আমরা কি তাহলে ধর্ষণের অভয়ারণ্যে বসবাস করছি?

জিন্নাতুন নেছা:

“ভাই, বাংলার নারীবাদ হইলো পুরুষ হইতে না পারার আক্ষেপ থিকা নারীবাদ, সো চুপ তো থাকবেই “- জনৈক এক বড় ভাইয়ের উক্তি। কোন এক বড় ভাইয়ের ফেইসবুক স্ট্যাটাসে এই কমেন্ট চোখে পড়লো। আমি সত্যই জানি না কেন, কোন চিন্তা থেকে তিনি এই কমেন্ট করেছেন, তাও আবার নৃবিজ্ঞানের সাবেক ছাত্র হয়ে!

কেন তার মনে হলো পুরুষ হতে না পারার আক্ষেপ থেকেই বাংলার নারীবাদ চুপ করে বসে আছে, কোন প্রতিবাদ করছে না। তার কমেন্টের মর্মার্থ হলো সকল নারীবাদী লিংগে নারী এবং তাদের একমাত্র কর্ম পুরুষ হবার বাসনা। জনাব, জেনে নিবেন এই বাংলায় অনেক পুরুষ নারীবাদীও আছেন।আপনার জ্ঞাতার্থে বলে রাখি, নারীবাদী আন্দোলনের ফলেই সমাজের আজ এই পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিছুদিন পূর্বেই ধর্ষণ করে ৫০০-৫০০০ টাকার বিনিময়ে এলাকার মেম্বার চেয়ারম্যান দিয়ে মিটমাট হয়ে যেতো, তা কিন্তু এখন আর হয় না। নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম সফলতা হলো ‘মি টু’ আন্দোলন, যা নারীকে সাহসী করে তুলেছে। যাই হোক, এই আলোচনা আর বাড়াবো না। আমার উদ্দেশ্য এই আলোচনা নয়।

ফেইসবুকের নিউজ ফিড জুড়ে একক রেইপ, গ্যাং রেইপ, আদিবাসী রেইপ সবকিছু যেনো ছড়াছড়ি। তাও ভালো, খবর তো আসছে বিচার হউক বা না হউক। তবে ফেইসবুক পাড়া কিন্তু খুব একটা সরগরম হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কেন? যিনি রেইপড হয়েছেন তিনি আদিবাসী নারী বলে? আরেকজন যিনি রেইপড হয়েছেন, তাকে কিছু বিশেষ শ্রেণির, বিশেষ দলের শ্বাপদেরা টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়েছুড়ে ফেলেছে বলে? এই বিশেষরা যাদের ছত্রছায়ায় থেকে পাহাড়ে এই কাজগুলো নির্বিঘ্নে করছে, সমতলেও করছে, তাদেরকে আমরা সবাই চিনি, কিন্তু ভাসুরের নাম মুখে আনতে মানা।

করোনায় সকল স্কুল কলেজ বন্ধ। তাহলে এমসি কলেজের হোস্টেল খোলা কেন? সেখানে ছাত্রলীগের নামে বরাদ্দ করা রুমে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করেছে ৭/৮ জন মিলে। সব যখন বন্ধ, তাহলে ওরা হল রুমে কী করছিলো? আর হলরুমই বা খোলা থাকলো কেন?

ও হ্যাঁ! আর একটা নাটক তো চলছে সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক যিনি ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র তার নামে মামলা করেছে। বর্তমানে ফেইসবুক, মিডিয়া, সংবাদ সবই যেনো নুরুল হককে নিয়ে ব্যস্ত। আর নীলা সে আর কোথাকার কে! দেশের এক আনাচে পড়ে থাকা নারী! যাকে একেবারে শেষ করে দেয়া হয়েছে! আর বাবা-মা বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন! রাষ্ট্র এই লজ্জা কই রাখবেন! বিচার করতে না পারলে গদি ছাড়ুন! আজ পর্যন্ত কোন ধর্ষণের বিচার করতে পেরেছেন?? যা করেছেন বিচারের নামে প্রহসন? না, কারো বিচার হয়নি। বিচার আমরা পাইনি। তনু হত্যার বিচার পাইনি, নুসরাত হত্যার বিচার পাইনি, আফসানা হত্যার বিচার পাইনি। এতো বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারের নামে প্রহসনই দেশটাকে ধর্ষণের অভয়ারণ্যে পরিণত করছে।

আজকাল ফেইসবুক খুললেই ধর্ষণ, খুন, ক্রসফায়ার এসব নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তাই আর এসবে গায়ে মাখাতে ইচ্ছে করে না। তবে কষ্ট যে হয় না তা নয়! বুকের ভেতর জ্বলে যায়! ভয়ে কুঁকড়ে যাই! ছেলেটাকে নিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। মনে হয় যেনো এই দেশটা একটা ধর্ষণের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। যেখানে যার যা ক্ষমতা সে সেটা প্রদর্শন করতে ব্যতিব্যস্ত।

রেইপ হলো ক্ষমতা প্রদর্শনের একটা অস্ত্র। যেটা বহুবছর আগে থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যেমন রোহিংগা নির্বাসনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন। প্রায় ১১ লাখ রোহিংগা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আপনি যদি যুবতী নারীদের সাথে কথা বলেন তাহলে বুঝবেন কী ভয়ানক ছিলো তাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলো। রোহিংগা ক্যাম্পে কাজ করার সুবাদে অনেক ঘটনার সাক্ষী হতে পেরেছি। কত যে চোখের জ্বল নীরবে ঝড়েছে তা বলতে পারবো না! আজো কাহিনীগুলো মনে হলে বুকের ভেতর ভয়ে কাঁপতে থাকে।

আচ্ছা বলুন তো কেন এই ধর্ষণের খেলা? হ্যাঁ! আমি খেলাই বলবো! খেলা নয়তো কী! আপনি জানেন কাউকে ধর্ষণ করলে আপনি এরেস্ট হবেন, থানায় আপনাকে উত্তম মধ্যম দিবে কিছুটা হলেও। এরপর জেলে। তারপর হয়তো আপনি মামা, খালু, রাজনীতি সবকিছুর বদৌলতে পার পেয়ে যাবেন।কিন্তু এইটুকু সময়ের যে শাস্তি, সেটাও আপনাদের ভাবায় না! এতো সাহস কোথা থেকে পান? কে জোগায় আপনাদের?

এইতো সেদিন একজন বড় ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিলো। তার একমাত্র মেয়ে। ভালোবেসে এঞ্জেল বলে ডাকেন। শিশুটির বয়স ৬-৭ বছর। বাবা হিসেবে এখনই তিনি এতোটাই ভীত যে বলছিলেন, আমি একজন চাকুরীজীবী বাবা। আমার মেয়েকে যখন স্কুলে দেবো, কে নিয়ে যাবে স্কুলে, কে নিয়ে আসবে স্কুল থেকে! বন্ধুদের সাথে ঘুরতে দেবো, কোন ভরসায় দেবো! আপনি কি বুঝতে পারেন মাননীয় রাষ্ট্র, একজন বাবা -মা কতটা শংকিত থাকে তার সন্তানদের নিয়ে।

সেদিন শিশু ফোরামের কিশোর-কিশোরীদের সাথে দলীয় আলোচনা করছিলাম। সকলেরই এক কথা বাবা-মা আমাদের বিশ্বাস কর‍তে পারে না। কারণ হলো স্কুল, প্রাইভেট কিংবা বিকেলে ঘুরতে বেরুলে ৫ মিনিটের জায়গায় ১০ মিনিট হলেই নানান প্রশ্ন, নানা চিন্তায় তারা অস্থির হয়ে থাকে। সত্যি বলছি দিদি আমাদের ভালো লাগে না! আপনি একবার ভাবুন তো এই ঘটনার গভীরতা!! ভেবেছেন!! বাবা -মা সন্তানদের নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন। সন্ধ্যা হয়ে এলেই বাবা-মা শুধু সেই ক্ষণটা জপতে থাকে যে, মেয়েটা ফিরবে কখন? ঠিকঠাক ফিরতে পারবে তো? এদেশের সবচেয়ে উদ্বিগ্ন আশংকিত মানুষটা হলো কন্যা সন্তানের পিতা। কিন্তু সেই কন্যা সন্তানই তার অভিভাবকদের ভুল বুঝতেছে। হয়তো ভবিষ্যতে এর পরিণাম আরো ভয়াবহ হওয়া খুব স্বাভাবিক নয় কি?

আদমদিঘী আমার থানা, সেখানে নাকি একজন মেয়েকে ধর্ষণ করে টুকরো টুকরো করে বস্তাবন্দি করে পুকুরের ধারে ফেলে গিয়েছে। আমার মা ফোন দিয়ে সেকী কান্না! আমি যেনো ভালো হয়ে চলি! সন্ধ্যার পর বাইরে বের না হই, ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও মাঝে মাঝে রাগ হয়। কিন্তু আবার ভাবি, বাবা মায়ের চিন্তা কিন্তু অমূলক নয়। মা হিসেবে আমি যেমন সারাক্ষণ ভাবি ছেলেটা কী করছে, কোনো বিপদে পড়েছে কিনা!

৩১ বছর বয়স আমার। অফিস থেকে ফিরতে অনেক সময় রাত হয়ে যায়। সত্যি বলছি আর সাহস পাই না একা একা অন্ধকার পথে ১০-১৫ মিনিট হেঁটে হেঁটে ফিরবো। তাহলে বলুন কোথায় আমাদের নারী নিরাপত্তা??
সন্ধ্যা হয়ে গেলে একটা সামান্য সিএনজিতে উঠতে সাহস পাই না। দশ বার ভাবি, আচ্ছা একা উঠবো, ঠিক হবে তো! আর একটুক্ষণ না হয় অপেক্ষা করি! আরো কিছু লোক না হয় আসুক! এই হলো আমাদের নারীদের নিরাপত্তা!

শুধু শহর নয়, নিজের গ্রামেও একজন মেয়ে নিরাপদে ঘুরতে পারে না। রাতে বাড়িলাগোয়া টয়লেটে যেতে পারে না একা। দ্বিপদ জন্তুরা যদি ঘাপটি মেরে থাকে! স্কুলের পথে ইভটিজিং তো কমন বিষয়! মেয়েটিকে পোশাকের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। মাধ্যমিকের গণ্ডিতে পরলে বোরকা ছাড়া বের হওয়ার সাহস পায় না। তার পছন্দের পোশাক, ভালো লাগা ততদিনে যাদুঘরে চলে যায়।

একটা মেয়ে খোদ রাজধানীর রাস্তায় একটা বাইক চালানোর সাহস পায় না। চালানোর সাহস তো দূরের কথা! উবার কিংবা পাঠাও যদি আপনি নারী হিসেবে ব্যবহার করেন তাহলে তো বাকা চোখের অভাব থাকবে না? কত কটু কথা যে আপনাকে শুনতে হবে তার ইয়ত্তা নাই! সাইকেল চালানোর তো প্রশ্নই নাই। ফুটপাত ধরে হাঁটতে পারে না, গাউসিয়ায়/ফার্মগেটের অযথা ভিড় লেগে থাকে শুধু মেয়েটার গায়ে হাত দেয়ার জন্য।

মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৪১৩ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে।আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছে ১০ জন নারীকে। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২ জন, যা ২০১৯ এ এসে বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। অথচ একটা ঘটনার বিচার হয় নাই। আজ অব্দি একটারও না! এমন কোন নজির এখনো কোথাও নাই যে ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তি রাষ্ট্র দিতে পেরেছেন। এরকম বিচারহীন অসভ্য নির্লিপ্ত আইন, আর কোন দেশে দেখা যায় কিনা আমার বোধকরি জানা নাই।

মানুষ কেন ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে?
কারণ,

#ধর্ষক বুঝে গেছে রাষ্ট্র বা আইন যথোপযুক্ত ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে না।
#ধর্ষকের উপর দলীয়, রাজনৈতিক ও সরকারি হস্তক্ষেপ বিদ্যমান।
#শাস্তি হবে না, কিংবা যেকোনো উপায়ে ছাড়া পাওয়া সম্ভব হবে এই ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত থাকা।
#ধর্ষণকে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রকাশের চূড়ান্ত হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা।
#ধর্ষকের নয়, সার্ভাইবারের ‘ইজ্জত’ বা ‘সম্ভ্রম’ নষ্ট হয় – এই চেতনা প্রতিষ্ঠিত থাকা।

আর আপনারা বলেন, আমরা মধ্যবিত্ত দেশ? উন্নয়নে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ? একটা দেশের গ্রাম, পাহাড়, নদী, শহর, খোদ রাজধানীতে একজন নারী তার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না, তার পছন্দের পোশাক পরতে পারে না, তার ন্যুনতম নিরাপত্তা নাই, বাসে উঠার আগে দেখতে হয় কয়জন যাত্রী আছে, সন্ধ্যার হিসাব মিলিয়ে পথ চলতে হয়, বাহন ঠিক করতে হয় রাতের হিসাব করে – সেই দেশ উন্নত? সেই দেশ শিক্ষিত, সভ্য, সোনার বাংলা।।

আহারে! সোনার বাংলা!! আহা!!

শেয়ার করুন:
  • 87
  •  
  •  
  •  
  •  
    87
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.