জাতীয় কন্যাশিশু দিবস: সন্তান হিসেবে ‘পুত্র-কন্যা’র সমতা প্রতিষ্ঠা জরুরি

রাহিমা আক্তার:

দিবস উদযাপনে আমরা বাঙ্গালীরা বরাবর একধাপ এগিয়ে, তা সেই দিবসের উদ্দেশ্য জানি বা না জানি। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম দেখা গেলেও ইদানিং আমাদের সাধারণ জনগণের মাঝে বেশিরভাগ দিবস মূলত ফেইসবুক ছবিতে আনন্দের সাথে উদযাপিত হয়। গত ২৭/২৮ সেপ্টেম্বার ফেইসবুক ভরে গেছে কন্যা সন্তানকে নিয়ে অনেক বাবা মায়ের হাস্যজ্জ্বল ছবি দিয়ে। এই এদিকে একই সময়ে মাত্র দু’একদিনের ব্যবধানেই দুটি ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে না আছে কোন তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা।

কী পরস্পর বিরোধী সমাজ আমাদের! যদিও মানুষ ফেইসবুকে ঐ দিবস্টি উদযাপন করেছে, তবে বাংলাদেশের জাতীয় কন্যাশিশু দিবস মূলত ৩০শে সেপ্টেম্বর। হাঙ্গার প্রজেক্টের মাধ্যমে ২০০০ সাল থেকে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়ে আসছে ৩০শে সেপ্টেম্বর। আন্তর্জাতিকভাবে কন্যাশিশু দিবস পালিত হয় শিশু অধিকার সপ্তাহে ১১ই অক্টোবর। এই দিবসগুলো মূলত কন্যাশিশুর সম অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা কর্মসূচি নিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে নারী-শিশু নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণের যে চিত্র, তাতে দিবস পালন আসলে আসলে কার্যত কোন ভূমিকাই রাখতে পারছে না।

এবারের কন্যাশু দিবসের থিম হলো “My voice, our equal future”, আর বাংলায় প্রতিপাদ্য ‘আমরা সবাই সোচ্চার, বিশ্ব হবে সমতার’।

আসলেই কি আমাদের কন্যাশিশুরা সমান অধিকারের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে?

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি, মতান্তরে তা ১৮ কোটি। যার মধ্যে ৪০% জনসংখ্যার বয়স ১৮ বছরের নিচে। সে হিসেবে বাংলাদেশের মোট শিশুর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৪০ লক্ষ যার প্রায় অর্ধেক কন্যাশিশু। এই বিশালসংখ্যক কন্যাশিশুর মুষ্টিমেয় অংশ প্রতিনিয়ত সামাজিক ও পারিবারিক অঙ্গনে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই বৈষম্য শারিরীক, মানষিক এবং যৌন নির্যাতনে সমাজকে ক্রমান্বয়ে কন্যাশিশু ও নারীর জন্য এক অনিরাপদ জনপদে পরিনত করছে । বর্তমানে ধর্ষণ ও হত্যার হার এত ব্যাপক হারেই বেড়েছে যে শহর নগর গ্রামাঞ্চল কন্যাশিশুর নরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের কন্যাশিশুর প্রতি এই বৈষম্যের শুরু মূলত পরিবারের ভেতর থেকেই। পরিবারে পুত্র সন্তানকে অধিক মূল্যায়ন ও কন্যা সন্তানকে অবমূল্যায়ন এই বৈষম্যকে এমন স্তরে নিয়ে এসেছে যে আমাদের সমাজের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ নারী-পুরুষের বৈষম্য। কন্যাশিশুর জন্ম নেয়ার পর অনেক পিতামাতাই খুশি হতে পারেন না। আর প্রথম সন্তান যদি কোন পরিবারে কন্যা সন্তান হয়, তবে পরবর্তীতে দ্বিতীয় কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ কোনভাবেই পিতামাতা সানন্দচিত্তে গ্রহণ করতে পারেন না। এমনকি দৈনন্দিন জীবন যাপনে পুত্রসন্তান খাদ্য, পুষ্টি, পোশাক, শিক্ষা, অন্যান্য চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রেও বিশেষ অগ্রাধিকার পায়। অনেক পিতামাতাই অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে কন্যাসন্তানের লেখাপড়া বন্ধ করে পুত্র সন্তানের লেখাপড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে থাকেন। আর সেক্ষেত্রে বাল্য বিবাহ অগ্রাধিকার পায় বিকল্প সমাধান হিসেবে।

ইউনিসেফের তথ্য মতে, ৫০ শতাংশের অধিক বাংলাদেশের নারী যাদের বযস এখন ২০ বছর তারা তাদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হবার আগেই তাদের বিয়ে হয়েছে আর প্রায় ১৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছে তাদের ১৫ বছর বয়সের নিচে। অনেক পুরুষই বাল্য বিবাহ যে শিশু নির্যাতনের মধ্যে পড়ে তা জানেন না বা মনে করেন না। একজন ১৪/১৫ বছর বয়সী কিশোরী যখন বিয়ে করে ১৬/১৭ বছর বযসে মা হয়ে যান তখন আসলে একজন শিশুই যে আরেকটি শিশুর জন্মদান করেন সে কথা কেউ ভেবে দেখেন না, কী বিচিত্র এই আমাদের দেশ! বাল্যবিবাহ কন্যাশিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে সেটা রাষ্ট্রের পাশাপাশি নিজ পরিবারও এড়িয়ে যায়। হায়রে হতভাগ্য কন্যাশিশু।

কেবল বাল্য বিবাহ? সেতো নগণ্য। বর্তমানে যে মহামারী চলছে তা হলো সামাজিক ও পারিবারিক অঙ্গনে কন্যাশিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতনসহ নানা ধরনের নির্যাতন। আজ “The Daily Star“ এর প্রকাশিত বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী গত আট মাসে দেশে ৮৯২ টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে! এত গেলো আট মাসের হিসাব, গত ৫ দিনেই ৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে।

কী ভয়াবহ এক চিত্র, দেশ যেন ধর্ষকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দেশে ধর্ষণের বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ কেটে যায়, কিন্তু বিচার হয় না! দেশের আদালত ধর্ষণের মামলাতে গড়িমসি করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয় আর এই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার ফাক ফোকর গলে দিন দিন ধর্ষণের মত ভয়াবহ অপরাধ বেড়েই চলেছে দেশে। আর বিচার? কয়টা বিচার আর সঠিকভাবে হচ্ছে। আমরা নিশ্চয়ই পুলিশ হেফাজতেও অসংখ্য শিশু -কিশোরী শারীরিকভাবে নির্যাতনের কথা ভুলে যাইনি? ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরের ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার সেই ২৫ বছর পরও কি নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা এবং নির্যাতনের চিত্র পাল্টেছে? একটার পর আরেকটা অপরাধ পেছনের অপরাধকে জন সম্মুখের আড়ালে নিয়ে গেছে বরাবর।

রাহিমা আক্তার

নির্যাতন নিপীড়ের চিত্র রয়েছে গৃহশিশুশ্রমিক এর ক্ষেত্রে। কোথাওই কন্যা শিশু নিরাপদ নয়। দেশে গৃহশিশুশ্রমিক হিসেবেও কর্মরত কন্যাশিশু নির্যাতন-নিপীড়ন একটি অতি সাধারণ চিত্র। অনেক ক্ষেত্রেই গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর অত্যাচার-নির্যাতনে গৃহশিশুশ্রমিকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এসব ছাড়াও আছে নিয়মিত বখাটেদের দ্বারা কন্যাশিশু নিপীড়ন, নির্যাতনের আর হত্যা। বখাটেদের উৎপাতে অতিষ্ট হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল সিমি-তৃষা-রুমি-শাকিলা-স্বপ্নার মতো নিরাপরাধ শিশু-কিশোরী-তরুণীরা। গত সপ্তাহেই সাভারে নীলা রায়কে বখাটে মিজান কুপিয়ে হত্যা করলো। এসব সন্তানেরা আবার পরিবারের আশ্রয় প্রশ্রয়ে আইনি সহায়তা পেয়ে আইন-আদালতকে বুড়োআঙুল দেখিয়ে বুক ফুলিয়ে এই সমাজেই ঘুরে বেড়ায়।

আসলে অপরাধির দৃষ্টান্তমূলক যথাযথ শাস্তি না হলে এভাবে প্রতিদিন অপরাধের মাথা বেড়েই যাবে। আমার এক সাবেক সিনিয়র সহকর্মী ইনবক্সে কাল লিখেছিলেন, “গত দিন উদযাপন করলাম ধর্ষণ। আজ উদযাপন করি কন্যা দিবস। কন্যা দিবসে আমরা যারা নিজেদের দেয়ালে কন্যাদের জন্য শুভ কামনা করছি তারা সবাই রাজপথে নেমে ধর্ষণের প্রতিবাদ করলে হয়তো কন্যারা নিরাপদ থাকতো। আসলেই কি আমরা আমাদের কন্যাদের জন্য নিরাপদ দেশ গড়ছি নাকি প্রত্যাশা করছি তাদের নিরাপদ জীবন?”
সত্যি, আইন যেহেতু বিলম্বিত প্রক্রিয়ায় চলে, সেখানে আমাদের উচিৎ তীব্র প্রতিবাদে রাজপথে নেমে যাওয়া। যে দেশে ধর্ম নিয়ে, নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে একটু জোরে কাশি দিলেই সব ধর্মপ্রাণ মানুষেরা ইসলাম যায় যায় করে মাঠে নেমে যায়, সে দেশে প্রতিদিন গড়ে তিনজন করে নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও সব ধর্মপ্রাণ মানুষেরা কীভাবে চুপ করে বসে থাকে তা ভেবে পাই না আমি।

এমন দিন কি খুব দূরে যেদিন বাংলাদেশে একটি শিশুও পুত্রসন্তান বা কন্যাসন্তান হিসেবে বৈষম্যের শিকার হবে না, কোন কন্যাশিশু নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে না, ধর্ষণের শিকার হবে না? আমরা কি আশা করতে পারি না যে পুত্র-কন্যা হিসেবে ভেদাভেদ করে নয়, বরং একজন সন্তান মানুষ হিসেবেই সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে?

রাহিমা আক্তার
ভুর্জবুর্গ, জার্মানি থেকে।

শেয়ার করুন:
  • 150
  •  
  •  
  •  
  •  
    150
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.