শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে অপরাধ বাড়বেই

সাজু বিশ্বাস:

কয়েকদিন পর পর একই ধরনের অপরাধমুলক কাজ বার বার ঘটতে থাকলে মনে হয় যারা এই কাজগুলো করে তারা নিজেদের ব্যাপারে খুবই আত্মবিশ্বাসী।
মিজান নাম করে ছেলেটির মনে হয়েছে নীলা মেয়েটির প্রেম পাওয়া তার একছত্র অধিকার। এবং প্রেমে রাজি না হলে মেয়েটিকে প্রকাশ্য রাস্তায় দিনের আলোতে খুন করা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়।
রাস্তার ব্যস্ত জন-অরণ্যে কে বা কার খোঁজ রাখে! নীলার অসহায় ভাইটা হয়তো রাস্তার মানুষদের কাছে হাত পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে নিষ্ফল সাহায্যের আবেদন জানিয়ে অবশেষে কিছুক্ষণ আগে জীবিত ও সুস্থ থাকা বোনের মৃতদেহ নিয়ে বাসায় ফিরেছে।

অনেকেই বলবে, ঘরই মেয়েদের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। ঘরেই থাকো। চাকমা মেয়েটি রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল। কয়েকজন বাঙালি পুরুষ দলবেঁধে লুটপাট করার জন্য দেওয়াল ভেঙে তাদের ঘরে ঢুকে পড়ে। তারা শুধু লুটতরাজ করেই ক্ষান্ত হয়নি। বাড়তি হিসেবে মা বাবাকে বেঁধে ফেলে তাদের মেয়েটিকে পালাক্রমে নির্যাতন করে। ঘরের নিরাপত্তা কোথায় তাহলে! গত বিশ সেপ্টেম্বর একইভাবে দুই বোনকে তাদের ঘরের মধ্যেই গলাটিপে হত্যা করে এক বোনের প্রেমিক!

সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে সন্ধ্যায় স্বামীর সাথেই ঘুরতে গিয়েছিল মেয়েটি। এমন কিছু অপরাধ নয়। হয়তো সন্ধ্যা ঘুরে অন্ধকার নেমে আসায় রাস্তাটা নির্জন হয়ে যায়। সেই সুযোগে বিশাল ক্ষমতায় আত্মবিশ্বাসী কয়েকজন ধর্ষক মেয়েটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এইসব ধর্ষকেরা, খুনীরা ক্ষমতার আশেপাশেই বসবাস করে। কোনোও না কোনোভাবে তারা নিজেদের মনের মধ্যে এতটা আত্মবিশ্বাস জুটিয়ে ফেলেছে যে, — আমি বা আমরা যেকোনো কিছু করেই তা হজম করে ফেলতে পারি! যেকোনও কিছু! এমনকি তা ধর্ষণ হোক বা হত্যা!

শুধুমাত্র ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই দ্রুততম সময়ে অপরাধীর কঠিন শাস্তি এবং অপরাধের শিকার মানুষগুলোর ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা গেলে তবেই হয়তো যে কারোর জন্যই অপরাধের কাজে জড়ানোর আগে সেই বিচার এবং শাস্তির উদাহরণ মাথার উপরে ভারি হ্যামারের মত ঝুলে থাকতো। মুলতঃ মানুষকে চেপেচুপে গুছিয়ে রাখার জন্যই আইন। আর পরবর্তীতে মানুষেরা যাতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগে একবার হলেও পরিণামের কথা মনে করে সেইজন্যই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে শাস্তির বিধান করার নিয়ম।

মেয়েরা বরাবরই আমাদের সমাজে গুরুত্বহীন।
যখন হিন্দু মেয়েটি মারা গেল, তখন হিন্দু সংগঠনগুলো লাভ- জিহাদ- রেসিজম ইত্যাদি বলে প্রতিবাদ করছিল। যখন চাকমা মেয়েটি নির্যাতিত হলো, তখন সবাই আদিবাসীর উপর সেটেলার নির্যাতন বলছিল।

এরপরে কী? এর আগে কী?

রংপুরের নিহত দুই বোন মুসলমান ধর্মাবলম্বী। এমসি কলেজের মেয়েটিও তাই। আসলে ধর্মে কিছু আসে যায় না। মেয়ের সবচেয়ে নাজুক বিষয় হলো তার শরীর। সব মেয়েকেই এই আশঙকা নিয়ে জীবন কাটাতে হয়, কারণ শারীরিক নিগ্রহের জন্য বিচার চাইতে গেলে মেয়েদের সামনে নতুন সামাজিক ও মানসিক নিগ্রহ এসে হাজির হয়। পরিচিত পারিবারিক এবং সামাজিক ঘেরটোপের মধ্যেই নিরবে এইসব মেনে নিয়ে জীবন কাটায় বেশিরভাগ মেয়ে। কিন্তু যেখানে জীবন-মরণ অবস্থা চলে আসে, সেইখানে আর প্রতিবাদ বা নির্যাতনের কথা প্রকাশ করা ছাড়া উপায় থাকেনা।

যদি সত্যিই নারীর উপর সহিংসতা বন্ধ করতে হয়, তাহলে প্রত্যেকটা ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই অপরাধীর দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। দৃষ্টান্ত হল তাই, যা দেখে অপরাপর মানুষেরা পুনরায় এমন কোনো অপরাধমুলক কাজ করা থেকে বিরত থাকে। বিচারহীনতা, এবং নারীর প্রতি সংহিতাকে গুরুত্ব না দেবার ঘটনাই বারবার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছে। অপরাধীরা মনে মনে আস্ফালন করছে, আমার কে কী করবে!

মেয়েরা হলো সব দুই টাকার জিনিস। তার সাথে যা কিছু করা যায়। এমনকি কারো স্বামী বা ভাই যাদেরকে আক্ষরিক অর্থে মেয়েদের রক্ষাকর্তা বলা হয়, তারা সাথে থাকলেও এই ঘটনা ঘটছে। মানুষের মনের পরিবর্তন আনা, সমাজের পরিবর্তন আনা, এগুলো অত্যন্ত ফাঁপা কথা! কেউ অন্যায় করলে অতি দ্রুত সময়ে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে তার বিচার এবং শাস্তি নিশ্চিন্ত করা হোক, একটাই একমাত্র প্রত্যাশা। প্রতিটা অপরাধের জন্য প্রতিটা বিচারকাজ এবং প্রত্যেকটা শাস্তি, পরবর্তীতে কেউ অপরাধ করার আগে যেন মাথার উপর হাতুড়ির মত ঝুলে থাকে। অন্ততপক্ষে হকনক কিছু করার আগে মানুষ যেন সেই অপরাধের শাস্তির কথা ভাবতে শেখে, অপরাধীদের জন্য এমন শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

শেয়ার করুন:
  • 202
  •  
  •  
  •  
  •  
    202
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.