“দিদি, আমি কন্যা শিশুর মা হতে চাই না”

জিন্নাতুন নেছা:

উন্নয়ন কর্মী হবার সুবাদে সত্যি বলছি এক এক করে অনেক কিছুই জানার সুযোগ হয়েছে, তার মধ্যে কন্যা শিশু দিবস একটি। হয়তো শুনেছিলাম এরকম একটা দিবস আছে, কিন্তু আজ বিস্তারিত জানার সুযোগ হলো সার্চ ইঞ্জিন গুগুল ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে।
আসলে কবে কীভাবে কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়ে আসছে তার ইতিহাস আমার জানা নাই। গুগল ঘেঁটে যতটুকু জেনেছি ‘আন্তর্জাতিক কন্যা দিবসটি’ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালন করা হচ্ছে সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রোববারে। বাংলাদেশে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয় ৩০ সেপ্টেম্বর, আর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয় ১১ অক্টোবর।

৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। এবারের কন্যা শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য : ‘কন্যা শিশুর অগ্রযাত্রা, দেশের জন্য নতুন মাত্রা’ এই প্রতিপাদ্যকে ঘিরে সারাদেশে দিবসটি পালিত হবে।
আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস গোটা বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘ রাষ্ট্রসমূহ প্রতিবছর ১১ অক্টোবর তারিখে পালন করে। এই দিবসকে মেয়েদের দিনও বলা হয়। এ বছরে প্রতিপাদ্য, “My voice, our equal future”।

২০১২ সালের ১১ অক্টোবর তারিখে প্রথম এই দিবস পালন করা হয়েছিল। লিংগ বৈষম্য দূর করা এই দিবসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র সমূহ হল শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা, ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক তথা বাল্যবিবাহ।

কন্যা শিশুর প্রতি জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য রোধে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুষ্ঠু বিকাশের বিষয়টিকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে ২০০০ সালে তৎকালীন সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি সরকারি আদেশের মাধ্যমে শিশু অধিকার সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনকে কন্যাশিশু দিবস হিসেবে পালনের লক্ষ্যে ৩০ সেপ্টেম্বরকে ‘জাতীয় কন্যা শিশু দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। তখন থেকেই প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

এই বছরও দেশের প্রতিটি জেলায় এই দিবসটি পালিত হবে। নারায়ণগঞ্জ জেলায় এই দিবসটি পালিত হচ্ছে …‘শিক্ষা-পুষ্টি নিশ্চিত করি, শিশু বিয়ে বন্ধ করি’—এ প্রতিপাদ্য কে সামনে রেখে।

আমাদের দেশে নানান দিবস নিয়ে নানান মন্তব্য প্রচলিত আছে। যেমন নারী দিবস কেন হতে হবে, কন্যা শিশু দিবস কেন হতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেকেই হয়তো বলবেন খুব তো সমতার কথা বলেন তাহলে কারো কারো জন্য বিশেষ দিন কেন? আমি বলবো প্রয়োজন আছে বিশেষ দিনের।

সেই আইয়ামে জাহেলিয়া যুগে যদি একটু ফিরে তাকাই দেখতে পাবেন কন্যা শিশুদের অবস্থা কি ভয়াবহ ছিলো? ভাবলেই শিউরে ওঠে পুরো শরীর। সদ্য ভূমিষ্ট কন্যা শিশুকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো। মনে করা হতো কন্যা শিশু সমাজের বোঝা, তাদের বাঁচিয়ে রেখে কোন লাভ নাই। কিন্তু একটু ভাবুন তো বর্তমান যুগের কি খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে? যেখানে হেফাজত নেতা কিনা স্বয়ং কন্যাশিশুর পড়ালেখায় বাদ সেধেছিলেন। এখনো নারী হিসেবে কন্যা শিশুর মা হলেই শুনতে হয়, আহারে! তাকানোর ভংগিমায় যেনো অনেকটা তাচ্ছিল্যের ছোয়া। আর বাবার তো একমাত্র ভাবনা কখন কন্যার বিয়ে দিয়ে দায় মুক্ত হতে পারবো।এই সকল আমাদের দেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের নিদারুণ বাস্তবতা।

নিজের ঘর থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট, বাস, ট্রাম, মার্কেট, খেলার মাঠ, প্রাইভেট টিচার কোথাও কি একজন কন্যা শিশু নিরাপদ? আমরা কি পারছি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে?রাষ্ট্র কি পারছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে?? না পারছেনা, উপরন্তু কন্যা শিশু ধর্ষণের হার বেড়ে যেনো আকাশ্চুম্বি! কিছুদিন আগে একজন মায়ের সাথে কথা হচ্ছিলো। বলছিলেন, দিদি, “সত্যি বলছি নিজের কাছে ছোট লাগে তবুও বলছি কন্যা সন্তানের মা হতে চাইনা। “আমি বললাম কেন? তিনি যে কারণগুলো বললেন তার মর্মার্থ হলো, কন্যাশিশুর মা মানেই স্বামী, শ্বশুর থেকে সমাজ সবাই আপনাকে ছোট করে দেখবে। একটা ঘটনা বলি দিদি, আমি আমার মায়ের চতুর্থ সন্তান। আমার বড় বোন আছেন। আর একজন ছোট ভাই আছেন। আমার বড়বোন জন্মগ্রহণের পর দুইজন সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন। তবুও আমার বাবার এক কথা একজন ছেলে শিশু চাই-ই, চাই। এমনকি আমার দাদি আমার মাকে সবসময় পোড়া কপালা (মন্দ কপাল), অপয়া বলে ডাকতো। এই হলো আমাদের সমাজের বাস্তবতা।আজ এই উত্তরাধুনিকতার যুগে এসে সত্যি কি খুব পরিবর্তন করতে পেরেছি আমরা আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির!!

আজ অব্দি আমাদের সমাজে ছেলে শিশুকেই পরিবারের পিতামাতার আশ্রয়দাতা মনে করা হয়। মনে করা হয় এই ছেলে শিশুই একসময় পরিবারের হাল ধরবে।বংশ রক্ষা করবে। তাই ছেলে শিশুকেই মাছের বড় মাথা খাওয়াতে হবে, উচ্চ শিক্ষা দিতে হবে, যৌতুক দিয়ে বিয়ে করিয়ে সেই টাকা দিয়ে ছেলেকে চাকুরি দিতে হবে।

সমাজের এই বাস্তবতায় মায়েরা নিজেরাও নিরুৎসাহিত হোন কন্যাশিশু জন্ম দিতে। গর্ভাবস্থায় ভ্রুণ পরীক্ষা করে মেয়ে শিশুর অস্তিত্ব টের পেলেই গর্ভপাত করানোর প্রবণতা অনেক বেশি। যদি ও আইন করে ইন্ডিয়াতে ভ্রুণ হত্যা বন্ধ করে দিয়েছে কিন্তু তা কাগজে কলমে। কিন্তু কেন কন্যার ভ্রুণ হত্যা করা হয় প্রশ্নগুলো কি কখনো জোর দিয়ে করেছি কিংবা কারণগুলো কি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি? আমি জানি আমি, আপনি কিংবা রাষ্ট্র কেউই করিনি। আসলে কন্যাশিশুর পিছিয়ে পড়ার নেপথ্যের কারণ কী! বরঞ্চ কারণ না খুঁজে কীভাবে আরো মধ্যযুগে পাঠানো যায় সেই চেষ্টায় করা হয়ে থাকে আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়।

কাজের সুবাদে এক আলোচনায় একজন মা বলছিলেন, “যে ঘরে কন্যাশিশু আছে সেই ঘর কখনোই নিরাপদ না।”একজন মা কতটা নিরুপায় হলে এই কথা বলতে পারেন কখনো কি ভেবে দেখেছেন! তিনি আরো বলছিলেন, একজন মা কন্যাশিশু জন্ম দেয়া থেকেই তার যুদ্ধ শুরু হয়। আপনাকে সবসময় শুনতে হয় তোমার মেয়ে এইটা, তোমার মেয়ে ঐটা, তোমার মেয়ে এই পোশাক পড়ে সেই পোশাক পড়ে, তোমার মেয়ে রাস্তা দিয়ে হাটার সময় একজন ছেলের সাথে কথা বলেছে, মেয়েকে শাসন করো, কোন কাজ করেনা শুধু ঘুরে বেড়ায়। এবার মেয়েকে বিয়ে দাও তো বাপু। মেয়েকে এতো পড়ালেখা করিয়ে কী হবে?

এই হলো আপনার,আমার ঘরের অবস্থা!! কিন্তু বাইরে? সেটাও কি নিরাপদ!! রাস্তায় বের হলেই ওঁত পেতে থাকে কিছু কুলাংগার ছেলে, শিশু থেকে শুরু করে যুবক, বৃদ্ধ, হুজুর, আবাল, বনিতা সবাই। যেনো কন্যশিশু হলো মালিকছাড়া মুরগি, তাকে টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে খাওয়া যায় অতি সহজেই। এর নজির আমাদের ফেইসবুক, পত্রিকা সব জায়গায় চোখ রাখলেই দেখা যায়।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু এবং এদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই কন্যাশিশু। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও আজও দেশের অধিকাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের আগেই।(তথ্যসূত্র ঃ বাল্যবিবাহ আইন,২০১৮)।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে-২০০৭ এর তথ্য অনুযায়ী দেশে এখনও ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে এবং দুই দশক ধরে এ হারের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আর ১৯ বছরের আগেই গর্ভবতী হচ্ছে ৬৬ শতাংশের এক শতাংশ। বাংলাদেশে নারীর গড় বিয়ের বয়স ১৫ বছর ৩ মাস।

ইউনিসেফের তথ্যমতে, শিশু বিবাহের হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। গত ৩০ বছরে শিশুবিবাহ আনুপাতিক হারে হ্রাস পেলেও গ্রামাঞ্চলে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমস্যা প্রকট।

মানবাধিকার সংস্থার মতে কন্যাশিশু বিবাহের হার ৪৫% ।কিন্তু কোভিড-১৯ সময়ে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৩% ( তথ্যসূত্র: এসেসমেন্ট রিপোর্ট) এই হলো আমাদের অবস্থা! যে দেশে একটু ভালো খাবার, পুষ্টিকর খাবার আগে ছেলেদের দেয়া হয়, যদি বাঁচে তাহলে কন্যাকে, তরকারির উপরের পুষ্টিকর ঝোল ছেলে শিশুকে দেয়া হয়, সেই দেশে কন্যা শিশু দিবসের প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকি!!

দেশবাসীসহ সকল অভিভাবকদের প্রতি উদাত্ত আহবান, আসুন কন্যাশিশু দিবস পালন করি যথাযোগ্য মর্যাদায় আর কন্যাশিশুদের বোঝাতে সাহায্য করি, তারাও মানুষ, শুধু কন্যা নয়। গড়ে তুলি শিশুদের জন্য নিরাপদ আবাস।

লেখক
জিন্নাতুন নেছা
নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক।

শেয়ার করুন:
  • 74
  •  
  •  
  •  
  •  
    74
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.