প্রতীক্ষার দীর্ঘপ্রহর ও বারবিলাসিনী

ফাত্তাহ তানভীর রানা:

বাইরে থেকে দেখে বোঝা মুস্কিল। অভিজ্ঞতা না থাকলে, অনুভুতি হতে হবে তীব্র থেকে তীব্রতর, তবেই সম্ভব। সূর্য যেখানে ডোবে নতুন সূর্য ওঠেনা, নুতন সূর্য উঠলেও চাটাইয়ের ফাঁক দিয়া দেখা যায় না। ডুবন্ত সূর্য অশুভ হলেও তাকে শুভ মনে করা হয়। জীবনের সংজ্ঞা জীবন দিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। শরীর যেখানে নরম বরফের মতো, অনুভুতি যেখানে ক্ষীণ, আনন্দ অনেক, আর ভালবাসা?

অস্তমিত রবি যখন তীর্যকভাবে তার সৌন্দর্য মাখা লাল আভা মর্তের বাসিন্দাদের উপর নিক্ষেপ করে, তখন তাদের দিনের শুরুর প্রস্তুতি শুরু হয়। অন্যদের মত দিনের শুরুতে নয় বরং পড়ন্ত বিকেলে তারা নিজেদের প্রুস্তুত করতে বসে। নারী যেখানে পণ্যের মত হাতবদল হয়। কখনো গুণানুন ভেদে পণ্যের মতোই ঝুপড়ি থেকে ঠাঁই হয় বিশেষ কামরায়।

নিজের জন্য চাওয়া কিছুই নেই; শুধু অন্যকে খুশি করা, অন্যের মনোরঞ্জন করে যাওয়া। জীবনে প্রাপ্তি শুধু খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকা। আর ভবিষ্যৎ? ভবিষতের ভাবনা নেই আদৌ, আছে বর্তমান। জীবনে পেছনের ফেলে আসা গল্পগুলো সিনেমার গল্পের মতোই! কেউই তাদের ফেলে আসা স্মৃতি মনে করতে চায় না।

ছবিটা বিবিসি বাংলা থেকে নেয়া

আমি বলছি আমাদের সমাজে যারা আদিম পেশা গণিকাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কথা। তারা আমাদের এই ঘুণে ধরা প্রচলিত সমাজের অংশ; অনুষঙ্গ। আমাদের কারো প্রতিবেশী, কারো আত্মীয়, কারোবা পরিচিতই হবেন; আবার কারো পরিচিত না হলেও হয়তো তার গল্প শুনে থাকবেন। এই গল্প রূপকথার গল্প নয়; সত্যি।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অর্থের বিনিময়ে পুরুষের মনোরঞ্জন করে বারবনিতা। তৃতীয় পক্ষের ভাবনার কিছু নেই; এখানে উভয়ের সম্মতিতেই কার্যসমাধা ঘটে। একজনের ঘটে পরিতৃপ্তি, অন্যজন সমাজে নিগৃহীত হয়েও বেঁচে থাকে।

করোনায় প্রভাবিত হননি কে? সীমিত আকারে সব কিছু স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। থেমে নেই কিছু, তবুও চলছে জীবন-যুদ্ধ। করোনাকালে অনেকেই পেয়েছেন প্রণোদনা, অনেকেই পেয়েছেন সহযোগিতা, অনেকেই ধার পেয়েছেন; অনেকের বন্ধু-আত্মীয় পাশে দাঁড়িয়েছে। যৌনকর্মীর পাশে আছে কে? পতিতার নাই ভাই, নাই বাপ্-মা, নাই বন্ধু, নাই কোনো সমাজ! সে তো ভোগের সামগ্রী। সমাজের কেউই তাদের ভালো চোখে দেখে না।

বিশেষ মুহুর্তগুলোতে বেশ্যার চেয়ে আপন কেউ থাকে কি! ভোক্তার সাথে ভোগকারীর এ এক এমন নিষিদ্ধ সম্পর্ক, প্রয়োজন শেষ হলে একজন অন্যজনের অচেনা হয়ে যায়! এমন এক ধরনের পেশা, এমন কাজ যেখানে শরীরের স্পর্শ ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। সম্পর্ক থাকলেই করোনার সময়ে মানুষের পাশে থাকা মুশকিল; আর যেখানে ভোক্তার সাথে গ্রাহকের সম্পর্ক থাকে না, সেখানে পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নও আসে না। তাহলে বারনারীরা দাঁড়াবে কোথায়?

লকডাউন শিথিলের পর সব শ্রেণী-পেশার মানুষ নিজ নিজ কাজে মন দিয়েছে। জীবন-জীবিকা আগের মতো না চললেও সীমিত আকারে সুরক্ষা মেনে বা না মেনে চলছে সবকিছুই। কোনো কিছুই থেমে নেই। কিন্তু, বেশ্যারা ফিরতে পারেনি নিজ জীবিকায়; তাদের ক্লায়েন্ট আসা বন্ধ। সব পেশায় শারীরিক দূরত্ব মানা সম্ভব; আর পতিতাবৃত্তিতে শরীরই প্রধান ও একমাত্র উপায়! যারা কিনা পতিতাদের পুরাতন ক্লায়েন্ট তারা এই দুঃসময়ে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছেন কিনা কে জানে। যৌনকর্মীদের অধিকাংশই সমাজে কোনোমতে বেঁচে থাকে। তাদের সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করতে বলাটা যৌক্তিক। কিন্তু এই খরচ বহন করবে কারা?

এখন সময় এবং করোনা পরিস্থিতি ভালো হওয়া পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষার প্রহর গুনছে বারবধূরা। এছাড়া তারা কী আর করতে পারে? নৈতিকতাহীন পেশায় নিয়োজিত বিধায় সমাজচ্যুত। সমাজচুতি ঘটেছে যাদের তারা সমাজ থেকে কিবা আশা করতে পারে! কিন্তু মানুষ হিসেবে মানবিকতার দাবী তারা করতেই পারে।

লেখক: গল্পকার।
[email protected]

শেয়ার করুন:
  • 66
  •  
  •  
  •  
  •  
    66
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.