ঈশ্বরের উজ্জ্বল মুখ

লুসিফার লায়লা:

মনুষ্যত্বের পাঠশালাগুলোর ঝাঁপ পড়ে গেছে কখন আমরা টের পাইনি! কিন্তু আমাদের নারী শিক্ষার হার সত্যি হাততালি দেবার মতো। বিধবা বিয়ের আয়োজন উদারচিত্তে করবার মানসিক গড়ন দেড়শ বছরেও খুব পরিবর্তন হয়েছে কি? বালিকা বিয়ে, বহু বিবাহের হার কমেছে, কিন্তু দেড়শ বছরে সেসব শূন্যের কোটায় নেমে আসেনি!

বাংলা ভালো বলতে পারা, সে আজকাল আর গুণের মধ্যে পড়ে না, বরং ইংরেজি কত চোস্ত হলো তাতে আত্মসম্মান চকচকে হয়। অথচ আপনি বাংলাভাষা শেখার গুরুত্ব আঁকড়ে বাংলা বর্ণমালা সাজালেন ইংরেজি প্রাইমারের ছাদে। আধুনিক বাংলা গদ্যের দ্বার অবারিত করে দিয়ে হয়তো ভেবেছিলেন কালে কালে এ ভাষা …।
বর্ণ পরিচয় দ্বিতীয় ভাগে শিশুর আনন্দপাঠের কথা ভেবে একটা গল্প জুড়ে দিয়েছিলেন সেই কবে। ধারণা করা হয় সেটাই আমাদের শিশু সাহিত্যের প্রথম লিখিত পূর্ণাঙ্গ গল্প। একদিন সময় করে আসবেন আমাদের শিশু একাডেমির উঠোনে, সবুজ চায়ে গলা ভিজিয়ে জেনে যাবেন কেমন ধুঁকছে শিশু সাহিত্য। একটা লম্বা ছুটির দিন হাতে নিয়ে আসবেন আমাদের সময়ে। আমি আপনার হাত ধরে দেখাতে নিয়ে যাবো সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার খুঁটিতে যে গাধা বাঁধা আছে তার সামনে যে রাঙামূলা তার দাম কেমন!

ঝড়ের রাতে দামোদর সাঁতরে বাড়ি ফেরা মাতৃভক্ত ছেলেটির গল্প এখনও আছে, গল্প আছে তার প্রশস্ত দক্ষিণ হস্তের অবারিত দানের। লাট সাহেবের মুখের উপর জুতো তুলে ধরবার গল্পে বাচ্চারা খুব হেসে লুটোপুটি খায়, বড়রা দারুণ আনন্দ কুড়িয়ে নেন তা থেকে। পাঠ্য বইয়ে রূপকথা আর ঈশ্বরের বাণীর জায়গায় পদার্থবিদ্যা আর বিজ্ঞানীদের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করে দিয়ে বিজ্ঞান চেতনা জাগাবেন ভেবেছিলেন! অথচ কী অপূর্ব রূপকথা হয়ে আপনি ফিরছেন বড়দের মুখে মুখে!

মাতৃভাষায় পাঠদান হলে সমাজের উপর নিচ সব একপাতে খাবে এমন ভাবনা খুব দুঃসাহসী এবং ভারী ক্লাসলেস। শ্রেণী চেতনা নস্যাৎ করবার ষড়যন্ত্র ফাঁদার দায়ে আপনি এলিট সমাজে পূজিত হতে পারলেন না, অথচ দুশো বছর বয়েস গুনলেন আঙুলের কড়ে! ওদিকে রবীন্দ্রনাথ আপনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পৌঁছে দিতে চাইলেন মানুষের মনে। তিনি লিখলেন, “আমাদের দেশে প্রায় অনেকেই নিজের এবং স্বদেশের মর্যাদা নষ্ট করিয়া ইংরেজের অনুগ্রহ লাভ করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর সাহেবের হস্ত হইতে শিরোপা লইবার জন্যে কখনো মাথা নত করেন নাই; তিনি আমাদের দেশের ইংরাজপ্রসাদ গর্বিত সাহেবানুজীবীদের মতো আত্মঅবমাননার বিকৃত সম্মান ক্রয় করিতে চেষ্টা করেন নাই।”

লুসিফার লায়লা

সমাজের চরিত্র বুঝে সমাজ ভাঙবার রসদ সংগ্রহ করেছিলেন, মনুসংহিতার সামনে পরাশরকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ধর্মের যাঁতায় ধর্মকে পিষেছেন অথচ কোথাও ভাঙলাম ভাঙলাম বলে ত্রাহি চিৎকার নেই! ধর্মকে নিজের আত্মা থেকে এমনভাবে সরিয়ে নিলেন যেন গা থেকে চাদর খুলে রাখলেন অপ্রয়োজনীয় বলে। দেবীর সামনে নত হতে বলায় যার পায়ের কাছে গর হয়েছিলেন দেবী জ্ঞানে, তিনি আর কেউ নন, দেবীরূপেন সংস্থিতা মা। ভগবতী দেবী আর ঈশ্বরচন্দ্র হরিহর আত্মা জেনে অবাক হতে পারেন, কিন্তু সত্যি হচ্ছে এই মা ও সন্তান একে অন্যের অবিচ্ছেদ্য। তাই সন্তান যখন প্রশ্ন করেন, যে টাকায় পূজা হবে সে টাকায় অসহায় মানুষের উপকার হলে ভালো হবে নাকি পূজা? দ্বিধাহীন উত্তর এসেছিলো, অসহায়ের কাজে লাগলে পূজার প্রয়োজন বোধ করছি না! ইনি সেই মা যিনি ঈশ্বরতুল্য সন্তানের কোলের কাছে ‘বিধবার দুঃখ লাঘব করিও’ বলে চোখের জল ফেলেছিলেন। ১৮৫৬ সালে নিজের জীবন বিপন্ন হবে জেনেও পাস করিয়ে নিয়ে এসেছিলেন বিধবা বিবাহ। নারীর মুক্তি যে শিক্ষায় সে কথা জেনে বালিকা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে বেড়ালেন শহরে গ্রামে। এতো বড় সংষ্কার কাজ করলেন অথচ দাবি তুললেন না, প্রস্তাব উপস্থাপন করলেন! মানুষের কল্যাণে অন্যায়ের সামনে অনমনীয় শিরদাঁড়া টান টান করে দাঁড়ালেন, অথচ শেষ বয়সে মানুষের কোলাহল এড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছেন!

মনুষ্যত্বের অবক্ষয় তাকে যে বিপুল নৈরাশ্য দিয়েছিলো সে নৈরাশ্যের ভার বয়ে নাগরিক জীবন থেকে দূরের কার্মাটারে সাঁওতালদের সহজ জীবনের আশ্রয়ে চলে গেছিলেন। দুপা এগিয়ে দশ পা পিছিয়ে আমাদের সমাজ তার জন্মসাল থেকে দুশো বছর পেছনেই পড়ে রয়েছে, কেবল তাঁর জন্মবর্ষ চলেছে দুশোর সীমানা অতিক্রম করে অসীম কালে।

আমারদের ছেলেবেলায় তার জীবন রূপকথার মতই আলোচিত হতো। বড় হয়েছি সেই রূপকথার জীবন পাঠ করে, কিন্তু আমাদের বাবা সেই রূপকথা শোনাতে গিয়ে যতবার তাঁর নাম উচ্চারণ করতেন, ততবার গভীর আস্থায় বলতেন “নেক্সট টু গড”! এই লেখায় অনেকগুলো আশ্চর্য চিহ্ন দিয়েছি ইচ্ছে করেই, কারণ এই লেখায় আমার পরমাশ্চর্য যাপন, কেননা আমি মনে করি ঈশ্বর সমস্ত চমৎকারিত্বের ভাঁড়ার উপুড় করে জীবন নির্মাণ করেন। ঈশ্বর ভাবনায় যে মুখ উজ্জ্বল আলো ছড়ায়, তিনি বীরসিংহ গ্রামের ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ যার সম্পর্কে লিখছেন, “দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।”

(ফিচারে ব্যবহৃত বিদ্যাসাগরের এই পোর্টেটটি এঁকেছেন আরিফুজ্জামান মোহন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।)

শেয়ার করুন:
  • 212
  •  
  •  
  •  
  •  
    212
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.