বিচারের বাণী বাজুক মঙ্গল শঙ্খে

ফাহমিদা জেবীন:

বাংলাদেশ সময় এখন রাত ২:৪৫। ছোট বাচ্চাটা বেশ অসুস্থ, আমিও খুব ক্লান্ত। তবুও বেচারাকে অনেক কষ্টে-সৃষ্টে ঘুম পাড়িয়ে আমার মতো অধমের প্রতিবাদের ভাষা বা হাতিয়ার যাই বলি- এই ‘কলম’ নিয়ে বসেছি। ক্ষমতার দাপট উপড়ে ফেলে বিচারের আশা নিয়ে দাবি জানাতে। তা নাহলে নিজেকে মানুষ পরিচয় দেবো কী করে? আজকাল লিখতে গেলেও নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয়। কারণ সবারই এক ধ্রুব সত্য জানা, যা প্রকাশ্যে বলতে মানা- “কেউ গরু খায় না, কেউ শুয়োর ছোঁয় না; কিন্তু একটা জায়গায় এসে উপচে পরে সকল জাতির উদারতা; কেবল ‘নারী’ মাংসেই আটকে যায় অসাম্প্রদায়িতা”।

খবরে প্রকাশ ২৪ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) খাগড়াছড়ি জেলার সদর উপজেলার ১নং গোলাবাড়ী ইউনিয়ন সংলগ্ন বলপিয়ে আদাম গ্রামে নিজ বাড়ীতে নয় জন বাঙালি সেটেলার (পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত বাঙালি) কর্তৃক মানসিক প্রতিবন্ধী এক জুম নারী গণধর্ষিত হয়। এর পরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ছবি আমায় ভয়ানকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। যেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পাহাড়ী এক নারীকে তার বাবা-মা ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। জাত-পাত, ধর্ম, গোত্রের ঊর্দ্ধে উঠে ঐসব ভিকটিমদের অবয়বে তাই আমি নিজেকে, আমার মেয়েকে, আমার মাকে দেখতে পাই। সবার উপরে দেখতে পাই ধর্ষিত মানবতা আর বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার-আমার দেশ; ১৬ কোটি সন্তানের প্রাণের ভূমি বাংলাদেশ। লজ্জা আর যন্ত্রণার বিষয় হলেও যেখানে আজও নারীর জন্য সব আইন-কানুন মুখ থুবড়ে আছে। তাই এই সমাজ এখনো সুস্থ-সবল মানুষের জন্য অপ্রস্তুত। এর চেয়ে ভয়ানক আর কী হতে পারে? তবুও কি আমাদের বোধদয় হয়েছে?

এখনো ছোট থেকে বড়, ডাইপার পরা শিশু থেকে বৃদ্ধা প্রতিটি নারী অনিরাপদ। এই অনিরাপত্তার জন্য কি বনের জন্তু-জানোয়ার দায়ী? জনমানবহীন পথে হেঁটে যাবার সময় অচেনা কোন ছেলে/পুরুষকে দেখে আমরা যতটা ভয় পাই, ততটা একটা পাগলা কুকুরকেও পাই না। কেন পাইনা? কারণ আমরা জানি, ভিকটিম ব্লেমিং করে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার সাধ্য ঐ কুকুরের নেই। রাজধানীর মতো আপাত উন্নত জায়গায় অবস্থান করে যেখানে আমাদের এ অবস্থা, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন পাহাড়ী নারীর কী যোগ্যতা?

মাথার উপরে কাঁচের মতো স্বচ্ছ নীল আকাশ, সমুদ্রের বিশালতা, পাহাড়, পাহাড়ী ঝর্ণা আমায় স্বর্গের প্রশান্তি আর স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়। আমার এই ছবিটিও কিন্তু সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান জেলার নীলাচল নামক পর্যটন কেন্দ্রে তোলা। অনুভূতি ও সৌন্দর্য্যের টানে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েছি বেশ ক’বার। সেই সুবাদে পাহাড়ীদের বাঁশ করোল (এক ধরনের সবজি), বিন্নী ভাত, বাঁশ মুরগীর মতো পাহাড়ী খাবারগুলো খেতে ও কীভাবে রান্না করতে হয়, তাও কিছুটা আয়ত্ত্ব করেছি বৈকি! সেইসাথে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি তাদের সরল, প্যাঁচবিহীন, অনাধুনিক জীবনাচরণ। যেখানে তাদের অধিকাংশই আমাদের মতো সচল আর উন্নত জীবনের জন্য গ্রাম তথা পূর্বপুরুষের ভিটা ছেড়ে শহরে এসে বসবাসে অভ্যস্ত নয়। বরং প্রজন্মান্তরে পূর্ব পুরুষের ভিটা আঁকড়ে ধরে চাষ-বাস করে জীবন পাড়ি দিচ্ছে। কিন্তু আমরা সেখানও বাম হাত রাখতে যাই।

লোকমুখে শুনেছি বিভিন্ন জেলা হতে স্থায়ীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত মানুষদের সেটেলার বলে থাকে। সমতলের সেই তথাকথিত সভ্য বাঙালিদের তারা সহ্য করতে পারে না। এ অপছন্দের পেছনে তাদের যে যুক্তি বা কারণ তা কি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক? তা কি একেবারেই কানে না তোলার মত? যতদূর জানি পাহাড়ে ধর-পাকড়, হত্যা, ধর্ষণ, গুম অতীতেও বহুবার ঘটেছে। সার্বিক সৌন্দর্য ও শান্তির আশায় অনেকেই শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, জানাচ্ছেন। তাদের ন্যায় আমিও চাই, দাবি জানাই, জানাচ্ছি, জানাবো। ধান, চাল, খুদ, ভাত ছিটিয়ে ধর্ষক না পুষে ক্ষমতার লম্বা হাতকে সরিয়ে আইনের আশ্রয়ে ঠেকানো হোক এই সাম্প্রদায়িকতা।

মানছি এ ধরনের ঘটনাগুলো আমার মতো অনেকেই দ্বিখণ্ডিত করে দেয়। প্রশ্ন আসে, তবে কিছু সুশীল, লেখক, কবি, সাংবাদিক, মানবতাবাদীরা এতো চুপ কেন? রাষ্ট্রযন্ত্র, আইন-আদালতকে শুধু ধিক্কার দিয়ে বা ঘৃণা জানিয়ে শেষ করা যাবে! কিন্তু তাতে সমাধান হবে না। খুব করে তাই চাওয়া শুধু একটাই; এমন দিন আসুক যেদিন পাহাড়ি-বাঙালি সকল নারীর প্রতি সহিংসতা আনচ্যালেঞ্জেড, আনপানিশড যাবে না। বিচারের বাণী আর নীরবে না, সে বাজুক মঙ্গল শঙ্খে!!

শেয়ার করুন:
  • 167
  •  
  •  
  •  
  •  
    167
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.