কিশোরী নীলা রায় ও আমার কিশোরীবেলার আতঙ্ক

পূরবী পারমিতা বোস:

“সাভারে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুলছাত্রীকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। গত রবিবার রাত ৯টার দিকে সাভার পৌর এলাকার কাজী মোকমাপাড়া মহল্লার একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত স্কুলছাত্রীর নাম নীলা রায় (১৫)। ডাক্তার দেখিয়ে সে ঐ সময় বাড়ি ফিরছিল।”

খবরটি পড়ে যেন সম্বিত ফিরে পেলাম, এমন ঘটনা আমার সাথেও ঘটতে পারতো। আমিও আজ বেঁচে নাও থাকতে পারতাম। নীলা রায়ের পরিবার কতটা প্রভাবশালী আমি জানি না, কিন্তু আমার পরিবারকে ময়মনসিংহে জানে না, সম্মান করে না, সেই সময় এমন মানুষ খুব কমই ছিল। আমার বাবা আমার মা আমার কাকু প্রত্যেকেই রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল। এমনকি আমার বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকজনও সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত পরিবার ছিল। তবুও কিছু বখাটে ছেলে আমাকে স্কুলে যেতে আসতে বিরক্ত করতো। এমনকি সন্ধ্যার পর বাসায় ঢিল ছুঁড়তো। কাগজে ছুরি চাকু ডেগার এইসবের ছবি এঁকে নিচে লিখে দিতো তার সাথে প্রেম না করলে আমাকে এইসব ছুরি চাকু দিয়ে মেরে ফেলা হবে। এসিড মারবে। দিনের পর দিন ফোন করে ভয় দেখাতো।

একটা সময় এমন হলো আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হবার যোগাড়। বাবা মৃত, মা অসুস্হ, ভাই ছোট, কাকু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ততার পরও সেই ছেলেকে ডেকে ধমক দিয়েছে, তবুও কোনো ফল হলো না। কাকু ভদ্রভাবে যেটুকু চেষ্টা করা যায় তার সবটুকুই করেছে। কিন্তু তারা বখাটে। তাদের ভদ্রতাও নেই, ভয়ও নেই। ঝামেলা তো মিটেইনি, উপরন্তু কিছু মানুষ আমাকেই দোষ দিতে শুরু করে দিল। আমি তখন ঘরে বসে কাঁদতাম। আত্মহত্যার কথাও চিন্তা করেছি। স্কুলে যাবার পথে ভয় পেতাম যদি এসিড ছুঁড়ে দেয়! কোনো সিগন্যালে রিকশা থামলেই ত্রস্ত আমি এদিক ওদিক তাকাতাম কেউ এগিয়ে আসছে কিনা!
রাতে ভয় পেতাম। মায়ের সাথে ঘুমাতাম। বাথরুমে যেতে ভয় পেতাম। মনে হতো বাথরুমের জানালায় কেউ তাকিয়ে আছে। একটা সময় আমি দিনের বেলাতেও আতঙ্কে এ ঘর থেকে ও ঘরে যেতেও ভয় পেতাম।

ঠিক সেই সময় আমার অতি প্রিয় বাবুল কাকু (কমিশনার বাবুল রায়) এসে সব শুনে সেই মুহূর্তে আমাদের বাসা থেকে বেডরিয়ে সেই ছেলের বাসায় যায়। ওই বখাটেকে না পেয়ে তার বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়ে রেললাইনের উপর দাঁড় করিয়ে তাকে হুমকি দিয়েছিল যে তার ছেলে যদি আবার বিরক্ত করে তবে তাকে এই রেল লাইনের নিচে ফেলে পিশে ফেলবে। কী জানি বাবুল কাকুর সেই রণচণ্ডি মূর্তিকে হয়তো সেই বখাটের বাবা ভয় পেয়েছিল সেদিন।সেইখান থেকে ফিরে বাবুল কাকু আমাকে বলেছিল, মা, তুই ভয় পাসনে, আর আবার যদি কিছু করে ওই ছেলের এক পা পাড়া দিয়ে ধরে আরেক পা টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলবো। তুই আমার উপর ভরসা রাখ।

কাকু, আমি হয়তো আপনার ভরসাতেই এখনও বেঁচে আছি।
সেইদিনের পর থেকে আমাকে আর বিরক্ত করেনি সেই বখাটে, অশিক্ষিত, মূর্খ কুৎসিত ছেলেটা। আমাকে দেখলে মাথা নিচু করে চলে যেতো।
আমার বাবুল কাকু ছিল। নীলার হয়তো এমন কাকু ছিল না। তাই আমি বেঁচে আছি, নীলা মরে গেছে। নীলাকে সেইসব ছবিতে আঁকা ছুরি চাকু দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

অতীতে ওই কাইল্যা বখাটে ছিল,
এখন মিজান আছে।

এই কাইল্যা বা মিজানদের কোনো শাস্তি হয় না বলেই এরা যুগে যুগে জন্ম নেয়, আর অবুঝ কিশোরী মেয়েদের সারা জীবনের জন্য আতঙ্কিত বা মৃত বানিয়ে দেয়।

আমিই জীবিত নীলা রায়

আমি মিজানের কঠিন শাস্তি দাবি করছি
আমি মিজানের মৃত্যুদণ্ড চাই।

শেয়ার করুন:
  • 186
  •  
  •  
  •  
  •  
    186
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.