ভালো রাখার অঙ্গীকারে ভালোবাসো হে মুন্তাহিদেরা

ফাহমিদা জেবীন:

বহুমুখী প্রতিভার অথৈ স্রোতস্বিনী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানে গানে বলেছিলেন, “ভালোবাসি, ভালোবাসি; এই সুরে কাছে-দূরে, জলে-স্থলে বাজায় বাঁশি ভালোবাসি ভালোবাসি”। রবি ঠাকুরের মতো আমরাও কিন্তু প্রায়ই, এমনকি রোজই কোন না কোন বাহানায় বলি, “ভালোবাসি ভালোবাসি…আমি তোমায় অনেক অনেক ভালোবাসি”।

লিখতে বসে এ নিয়ে অবশ্য অনেক পুরানো একটা কথা মনে পড়ে গেল। আমার বড় ফুপ্পা পিএইচডি করার সুবাদে বহু বছর ফিলিপাইনে ছিলেন। এছাড়াও তিনি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন নানা দেশ ভ্রমণ করে। আমি তখন প্রায় বেশ ছোটই বলা চলে। একদিন তিনি তার প্রবাস জীবনের গল্প করতে গিয়ে একপর্যায়ে বলেছিলেন, বিশ্বের প্রায় অনেক দেশেই নাকি দম্পতিরা প্রায়-প্রতিদিনই একে-অন্যকে ‘আই লাভ ইউ’ বলে থাকেন। অথচ আমাদের দেশে এমন বহু দম্পতি রয়েছেন যাদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি পর্যন্ত সংসার বিস্তৃত হওয়ার পরেও পুরো জীবনে একে-অন্যকে একবারও ‘I love you/আমি তোমাকে ভালোবাসি’ একথাটি মুখে বলেছেন কিনা সন্দেহ।

কথাটি শুনে সেদিন খুব মজা পেয়েছিলাম। জ্ঞান হতে হতে বুঝতে পারি এ না বলার কারণ আমাদের সিস্টেম, আমাদের কালচার, আমাদের সংস্কার। তারা বর্তমান জেনারেশনের মতো মুখে আই লাভ ইউ না বললেও সংসার সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে (দু’একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা ছাড়া) ঠিক ভালো রেখেছিলেন পরস্পরকে শক্তি হয়ে, খুঁটি হয়ে। যেখানে প্রকৃত শ্রদ্ধা আর প্রেমের ঘাটতি ছিল না বললেই চলে। অথচ আমরা দিন-রাত ভালোবাসার দাবী নিয়ে ঘুরে বেড়াই ঠিকই কিন্তু ভালোবাসার মানুষেটিকে ভালো রাখতেই ভুলে যাই। সিস্টেম কি তাহলে তাদেরটা ঠিক ছিল; না আমাদেরটা? আজ আমরা আমাদের এই virtual ভালোবাসাকে কথায়, কাজে, আচরণে নয় বরং রাখতে যাই ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার এসব জায়গায়। পরবর্তী জেনারেশন সেটা আবার গুগল ক্লাউডস এ রাখতে চায়
কিনা কে জানে?

এভাবে ভালোবাসার দাবী নিয়ে একপক্ষ স্লোগান দিতে থাকে আর অপরপক্ষের মনে বাজতে থাকে, “ভালোবাসার নাম দিয়েছি কান্না, চোখ থেকে নেমে আসে বন্যা…….”। তাই স্লোগান না দিয়ে সে মানুষটিকে ভালো রাখার চেষ্টা করুন হে মাননীয়রা। তবে (লিখা পড়তে গিয়ে যারা কমেন্ট বক্সে ঝাঁপিয়ে পরেন তাদের জন্য) বিশেষভাবে উল্লেখ্য সেটা কিন্তু গাড়ী, বাড়ী, শাড়ী কিংবা স্বেচ্ছাচারিতায় সমর্থন অথবা অন্যায়ের প্রশ্রয় দিয়ে নয়। বরং তার দূর্বল সময়ের শক্তি হয়ে, অসুস্থতার সেবা হয়ে, ভালো-মন্দের খেয়াল হয়ে ঠিক এ রকম:

বলছি বেশ ক’বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব ঘটনার ভিক্টিম তৎকালীন চট্টগ্রাম মেডিকেলের ছাত্রী ডা. সানজানা জেরিনের কথা। যে কিনা ৩৩ তম বিসিএসে নিয়োগ পেয়ে ফেনীতে জয়েন করতে যাচ্ছিলেন। হাতে মেহেদির রং না ওঠতেই সব রং হারায় যে জীবন, তারই আরেক নাম সানজানা জেরিন। যাকে পথে ছিনিতাইকারীরা মুভিতে যেমন দেখায় ঠিক সেভাবে হ্যাঁচকা টানে রাস্তায় ফেলে দেয়। আর সেই থেকে শারীরিক আর মানসিকভাবে
বিকল সে। এই ছিল ঘটনা… তারপর থেকে কেমন ছিল জেরিন বা তার পাশে থাকা মানুষের শুরুটা!

জীবন্মৃত মেয়েটার স্বামী মুন্তাহিদ ভূঁইয়া সেদিন তাদের হানিমুনের জন্যে তুলে রাখা অর্থ দিয়ে শুরু করেছিলেন প্রাণপ্রিয়ার চিকিৎসা। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকা বিশেষ করে ফেইসবুকে জেরিনের অতীত ও বেশিরভাগ দূর্ঘটনার পরের জীবনটাই ওঠে এসেছে বারংবার। তাই মনেহয় তার কথা প্রায় সবারই জানার তালিকায় চলে এসেছে। সংবাদদাতার ভাষ্যমতে, জেরিনকে খাইয়ে দেয়া, গোসল আর প্রতিদিনের যাবতীয় কাজ করার পর রাতে সে (তার স্বামী মুন্তাহিদ) জেরিনের রুমের ফ্লোরে বিছানা করে ঘুমাতে যান। কারণ একটু পর পর মেয়েটার বুকে কফ জমা হয়, যা তাকে
পরিষ্কার করতে হয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই মুন্তাহিদ ছেলেটা কি আসলে বোকা? যে কিনা অমন মরীচিকার পেছনে নিজের বর্তমান, ভবিষ্যৎ শেষ করে দিচ্ছে? ফেসবুকের একটা পেইজে ওদের বিয়ের আগের-পরের আর বিবাহ বার্ষিকীর ছবি দেখেছি। দেখেছি মেয়েটার দূর্ঘটনার পরের ছবিও। সেদিনের অপরূপা মেয়েটার সৌন্দর্য বলতে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। নিয়তির পরিহাসে এই উচ্চ শিক্ষিতা মেয়েটা আজ শুধু বোঝা নামান্তর। তবুও কেন, কিসের আশায় মুন্তাহিদ তার সর্বস্ব নিয়ে আঁকড়ে আছে ওকেই? কী অমন স্বার্থে আটকে বসে সে? “কেমন করে বীর ডুবুরী সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে,” – মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় পাঠ্য কাজী নজরুল ইসলামের “সংকল্প” কবিতার এ চরণটি। তবে মুন্তাহিদের জন্য জেরিনই কি সেই মুক্তা; যার জন্য অবিরাম অর্হনিশ জ্বলছে মুন্তাহিদ নামক বাতিটা?

“অমৃত” আর “বিষ” মিশ্রিত এই সংসার! যেখানে ঠিক এই পর্যায়টিতে এসে প্রেক্ষিত আর বোধের জায়গাটি বলছে “অনন্ত প্রেম” নামক অমৃত হয়তো এখনো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়নি। তা না হলে আজ যেখানে সময়ের অস্থিরতায় “ভালবাসা” বিষয়টা শরীর, অর্থ আর ক্যারিয়ার নামক অবাঞ্ছিত শব্দগুলোর মাঝে আটকে গেছে, সেখানে সব কিছু ছাপিয়ে একজন মুন্তাহিদ কীভাবে দেখালো এমন অদ্ভুত দৃশ্য! আসলে শব্দটাকে “অদ্ভুত” না বলি; বলি অপূর্ব (যা পূর্বে দেখা যায়নি) দৃশ্য। যে কিনা দেখিয়ে দিল কিভাবে ভালোবাসার মানুষকে ভালো রাখতে হয় আর কিভাবে নিস্প্রান মৃতপ্রায় একজনকে উন্মাদের ন্যায় ভালোবাসা যায়। দেখিয়ে দিল ভালোবাসার মানুষটার বুকের ভিতর ধুক ধুক করা শুধুমাত্র একটি পার্স কিংবা মেশিনকে চালু রাখার জন্যে কি করে জগৎ সংসারের সব উচ্ছন্নে দেয়া যায়। আমার বিশ্বাস, যে অমানুষগুলো জেরিনের এ অবস্থা করেছে, ওরাও নিশ্চয়ই মুন্তাহিদকে দেখে নিজেদের
ধিক্কার দিয়ে দিয়ে প্রায়ঃশ্চিত্তের পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

বিস্ময়ের সব সীমা লঙ্গন করে জীবনের জন্য অপরিহার্য আবেগের ডানায় চেপে বসে তাই মনে-প্রাণে কামনা করছি প্রতিটি জেরিনের জীবনে এমন মুন্তাহিদেরা ফিরে ফিরে আসুক। যারা অসময়ে জেরিনদের ঠিক এভাবে ভালো রাখে। যাদের ভালোবাসায় সময়ের বিপরীতে একমুঠো আত্মবিশ্বাসী গল্প হয়ে জেরিনেরা ইতিহাস হয়ে বেঁচে আছে; থাকুক…।

শেয়ার করুন:
  • 319
  •  
  •  
  •  
  •  
    319
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.