করা হতো। তাই ‘মেনোপজ’ এর পর তার জীবনের সকল প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে বলে মনে করে তার ব্যক্তিগত সকল চাহিদা বিসর্জন দেয়ার সময় এসে গেছে-এমনটি মনে করতো সমাজ।

আজ থেকে একশ বছর আগের কথা ভাবি। মেয়েদের বয়স নিয়ে কত যে গবেষণা। তখন আমাদের দেশে মেয়েদের কুড়িতে বুড়ি বলা হতো। সেসময় ‘ষোড়শী’, ‘অষ্টাদশী’ ইত্যাদি বিশেষণে নারীকে অভিহিত করে তাকে নিয়ে রসালো আলাপ করতে বুড়ো বুড়ো পণ্ডিতদেরও ছিল প্রবল আগ্রহ। ‘কচি পাঁঠা’ আর ‘কচি মেয়ে’ না হলে নাকি তাদের রসনা শান্ত হতো না। কন্যাসম, নাতনিসম শিশুমেয়েদের বিয়ে করতে এতটুকু বাধতো না পঞ্চাশোর্ধ পুরুষদের। কী শিক্ষিত, কী অশিক্ষিত!

বাপের বাড়িতে মেয়ে রজঃস্বলা হলে মহাপাপ। বিয়ে দিয়ে বিদেয় করো, বিদেয় করো। বিয়ের কনের বয়স নিয়ে তখন আলাপের শেষ ছিল না। কন্যাপক্ষ বয়স লুকোবেই এটা ধরে নেয়া হতো।

সেই যুগ থেকে কতটুকু এগিয়েছি আমরা? এখনও নারীদের বয়স নিয়ে চলে ফিসফাস, হাসাহাসি। পুরুষের সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে, ছেলেদের বেতন আর মেয়েদের বয়স নাকি জিজ্ঞাসা করতে নেই। এই কথাটা শুনলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়। মেয়েদের বয়স নিয়ে লুকোচুরি কেন?
বয়স লুকোনোর প্রবণতা হলো নারীকে ‘এখনও জোয়ান’ প্রমাণ করার হীনতাসূচক মানসিকতা থেকে।

এই উইমেন চ্যাপ্টারেই অনেক লেখকের যুক্তিপূর্ণ ও শক্তিময় লেখার বক্তব্যের জবাব না দিতে পেরে অনেক পুরুষ পাঠককে দেখেছি লেখকের বয়স নিয়ে অহেতুক বিশ্রী মন্তব্য করতে। প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয়েছে, লেখকের বয়স ৯ না ৯০ তাতে তোর কী? যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দাও।
যাহোক। আজকে না হয় এসব তিক্ত কথা থাক। আমি একটু নিজের কথা বলি। সেইসঙ্গে বলি আমার মতো আরও অনেকের কথা যারা নতুন যুগের নতুন মানসিকতার নারী।

আমার বয়স এ বছর পঞ্চাশ হয়েছে। বয়স আমি কখনও লুকাইনি, কখনও লুকাতে ইচ্ছাও করে না। কারণ আমি এ নিয়ে খুবই খুশি। কারণ জীবনের অনেকটা বছর আমি তো সাহসের সঙ্গে সব যুদ্ধ করে এসেছি। লেখাপড়া, পেশাগত জীবন, চাকরি সব কিছুতেই অনেক উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এখন আমি অনেক স্ট্যাবিলিটির মধ্যে এসেছি, অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে, বেড়েছে আত্মবিশ্বাস। এখন আমি পরিকল্পনা করি ভবিষ্যতে নিজেকে আরও বিকাশের, জীবনকে আরও বেশি সুন্দর করে তোলার ও আরও অনেক উপভোগের। এখন পরিকল্পনা করি আগামি ছুটিগুলোতে কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবো, কোন কোন দেশ দেখবো। ছোটবেলায় প্রফেসর শঙ্কু আর চাঁদের পাহাড়ের শংকর ছিল আমার আইডল।
পেশার কারণে কয়েকটি দেশ দেখা হলেও, লেখাপড়া ও চাকরির চাপে অ্যাডভেঞ্চারগুলো বাকি রয়ে গেছে। এখন আমার স্বপ্ন আমাজনের অরণ্য দেখার, দক্ষিণ মেরুতে অভিযানে যাওয়ার আর পেরুর হারানো সভ্যতার সন্ধান করা। তিব্বত যাওয়ার প্ল্যান আছে যেটা হয়তো আগামি বছরেই সফল হবে।
পাহাড় ভালোবাসি, তাই প্রতি উইকএন্ডে যাই পাহাড়ে চড়তে। কুনমিংয়ের সবচেয়ে বড় পাহাড় শিশান (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,২৩৮ ফুট উঁচু)। এই পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছি গত শীতে।

গত বছর দশ হাজার লোকের এক আন্তর্জাতিক ম্যারাথনে নাম দিয়ে ১ ঘন্টায় ৫ কিলো পথ পাড়ি দিয়ে পদক জিতেছি। প্রতিদিন আমি দুই কিলোমিটার রাস্তা হাঁটি বা দৌড়াই। সন্ধ্যায় কখনও বাইরে ডিনার করি। কখনও বাড়িতে ডিনার সেরে যাই কফিশপে অথবা আইসক্রিম খেতে। নাচের আসরে বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দিতে বা বেড়াতে যেতে ভালোবাসি।

আমার আগ্রহ ইতিহাস ও মিথোলজিতে। তাই এই বিষয়ের কোন নতুন লেখা পড়লে খুব ভালো লাগে। আর গল্প উপন্যাস তো আছেই। ছোটবেলার মতো এখনও বই পড়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই। সিনেমা দেখার আগ্রহও রয়েছে। তবে এখানে আমি বলবো, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রুচি উন্নত হয়েছে। এখন আমি গতানুগতিক মসলা চলচ্চিত্র দেখে আনন্দ পাই না। তা এটা যদি বয়স বাড়ার লক্ষণ হয়, তাহলে সেটা ভালোই। এখানে আমি নেতিবাচক কিছু দেখছি না। বয়সের সঙ্গে অভিজ্ঞতা, পাঠের সঙ্গে জ্ঞান আর কাজের সঙ্গে দক্ষতা বাড়ার মধ্যে বরং আনন্দ আছে, সেটা কোনভাবেই বুড়িয়ে যাওয়া নয়। বুড়িয়ে যাওয়া হলো, নতুন ইতিবাচক পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে না পারা, প্রতিবাদী না হওয়া, জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে ফেলা। জীবনের সঙ্গে সবসময়েই আমার তীব্র প্রেম। ভালোবাসি প্রকৃতিকে। চলে যাই অরণ্যে জোছনা দেখতে, সমুদ্রের জলে রাতের আঁধারে ফসফরাসের খেলা দেখতে।

ফ্যাশন, সাজগোজ এগুলোর প্রতি আকর্ষণ রয়েছে বরাবরের মতোই। এখনও কোন ব্র্যান্ড হাউজে সেল দিচ্ছে শুনলে দৌড়ে যাই। নিজের পছন্দে কাপড় কিনি। যদি কেউ বলেই বসে ‘বুড়ির কত শখ’ তাহলে সেই ব্যক্তির জন্য করুণা হয়, তাকে ব্যাকডেটেড বলে মনে মনে উপেক্ষার হাসি ছুঁড়ে দেই।
তবে বয়স বাড়ার কিছু ছাপ আমার মধ্যে অবশ্যই আছে। সেটা হলো অভিজ্ঞতার। আমি সময়ের সঙ্গে আরও সহিষ্ণু হয়েছি, অনেক কিছু এড়িয়ে যেতে বা উপেক্ষা করতে শিখেছি। পথ চলতি প্রতিটি স্ট্রে ডগের ঘেউ ঘেউয়ের জবাব না দিয়ে নিজের পথে এগিয়ে যেতে শিখেছি। জীবন থেকে প্রেমট্রেমও যে একেবারে হারিয়ে গেছে, তাও নয়। তবে প্রেমের জন্য মাতোয়ারা না হয়ে নিজেকে গুরুত্ব দিতে শিখেছি। এটা অর্জন বলেই মনে করি। এবছর করোনার জন্য গৃহবন্দী হয়ে আছি, সেটাও সাবধানতা থেকেই। তবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়িনি। ঘরে বসেই চাকরি করছি, জুম মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছি, বই পড়ছি, আগ্রহের বিষয়ে ডকুমেন্টারি দেখছি, আর নিজের শখের লেখালেখি যা করার তা তো করছিই।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাপলাইড সিস্টেমস অ্যানালাইসিস এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনি ব্রুক ইউনিভারসিটির গবেষকরা বলছেন, নারী পুরুষ উভয়েই ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত যুব। ৬০ এর পর ৮০ পর্যন্ত মধ্য বয়স। ৮০ অতিক্রম করলে তবে বৃদ্ধ। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে যৌবনের প্রান্ত।

আমার মতো যারা ৫০ পেরিয়েছেন তাদের বলছি, এখনই কিন্তু আমাদের খুব আকর্ষণীয় সময়। অনেকেরই ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। পেশাগত জীবনেও আমরা একটা স্তরে পৌঁছেছি। আগের চেয়ে ফিনানশিয়াল স্ট্যাবিলিটিও অনেকেরই বেড়েছে। কিছুটা ক্ষমতায়িতও হয়েছি। তাই নিজের মতো করে জীবন উপভোগের সুবর্ণ সময় এখন শুরু হয়েছে। এসময় নিজের খুশি মতো জীবনটা যাপন করি। আর নিজের যত্ন নেই। শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেই, মনের যত্ন নেই। নিজেকে আরেকটু বেশি ভালোবাসি। লাইফ বিগিনস অ্যাট ফর্টি। দারুণ সত্যি কথা। অন্তত, আমার জন্য, আমাদের জন্য।

আর প্রিয় সুপ্রীতিদির জন্মদিনে এই লেখাটা আমার উপহার, সঙ্গে অনেক ভালোবাসা।

শেয়ার করুন:
  • 886
  •  
  •  
  •  
  •  
    886
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.