একজন “রুচিশীল সংস্কৃতিবোদ্ধা”র নিপীড়ক এবং ধর্ষকরুপী চেহারা-১

সুমু হক:

” …আমার যে সাফারিংস, আমার প্রতি ওর সহিংসতা, রুমাকে যেভাবে মারতো, ঐভাবে আমাকেও দরজা লাগিয়ে মারতো! একটা কিছু নিয়ে। এর মধ্যে আমি ভাবতাম, ও এভাবে মারে কেন আমাকে? ও হয়তো এভাবে আমাকে মেরে ফেলবে! কারণ তখন তো ও আমাকে হেট্ করে। সে তো আরও একজন মহিলার প্রতি ইনভল্ভড। এভরিথিং নিয়ে এখন তো আমি রিলেট করতেসি এগুলো। আর হঠাৎ দেখি কি রে? ও তো আমাকে আগেও করতো সহিংসতা, কিন্তু ঐটা আমি তারপরও সহ্য করতে পারতাম, এটা আর আমি সহ্য করতে পারতেসিলাম না। আমি ওর… তুমি চিন্তা করতে পারো! আমাকে মানে, ধরো আমি ব্লিচ খেতে গেছি। আমি শুধু তখন আমার বাচ্চাদের মুখ মনে করে… আমি শুধু তখন সারারাত আমার বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বসেছিলাম,” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলেন তিনি।

ফোনের এপাশ থেকে আমি শুধু তাঁর কন্ঠটুকু শুনতে পাচ্ছি, চোখের সামনে কেন যেন ভাসছে একটি লন্ডনের কোন একটি মধ্যবিত্ত বাড়ির দোতলার বাথরুমের ফ্লোরে কার্পেটের ওপর ব্লিচের বোতল আঁকড়ে ধরে মুখ চেপে ধরে একজন নারীর চাপা আর্তনাদ, জোরে কাঁদলে পাছে বাচ্চাদের ঘুম ভেঙে যায়!

অথচ আমাকে অবাক করে দিয়ে, একটু থেমে কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই আবার সেই আগের মত সহজ হয়ে গেলেন তিনি। এমনকি সদ্য কেমোথেরাপি নিয়ে ওঠার ক্লান্তিটুকুও তাঁর কণ্ঠের প্রাণশক্তিটিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

রোকসানা আক্তার ঝর্ণা- আটলান্টিকের ওই পাড়ে বসে তিনি আমাকে তাঁর সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন মেসেঞ্জারে। বর্ণনা করছেন তাঁর প্রাক্তন স্বামী, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত নাম মনজুরুল আজিম পলাশের হাতে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হবার অভিজ্ঞতা।

“ডমেস্টিক ভায়োলেন্স”, এমন একটি ধারণা, যার ঠিকঠাক মতন তেমন কোন বাংলা প্রতিশব্দ পর্যন্ত নেই, যা দিয়ে এর ভয়াবহতা সঠিকভাবে তুলে ধরা যায়, যদিও পারিবারিক নির্যাতন শব্দটা বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে! “গার্হস্থ্য সহিংসতা” কিংবা “বৈবাহিক সহিংসতা” এগুলো সব একাডেমিক এবং থিওরিটিক্যাল কেজো শব্দ।

রোজকার চলতি ভাষায় এমন কোন শব্দ নেই যা দিয়ে এর ভয়াবহতা কিংবা ব্যাপ্তিকে সহজ করে বলা যায়, যেন ভাষায় প্রকাশ না করে, কিংবা কার্পেটের তলায় লুকিয়ে রাখার মত করে নৈঃশব্দ দিয়ে ঢেকে দিলেই বিষয়টার সমাধান হয়ে যাবে।
“ম্যারিটাল রেপ”, অর্থাৎ, বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে তো এখনও আলোচনাটা ঠিকঠাক শুরুই হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ইন্টিমেট পার্টনার, অর্থাৎ, স্বামী, প্রেমিক কিংবা কমন ল সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক, মানসিক এবং যৌন সন্ত্রাসের শিকার হওয়া প্রায় বিশ্বজুড়েই একটি অন্যতম সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা এবং নারীর সাধারণ মানবিক অধিকারগুলোর লঙ্ঘিত হবার অন্যতম প্রধান কারণ।
ধারণা করা হয় যে বিশ্বজুড়ে প্রতি তিন জনের ভেতর একজন নারী (৩৫%) তার জীবদ্দশায় হয় তার সঙ্গী অথবা অন্য কারো হাতে যৌন সন্ত্রাসের শিকার হয়ে থাকেন।

যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ঘটনাগুলো ঘটে তাদের সঙ্গীদের দ্বারাই। কোন একটি সম্পর্কে আছেন এমন নারীদের ভেতর ৩০% ই দাবি করেন যে কোন না কোন সময় তারা তাদের সঙ্গীদের হাতে শারীরিকভাবে অথবা যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন।
পৃথিবীজোড়া যত নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তাদের ৩৮% ঘটে তাদের স্বামী, প্রেমিক কিংবা কমন ল সঙ্গীদের হাতে।

এতো গেলো পরিসংখ্যানের কথা।
আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের প্রত্যেকেই হয় নিজে কোন না কোনভাবে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স, ম্যারিটাল রেপের শিকার হয়েছেন, আর নয়তো এমন কাউকে চেনেন যিনি এর শিকার হয়েছেন।

আজ আমি এমন একজন সার্ভাইভারের কথা বলবো, যিনি কেবল তাঁর স্বামীর হাতে ভয়ংকর শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচারের শিকারই শুধু হননি, সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে একেবারে একা প্রচণ্ড সংগ্রাম করে নিজেকে এবং তাঁর দুই সন্তানকে প্রতিষ্ঠিতও করে তুলেছেন। তাঁকে কোনভাবেই ভিকটিম বলা যায় না, তিনি একজন জীবনযোদ্ধা, এবং এতোটাই তাঁর মানসিক দৃঢ়তা যে আজ তিনি তাঁর প্রাক্তন স্বামীর নির্যাতিতা প্রেমিকার পাশে দাঁড়িয়েছেন নিজের দুই সন্তানকে নিয়ে। তাঁর প্রাক্তন নিপীড়ক স্বামীর এই প্রেমিকার ওপর হওয়া একই নির্মম অন্যায়ের প্রতিকার অন্তত হোক সেটাই তাঁর একান্ত চাওয়া।

তিনিই সেই রোকসানা আক্তার ঝর্ণা!
সদ্য ক্যান্সার বিজয়ী রোকসানা তাঁর অসুস্থতা সত্ত্বেও দীর্ঘ এক মাস ধরে একটু একটু করে আমাদের সাথে তাঁর সেই যন্ত্রণার ইতিহাস ভাগ করে নিয়েছেন। একদিকে যেমন অশেষ কৃতজ্ঞতা বোধ করেছি তাঁর প্রতি, অন্যদিকে তেমনি ক্রমাগত দ্বিধাগ্রস্ত থেকেছি এই ভেবে তাঁর দেয়া এই সম্মান এবং এই আস্থার প্রতি সুবিচার করে উঠতে পারবো কিনা।

সাক্ষাৎকারটি বেশ দীর্ঘ, তাই কয়েকটি পর্বে এটি আমরা প্রকাশ করবো।
আশা করি আপনারা সময় নিয়ে লেখাটি পড়বেন।

১৯৯০ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ২৪ বছর বয়সী রোকসানার পরিচয় হয় মনজুরুল আজিম পলাশের সাথে। এ মনোরম তারুণ্যেই দুজনের ভেতর গড়ে ওঠে সখ্যতা। এবং প্রেম। আর দশজন তরুণ-তরুণীর মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের এ যুগলের প্রেম এবং পরিণয়।
দেশ তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। পলাশ তখন ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। জাসদ করতেন তিনি।
জাসদের আরেকজন কর্মীর সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরেই হবিগঞ্জের অভিজাত এবং ধনাঢ্য পরিবারের কন্যা রোকসানা প্রথম পরিচিত হন পলাশের সাথে। পলাশও আকৃষ্ট হন তাঁর প্রতি।

“ওই যে আমার কপালে মরণ লেখা ছিলো,” বললেন রোকসানা।
খুব ছেলেবেলায় বাবাকে হারিয়েছিলেন পলাশ। তার বয়স তখন নয় বছর মাত্র। প্রবল দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে চলা পলাশের তখনকার জীবন। অনটন, যুদ্ধ এবং তাঁর অস্বচ্ছল পরিবারের দায়িত্ব, অনিশ্চয়তায় হিমশিম খাওয়া সত্ত্বেও পলাশের ব্যক্তিত্ব, সুদর্শন চেহারা, তার পারিবারিক পরিস্থিতি রোকসানাকে ভীষণ দুর্বল করে তুললো। অভিজাত সামর্থ্যবান পরিবারের সংবেদনশীল রোকসানা গভীরভাবে পলাশের প্রেমে পড়লেন।

একসময় রুকসানা ঠিক করেন নিজের বাড়ি থেকে আসা টাকার অর্ধেকটা তিনি প্রতি মাসে পলাশকে দেবেন। এবং দেওয়া শুরুও করলেন। দেখা গেল, অতি অল্পদিনের ভেতরেই শুধু অর্ধেক নয়, তার বাড়ি থেকে আসা অধিকাংশ টাকাই এমনকি তার অনুমতির অপেক্ষা না করেই তার ব্যাগ খুলে পলাশ নিয়ে যেতে লাগলো। শেষটায় এমন দাঁড়ালো যে তার নিজের খরচ চলাটাই দায় হয়ে পড়লো।

এভাবে সময় যত কাটতে লাগলো, ক্রমশ রোকসানা আরও জড়িয়ে যেতে থাকলেন পলাশের সাথে। প্রথম প্রেমের সুনামির মত আবেগগুলো কেটে যেতে থাকলে একসময় কিছু কিছু অসঙ্গতি সামান্য হলেও বিচলিত করতে থাকলো তাকে।

এদিকে ছ’মাস না পার হতেই রোকসানার বাড়িতে সবাই জেনে গেলেন এই সম্পর্কের কথা।
হবিগঞ্জে তাঁদের বাড়িতে তাঁর মা ডেকে পাঠালেন মেয়েকে। বিয়ের কথায় আপত্তি না থাকলেও এই সময় এতো দ্রুত বিয়েতে দ্বিধা ছিল তার।

কিন্তু ঠিক বাড়ি যাবার আগেই পলাশ তাঁকে বলেছিলেন, “ঝর্ণা, আমার প্রায় সুইসাইড করার মত অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আমি আর নিতে পারছিলাম না ফ্যামিলির বার্ডেন। বাবা ছাড়া আমি এতো স্ট্রাগল করেছি, এই যে ওরা উপোস থাকে, আমি কিছুই করতে পারছিলাম না, আমি সুইসাইডের এটেম্পট নিয়েছিলাম, তুমি আমার জীবনে এসে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছো ঝর্ণা।”

পলাশের কথা বলার ধরন এবং আচরণে সব মিলিয়ে এমন ধরনের একটা সম্মোহনী শক্তি ছিল, যা তার চরিত্রে অসঙ্গতিগুলোকে ছাপিয়েও রোকসানার কাছে বড় হয়ে উঠেছিল তাকে সাহায্য করা, তার পাশে দাঁড়ানো এবং সেটাই তাঁকে দুর্বল করে তুলেছিল। স্বাভাবিকভাবেই এই অবস্থায় রোকসানা কোনভাবেই পলাশকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবার কথা ভাবতে পারছিলেন না। প্রথমে দ্বিধা থাকলেও আদরের কন্যাটির সুখের কথা ভেবে তার পরিবার রাজি হয়ে গেলেন এই বিয়েতে।

এইখানেই রোকসানার জীবনের পরাজয়ের প্রথম সূচনা।
একটি সম্ভাবনাময় ২৫ বছর বয়সের মেধাবী তরুণীর জীবনে এরপর শুরু হয় কেবল একটি দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়। এরপর তার দিনগুলো কেটে যায় একের পর এক তাণ্ডবের মোকাবেলা করতে করতে, আর সুদীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সে তার শরীরে এবং মনে বহন করে চলে সেই আঘাতের চিহ্ন। সেই কথায় আসবো এর পরের পর্বে।

ক্রমশ:

শেয়ার করুন:
  • 474
  •  
  •  
  •  
  •  
    474
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.