জলি তালুকদার, জাহিদ হোসেন খান ও একটি তদন্ত প্রক্রিয়া

সুচিত্রা সরকার:

তদন্ত প্রমাণ সাপেক্ষ। তাই একজন নারীর কথা দিয়েই রামায়ণ শুরু করছি। তারপর সীতা কার বাপ, ব্যাখ্যায় বলবো।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়। ছেলেটি এলাকার চেয়ারম্যানের ছেলে। গ্রাম্য বিচার, সালিশে কিছুই হয় না। পুলিশ মামলা নেয় না। পরবর্তীতে জানা যায় মেয়েটি কনসিভ করেছে। তখনও ভিকটিমের পরিবার মেয়েটিকে বিয়ে করার জন্য ছেলেটির পরিবারকে বলতে থাকে।
সেই নয় মাস নারীটির জীবনে কী হয়েছে, সেই ভালো জানে।
তারপর বাচ্চা জন্মালো। এবার সাব্যস্ত হলো, বাচ্চাটির ডিএনএ টেস্ট করবে, যদি বাচ্চাটি চেয়ারম্যানের ছেলের হয়, তখন বিয়ে করবে।

চেয়ারম্যানের ক্ষমতা অনেক। ডাক্তারকে ঘুষ দিয়ে ডিএনএ রিপোর্ট নেগেটিভ করে দিল। এখন সেই নারী বাচ্চাসহ বাবার বাড়িতেই আছে, কুমারী মাতার লজ্জাসমেত।

তাই আইন বরাবরই অন্ধ। তথ্য, তদন্ত— সব প্রমাণ করার ক্ষমতা রাখে না।

আমি ক্লাস এইটে ছাত্র ইউনিয়ন শুরু করি। ছেড়েছি তরুণ বয়সের শেষ দিকে। প্রথম দিককার একটা অভিজ্ঞতা বলি।

ঢাকা মহানগরের সম্মেলন চলছে নীলক্ষেত পরিবার পরিকল্পনার মিলনায়তনে। মধ্যান্নভোজ বিরতি। খাওয়ার পর আফজাল (ছদ্মনাম) ভাই বললেন, চলো আমরা এক জায়গায় যাবো। সঙ্গে তার সহযোদ্ধা ও গার্লফ্রেন্ড মুমু (এটাও ছদ্মনাম, প্রমাণ রাখিনি, তাই নাম দিলাম না)। বাইরে এসে দেখলাম দুটো রিকশা ঠিক করা হয়েছে। আফজাল ও মুমু একটা রিকশায় উঠবে, আমাকে পাশের রিকশায় উঠতে বলছে আরেকটা ছেলের সঙ্গে।
সেই ছেলে মিরপুরের, যে আমাকে সম্মেলনের দুইদিন প্রচুর জ্বালিয়েছে আমার সঙ্গে প্রেম করার জন্য।

মুহূর্তেই চিৎকার দিলাম। না, আমি যাবো না কারো সঙ্গে। আফজাল বললো, আচ্ছা যেতে হবে না কোথাও।

ক্লাস থ্রি থেকে লড়াই করছি সমাজ, পরিবেশ আর প্রতিবেশের সঙ্গে। এসব হরহামেশাই ঘটতো। কারণ প্রচলিত সমাজের চোখে আমি তখন দুর্দান্ত মিষ্টি মেয়ে।

তারপর থেকে চৌদ্দ বছর, এমন পারসোনালিটি তৈরি করেছি, কারো ক্ষমতা ছিল না আমার সঙ্গে বেচাল কিছু বলার। বা কোনো নারীকে আমার সামনে হেয় করার।
বাপ্পী নামে এক মেয়ে বিচার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করলো ডাকসুতে। অথচ সভাপতি বলছে, ব্যাপারটা সুচিত্রা যেন না জানে।

আমি চৌদ্দ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, পুরো পুরুষতান্ত্রিক বলয়বিশিষ্ট একটি সংগঠন। সিপিবিও তাই। এর মধ্যে যারা নারীবাদী আছেন, তারা কোণঠাসা। এখানে নারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো ট্রিটমেন্ট পায় না।

এখন আসি বর্তমান প্রেক্ষিতে।
সকালে এক বৃদ্ধ সিপিবি সদস্যের বাণী পড়লাম। পোস্টের ভেতরে তার মন্তব্য আরো ভয়াবহ। জলি ইতর, জলি হ্যাংলা, জলি কেন কেন্দ্র পার্টি করে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং জাহিদ তথাকথিত হোল টাইমার নয়।

আমার প্রথম প্রশ্ন, তথাকথিত হোলটাইমার মানে কী? যে হোলটাইমার সকলকে লুকিয়ে চাকরি করে আর সবাইকে বলে, সে পুরো সময় পার্টিতে দেয়? এই সামন্ত মানসিকতার পার্টিতে হোলটাইমার ব্যবস্থার দরকার কী, যেখানে হোলটাইমার হলে সম্মানের বদলে ভিক্ষুকের মর্যাদা পায়?
এরকম শত শত পোস্ট, যা জলি তালুকদারের মনোবল ভেঙে দেবার জন্য যথেষ্ট।

জলি তালুকদারকে প্রথম দেখি ২০০৩ একটা হরতালে। কাঁধে জিপলক ব্যাগ। প্যান্ট আর পাঞ্জাবী। যেহেতু এগারো দলের হরতাল। ভেবেছিলাম উনি বাসদ করেন। কেন মনে হয়েছিল, সেটা বাসদের নারীনেত্রী আর জলি তালুকদারের জেশ্চারই বলে দিচ্ছিল।

ছাত্র ইউনিয়নে এরকম মেয়ে সচরাচর দেখা যায় না। জলি তালুকদার হোলটাইমার। শ্রমিক নেতা। বিয়ে করেনি। জলি তালুকদার বিদেশ ট্যুর দেয়। অনেক বাচ্চা বয়সে সিপিবির নেতা হয়ে গেছে। জলি তালুকদারের চালচলন অনেকের পছন্দ না।

আমি গণতান্ত্রিক পথে বিশ্বাসী। হাজার মানুষ, রকম হাজার। একটা দলে সব মানুষ কি একই রকম? জলি তালুকদারের সত্তর ভাগ মতের সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করতাম। কখনও পুরো মতের সঙ্গেই দ্বিমত। তারপরও ঝগড়া করিনি সেসব নিয়ে।

জলি তালুকদার পরিশ্রম করে বা ক্ষমতার সঙ্গে যোগসাজশ করে এতো উঁচু পদে আসীন হয়েছেন? তা ছেলেরা যারা করছে, তারা পরিশ্রম বা ক্ষমতার সঙ্গে যোগসাজশ করে না?

সিপিবির কংগ্রেসে গুলিস্তান নাট্যমঞ্চের চিপায় বা পল্টনে নোয়াখালী হোটেলে সম্মেলনের আগের রাতের গ্রুপিংগুলো তাহলে কী?
সেসব পরে কখনও হবে। এবার মূল আলোচনা।

জলি তালুকদার

ছয় মাস আগে জলি তালুকদার জাহিদ হোসেন খান দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। দলীয়ভাবে তিনি এর বিচার চেয়েছেন।

প্রথম কথা, একজন নারী যখন তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করে, সেটা আমলে নিতে হয়। এটা বিশ্বব্যাপী যে যৌর নিপীড়ণের আইন আছে তার প্রথম পরিচ্ছেদ। কারণ সেখানে বলা হয়েছে, নারী তার উপর নির্যাতন প্রকাশ করলে, তাকে সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়। সামাজিক মর্যাদাহানি ঘটে। তার পরবর্তী জীবনেও এর ছাপ থাকে। নারীটির মানসিক জীবনও বাধাগ্রস্থ হয় পরিস্থিতির চাপে পড়ে। তাই এসব ভেবে নারীটিকে অভিযোগ উত্থাপন করতে হয়।
আর এই বিবেচনায় নারীটির বক্তব্য প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করেই বিচারকাজ শুরু হয়।

সিপিবিও তাই করেছে হয়তো। তারপর সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া।
যেহেতু সেখানে ছিলাম না, তাই বলতে পারবো না কী প্রশ্ন করা হয়েছে। তবে ধর্ষণ মামলার আইনে স্পষ্ট বলা আছে অপর পক্ষের উকিল ধর্ষণের শিকার কাউকে স্পর্শকাতর প্রশ্ন করতে পারবেন না যাতে সে বিব্রত হয়। তাকে দ্বিতীয়বার ধর্ষণ বলা হয়, কোর্টের সাওয়াল জবাবের সময়।

ভাইরে, আমি বহুবার নিপীড়নের শিকার হয়েছি। বহুবার পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছি (প্রমাণ করার ব্যক্তি জীবিত), বহুবার চড় মেরেছি, বহুবার গণপিটুনি খাইয়েছি। বহুবার বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছি নিপীড়ণকারীকে।
সেখানে জনগণ থাকতোই। শালা, নিপীড়করা এতো চাল্লু, চক্ষের নিমিষে স্পর্শ করার কৌশল তারা জানে। তাই যখন প্রতিবাদী হয়েছি, জনগণের মধ্যে কেউ আমাকে বলেনি, আপা কোথায় টিপ দিয়ে, কয়বার ডলা দিছে, ঘষছে, বেশি ব্যথা পাইছেন? কেউ জিজ্ঞেস করেনি। আমার সম্মান ওই রাস্তার লোকগুলোই বাঁচিয়েছে।

সিপিবির মিটিং বসেছে। সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনও বোধ হয় দেয়া হয়েছিল।
সাক্ষ্যগ্রহণে উঠে এসেছে, সেই মিছিলে উপস্থিত সকলে বলেছে, জলি তালুকদারের অভিযোগ মিথ্যা। উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এমন করেছেন তিনি।
অপরদিকে জাহিদ হোসেন খান লড়াকু সৈনিক, ‘ভালো মানুষ’।

সুচিত্রা সরকার

আচ্ছা দেশে নয় মাসের শিশু ধর্ষণের ঘটনা আপনারা পড়েন নাাই কখনো, না? পুরুষের কামুক চরিত্র সম্পর্কে কোনো আইডিয়া নাই? আচ্ছা যারা নারী সদস্য, কেউ বাসে, ট্রামে নিপীড়িত হোন নাই? তাহলে বোঝেন না, যারা গায়ে হাত দেয়, তাদের কৌশলটা কী? কেবল বদ্ধ ঘরে বা লিফটেই নারীরা নিপীড়িত হয়?

২০০৩ নিপীড়ণবিরোধী আইনে বলা আছে, যৌন কমেন্ট পাস, জামা ধরে টান বা ধাক্কাও নিপীড়ণের পর্যায়ে পড়ে।
এসব বলছি বলে যুক্তি দিয়েন না যে, জলি মাঠে নামছে ধাক্কা তো লাগবেই। রাস্তায় না নেমে হ্যালিকপ্টারে চড়লেই পারতো।

আর তদন্তে সাক্ষ্যগ্রহণের প্রক্রিয়াটা ঠিক কী ছিল? অভিযুক্ত ব্যক্তি কি সামনের ক্যামেরা পারসন, পাশের কমরেড আর পেছনের আপা ভাইদের বলবে, দেখেন আমি নিপীড়ণ করি, প্রমাণ রাখেন! নাকি জলি তালুকদারের গায়ে সিসি ক্যামেরা ছিল যে, ওই ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি কিছু করেনি?

এভাবে নিপীড়ণের তদন্ত হয় না। এভাবে তদন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ এখানে কেউ মেশিন না, মানুষ। সকলেরই পক্ষ আছে। আর রাজনীতি ভয়ানক জায়গা। পূর্ব রাগের জেরে কেউ জলি তালুকদারের বিপক্ষে যাবে না, এমনটা কি হতে পারে? আর যে নারী, পুরুষতান্ত্রিক দলে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মেইল ডমিনেট সমাজ কি বসে থাকবে? আর ব্যক্তিগত জীবনে জলি তালুকদার একেবারে নির্ভুল নয়, ভুল করা স্বাভাবিক। সেটার রাগ থাকাও স্বাভাবিক।

আমারও আছে। আমি পদত্যাগের সময় জলি তালুকদার তার সঙ্গীরা আমার বিপক্ষে ছিল। শুধু তাই না, জলি তালুকদারের পক্ষে বলার লোক যেমন এখন কম, আমার বেলায়ও কম ছিল (লূনা নূর রিকশা থামিয়ে হাত ধরে কেঁদে দিয়েছিল, আর বলেছিল, মেয়েরা কেন পার্টিটা কররতে পারে না বলো)। আশা করেছিলাম জলি তালুকদারকে পাবো, পাইনি।

তবু আমি জলি তালুকদারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাই। কারণ একজন খুনিরও যৌন নিপীড়নের বিচার চাওয়ার অধিকার আছে। সেক্ষেত্রে আগে তাকে সুবিচার পাইয়ে দিয়ে, তার খুনের সাজা।

ধরুন বর কনে। আগের রাতে সহবাস করার পরের রাতে মেয়েটির আপত্তি সত্বেও যদি সহবাস হয় জোর করে, সেটা ধর্ষণ। নারীটি আদালতে যেতে পারবে। একজন বেশ্যাও ধর্ষণের মামলা করতে পারে। আপনারা তো সেই হুজুরের মতো, যারা বলে নাারী তার পোশাকের কারণে ধর্ষিত।

এবার ঘটনার অপর দিক। অভিযুক্ত বলছে সে এমন করেনি। পূর্বরাগের জেরে, জলি এমন অভিযোগ করছে। জলি যাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়, তার বিরুদ্ধেই এমন করে। সেক্ষেত্রে সেগুলো প্রমাণ দিক।

আর আমার প্রশ্ন জাহিদ খানের উচিত, সে যে দোষী না সেটা প্রমাণ করা। কিন্তু সেটা কোন প্রক্রিয়ায়? সে এই কাজ করলে স্বীকার করবে? অথবা যদি এমন হয়, তার পূর্ব রেষারেষি ছিল জলির প্রতি। তাকে শায়েস্তা করতেই নিপীড়ন করে রাগ মিটিয়েছে? জলিকে যেমন বলা যায়, জাহিদকেও একইরকম বলা যায়।

সুতরাং যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর বক্তব্য আমলে নিয়েই বিচারকাজ এগোতে হবে। পুরাতন নিয়ম চলবে না।
আর ঘটনা মিটে গেলে সিপিবির পক্ষ থেকে সব নারীকর্মীকে সার্বক্ষণিকভাবে একটা কররে হিডেন ক্যামেরা দেবেন, যাতে সে মিছিল শুরুর আগে ভিডিও মুড অন করতে পারে।

বিভিন্ন জন পক্ষে-বিপক্ষে সরব হয়েছেন। বিভিন্ন পোস্টে যেসব কমেন্ট করছেন, চেতনাহীন, মূর্খ আর প্রতিক্রিয়াশীল অপদার্থদের বক্তব্য বেরোচ্ছে আপনাদের নোংরা কমেন্টে। দিন পার হলে কথাটা মিলিয়ে নেবেন।

ওহ, ভুলে গেলাম বলতে! বিপ্লব দীর্ঘ থেকে আরো দীর্ঘজীবী হোক।

শেয়ার করুন:
  • 250
  •  
  •  
  •  
  •  
    250
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.