কাঁটা বিছানো পথে আর কতদূর যেতে হবে?

কাকলী তালুকদার:

নেত্রকোনায় চমৎকার আয়োজন করে দূর্গাপূজা হয়।
সারা বছর খুব অপেক্ষা করতাম দূর্গা পূজার আনন্দটুকু উপভোগ করবো সেই আশায়। নতুন জামা, জুতা পরে সবাই মিলে পূজা দেখতে যাবো। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই পূজোর আনন্দটা ফিকে হয়ে আসলো। পূজোয় বের হলেও একটা আতঙ্ক কাজ করতো মনের ভিতর।
পূজায় মানুষের খুব ভীড় হতো। বাইরে বের হলে আমরা খারাপ স্পর্শ ছাড়া কখনোই বাসায় ফিরতে পারিনি, পরে আর বের হতেই ইচ্ছে করতো না এই সকল অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের কারণে।

কাজগুলো কারা করতো বা এখনও করে? তারা সবাই আমাদের কারোর না কারোর পরিবারের! কিন্তু এই নোংরা কাজটি তারা কেন করে? তার বিনিময়ে আমার মতো সবাই একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকে। এই সমাজটা কে বা কারা লালন পালন করছে?
আমাদের আতঙ্ক এবং নিরাপত্তার কথা ভাবার মতো সমাজ কি তৈরি হয়েছে এখনও? না হলে কেনো হচ্ছে না?

তখন ক্লাশ নাইনে পড়ি, স্কুলে যাওয়ার পথে এক ছেলে পিছন পিছন হাঁটছে আর বলছে, আমি তোমাকে ভালবাসি, রাজী না হলে এসিড মারবো! আমি বললাম, এসিড নিয়ে আয়, দেখি তোর সাহস। বাসায় এসে বড় ভাইকে কয়েকদিন বলেছি, পাড়ার ছেলেরা স্কুলে যাওয়ার সময় বিরক্ত করে। বড় ভাই নরম স্বভাবের মানুষ, প্রতিবাদ করতে পারবে না এই সব ঘটনার। আমাকে বলে স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। এরপর আর কোনদিন ভাইকে বলিনি কোন সমস্যার কথা। সমস্যাগুলোর সমাধান নিজে করেছি, প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছি মনের মধ্যে হাজারও ভয় কাজ করতো পথে চলতে গিয়ে। তবে থেমে যাইনি কখনো।

আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাটা কে বা কারা নিশ্চিত করবে? এই সপ্তাহে সাভারে নীলা মেয়েটিকে একজন মিজান খোলা রাস্তায় খুন করে ফেললো! এর আগেও অনেক অনেক মেয়ে খুন হয়ে গেছে, প্রতিদিনই যাচ্ছে। আমাদের মেয়েদের পরিবারগুলো কতটা অসহায় বোধ করে এই পরিস্থিতিতে? অনিয়ন্ত্রিত, অনিরাপদ একটি সমাজ কেমন করে বিস্তৃত লাভ করে? দায়িত্বহীনতাটা আসলে ঠিক কোথায়?

ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের গেইটে এক ছেলে আমাকে কিছু দিয়ে পিছনে ঢিল দিলো। পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করলাম কাজটা কে করলো? কেউ কোন উত্তর দিলো না।
পাশেই দেখি আনন্দমোহন কলেজের প্রাক্তন ভিপিসহ কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরকে কিছু না বলে প্রিন্সিপালের রুমে সরাসরি গেলাম। স্যারকে বললাম, গেইটে আমাকে কেউ একজন ঢিল দিয়েছে, আপনাকে এটা সমাধান করতে হবে। স্যার খুব অনিচ্ছা নিয়ে আমার সাথে আসলেন এবং দেখলেন গেইটের সামনে ভিপিসহ কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। তখন সবাই আমার দিকে মনোযোগ, ভিপিও এগিয়ে আসলো স্যারের সাথে। স্যার ভিপির নাম ধরে বললেন, ওকে না বলে তুমি আমার কাছে গেলে কেনো? আমি বললাম, ওরা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আমার উপরে যেহেতু ঢিলটা পড়েছে, ওরা এই সমস্যা সমাধানের উপযুক্ত নয়! তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো উপস্থিত সবাই। আমার সাথে কেউ ছিলো না সেদিন, আমি জানি তখনও আমি একা। স্যারও ভিপির সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। চোখের জল মুছতে মুছতে বাসায় ফিরলাম, আর সিদ্ধান্ত নিলাম কোন হারামজাদার কাছেই আর কোনদিন বিচার দিবো না। এরপর যা করার নিজে করবো এবং কৈফিয়তও কাউকে দিবো না। আমাদের সমাজের মেয়েরা ‘পুরুষতান্ত্রিক’ একটা আতঙ্ক নিয়ে বড় হয়! পরিবার থেকে রাষ্ট্র সর্বত্র মেয়েরা একটা অনিরাপদ পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠে! ঠিক কী কারণে এবং কাদের কারণে এই অনিরাপদ পরিবেশ?
কোন মেয়ে নীরব একটা পথে একা হেঁটে গেলে একজন অচেনা ছেলেকে দেখলে যতটা ভয় পায় একটা কুকুরকে দেখলেও সেই ভয়টা পায় না! এই যে ভয়, আতঙ্কের পরিবেশ কারা তৈরি করেছে? এর পরিত্রাণ কোথায়?

তখন আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তখন কাজ করি। কাগজে পত্রে বেশি বেতন দেয়ার কথা থাকলেও আমাদেরকে কম বেতন দেয়া হতো। বোনাস পেতাম না আমরা, উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন শুধু বোনাস পেতো। আমার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করলাম। এরপর থেকেই আমার ফোনে বিভিন্ন নম্বর থেকে খারাপ খারাপ কথা বলে ফোন আসতে থাকলো। একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসেবে পুরস্কৃত হলাম মানসিক অত্যাচারের মাধ্যমে।
বেশীরভাগ কলিগরা বললো, যাও বসের কাছে ক্ষমা চাও! আমি রিজাইন দিলাম। তারপর রাগ অভিমানে শহরটাও ছেড়ে দিলাম। আমি কিন্তু জানতাম ফোন নাম্বারটা কে ছড়িয়ে দিলো বিভিন্নজনের কাছে আমাকে হেনস্থা করার জন্য! উনি হয়তো জানেন না, আমি উনাকে খুব ভালো করেই চিনি।

প্রতিবাদটা সব জায়গায় একই স্টাইলে করা যায় না পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে। আমার কাছে যেটাকে বড় অপরাধ মনে হয় অন্যদের কাছে সেটা হয়তো অপরাধই মনে হয় না! আমাদের মূল্যবোধগুলো সবার কাছে হয়তো একরকম গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু নারী হিসেবে খুব সহজেই আমাদের সমাজের মেয়েদেরকে হেনস্থা করা হয়!

অফিসের কাজে একা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। একবার ফেনীতে বাসে উঠার পর একজন খারাপভাবে স্পর্শ করলো, ঘুরিয়ে একটা চড় দিলাম বেটাকে। ঐ লোক আমাকে আবার জিজ্ঞেস করে মারলেন কেনো আমাকে? আমি বললাম, তুই আরো মাইর খাবি বাস থেকে যদি এখন না নেমে যাস। তখন তো আমার শরীরে দুর্গার মতো শক্তি এসে গেলো। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করছে, কী হইছে? আমি বললাম, কী হইলে একজন পুরুষকে মেয়েরা পিটায়? আমার চিৎকার শুনে ঐ লোক বাস থেকে নেমে গেলো। বাসে আমার সাথে কেউ ছিলো না সেদিন।
যা করার আমাকেই করতে হবে। বাসের সবাই আমার উপর বিরক্ত হলো। আমার মাইর দেখে এক বয়স্ক লোক তার পাশের এক নারীকে গলার জোর বাড়িয়ে সরতে বললো। আমার প্রতিবাদ বাসের কেউই পছন্দ করেনি সেদিন। বাকি পথটা আমার পাশের সিটটা খালি পড়ে রইলো।

এইরকম হাজারও টুকরো টুকরো ঘটনা দিয়ে আমাদের জীবন। এর প্রভাব সারাজীবন আমাদেরকে বয়ে বেড়াতে হয়। কেউ কেউ এইসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস করে, কেউ কেউ থেমে যায়, হতাশ হয়ে যায়।
এই সমাজটা এখনও কোন সুস্থ মানুষের জন্য প্রস্তুত না। কারণ আমাদের যার যে দায়িত্ব, সেইটুকু সকলে দৃঢ়ভাবে করি না। আমাদের হাজার হাজার বছরের মগজ ডুবে আছে পেশিশক্তির পুরুষতান্ত্রিকতায়, সেটা পরিবার থেকে পৃথিবীময়। এর পরিত্রাণ পুরুষদেরকেই আগে চাইতে হবে। নারীর অনিরাপত্তার জন্য জঙ্গলের সিংহ, বাঘ বা হায়েনারা দায়ী নয়।

পুরুষতান্ত্রিক আচরণ গুলোই নারীর পরিবেশ অনিরাপদ করে তোলে। ঠিক এই কারণেই পুরুষকে দায়িত্ব নিতে হবে একটি নিরাপদ, সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে সকল নারীর জন্য, সকল মানবিক মানুষের জন্য।

গতকাল নিউজে দেখলাম খাগড়াছড়িতে বাঙ্গালী সেটেলার নয়জন মিলে এক আদিবাসী মানসিক প্রতিবন্ধী নারীকে গণধর্ষণ করেছে! ধর্ষণের শিকার মেয়েটি রক্তাক্ত অবস্থায় বাবা-মায়ের কাঁধে ভর করে ডাক্তার- হাসপাতালের খোঁজ করছে! এর চেয়ে ভয়ানক সমাজ আর কী হতে পারে? একটি সমাজ ‘পুরুষতান্ত্রিক’ ভাইরাসে ভীষণভাবে অসুস্থ। ঘর থেকে রাষ্ট্র কোথাও নারীর কোন নিরাপত্তা নেই। নিজের ঘরে নারী ধর্ষিত হবে, খোলা রাস্তায় নারী খুন হবে! বাসে নারী ধর্ষণের শিকার হবে, খুন হবে! বয়স্ক নারী থেকে দুই মাসের কন্যা শিশুটিও অনিরাপদ এই সমাজে! রাষ্ট্রের কোন দায় নেই, দায়িত্ব নেই? আইনশৃঙ্খলার কোন বালাই নেই! অথচ সরকার আছে, রাষ্ট্র আছে, আইন আছে!

আমরা একটি নিরাপদ পরিবার চাই, নিরাপদ একটি সমাজ চাই, নিরাপদ একটি রাষ্ট্র চাই একটি সুস্থ জীবন চাই। সেটা অনেকখানি সম্ভব আমাদের সকলের আত্মনিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে। পুরুষতান্ত্রিক মনোজগৎ থেকে পুরুষকে বেরিয়ে আসতে হবেই। ঘর থেকে রাজনীতির মাঠ সর্বত্র এই বৈকল্য মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। রাষ্ট্রের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আইনের স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা। সেই সাথে আমাদের পরিবার এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার যে বাস্তবিক চর্চা, সেটা নিশ্চিত না হলে আজকের শিশুটিই আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। সেই রকম একটা সাজানো পথেই এখন আমরা হেঁটে চলেছি সবাই। যেখানে তনু, সবিতা, নীলা, খাগড়াছড়ির মেয়েটির রক্তে লাল হয়ে আছে আমাদের পথগুলো।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
ফরসাইথ, ইলিনয়,ইউএসএ।

শেয়ার করুন:
  • 656
  •  
  •  
  •  
  •  
    656
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.