ভেইল বনাম খেইল

সাঈদ আনোয়ার তপু:

১) বোরখা দুই প্রকার: আশার বোরখা ও নিরাশার বোরখা

বোরখা নারীর চয়েস নাকি পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া একটি অবমাননাকর শৃংখল, তা নির্ভর করে এর আশেপাশে পুরুষদের শরীরে কতটুকু কাপড় আছে! শুনতে আজগুবি লাগছে? আমি কিন্তু প্রমাণ দিতে পারি! বহুল আলোচিত সি বিচ এর ছবিটি মনে পড়ে? মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগের ইস্যু। প্রায় ১০০% সেকুলার একমত হয়েছিলেন যে এটি একটি বৈষম্যের ছবি। নারী বলে ইসলাম তাকে বঞ্চিত করেছে সমুদ্র স্নান এর আনন্দ থেকে। পুরুষটি তার শরীর উন্মুক্ত করে জল হাওয়া লাগাতে পারছে, কিন্ত তার সঙ্গিনীটি পারছে না। কেউই তখন বলেননি যে এটি তার চয়েস। কেউই বলেননি অন্দরমহলের নারীর সমুদ্র সৈকতে ঘুরে বেড়ানো একটি আশাব্যঞ্জক ঘটনা। অথচ সাম্প্রতিক আরেকটি আলোচিত ইস্যু ক্রিকেট পিচে তোলা সেই একই বোরখা পরা একজন নারী ও তার ছেলের ছবিটি দেখুন, সেকুলাররা দুই ভাগ হয়ে গেলেন এই ইস্যুতে! একদলের কখনোই মনে হলো না যে নারীটি বৈষম্যের শিকার। এটি তার চয়েস নয়। এক সময়ের এথলিট হয়েও তার ছেলের মতো মাথা উন্মুক্ত রেখে খেলতে পারছেন না! উনি এই দেশের প্রথামতো বোরখার নিচে পুরো সালোয়ার কামিজ পরেই এসেছিলেন বোধকরি, খুব সহজেই খুলে খেলতে পারতেন। এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড এর কারণ কী?

২) চয়েস না চাপ?

কে কী পোশাক পরবে সেটা তার নিজস্ব, ব্যক্তিগত ব্যাপার অবশ্যই। বোরখা পরে ক্রিকেট প্র্যাকটিসেও কোন সমস্যা নেই। উনি তো খেলার প্ল্যান করে আসেননি, অন্য প্লেয়াররা না আসাতে নেমে গেছেন ছেলেকে প্র্যাকটিস করাতে (যদি এটি পাতানো ফটোশুট না হয়)। আমরাও সি বিচে বেড়াতে গিয়ে মাঝে মাঝে প্রপার সাঁতারের পোশাক না থাকাতে জিনস গুটিয়ে পানিতে নেমে পড়ি, এটা সেরকম একটা ব্যাপার। কেউ মাতা পুত্রের ক্রিকেট চর্চা বা এমবিশনে বাধা দিচ্ছে না। কিন্তু কেউ নির্দিষ্ট একটি স্টাইলের পোশাক আজীবন পরে থাকতে বাধ্য হলে, ইচ্ছেমতো খুলতে না পারলে তাকে ব্যক্তিগত চয়েস বলা চলে কী? (নীল বোরখাটা পরবেন না আজ কালোটা পরবেন, এটি একধরনের চয়েস অবশ্য, সাধারণত হাতকড়ার ব্যাপারে স্টেইনলেস স্টিল নাকি রট আয়রন — এরকম কোন চয়েস থাকে না) র‌্যাফল ড্র এর বাক্সে একটিই মাত্র এন্ট্রি থাকলে তাকে তো ‘বেছে নেয়া’ বলে না! তাছাড়া বোরখা ছাড়া খুব সহজ, আমাদের দেশ এখনও তালেবানি আফগানিস্তান হয়নি। শাবানা নতুন করে বোরখা পরা শুরু করাতে তা নিউজ হয়েছেন। অথচ কত শত নারী রোজ বোরখা ছাড়ছেন, আমার ফ্রেন্ড লিস্টেই অনেকে একাধিকবার হিজাব ধরে আবার ছেড়েছেন নানাবিধ কারণে – রেসিস্ট আক্রমণ এর আশঙ্কা, আইসিস এর উত্থানে উৎসাহ ইত্যাদি। কিন্ত তা নিয়ে কোন হৈচৈ হয়েছে কি? আইসিস এলাকামুক্ত হলে সেখানকার নারীরা প্রকাশ্যে বোরখা পুড়িয়েছেন, তা নিয়েও মুসলিম বিশ্বে কোন অসন্তোষ দেখিনি। তাহলে এই চয়েস ধরে রাখার জন্য দায়ী কে? পরিবারের চাপে ধরে রাখলে তো প্রমাণিতই হয়ে গেল যে এটি প্রকৃত চয়েস নয়, জোর করে চাপিয়ে দেয়া এক ধরনের শৃংখল।

৩) বোরখা কি আদৌ একটি পোশাক?

আমার মতে না। এটি অন্তর্বাস এর উপরে চাইলে পরা যায়, কিন্তু কেউ তা করেন বলে জানা নেই। এটিকে বরং পোশাকের আবরণ বা ক্লোকিং ডিভাইস বলা যেতে পারে। এটি শরীর এর আব্রু রক্ষা করে না, পোশাকের আব্রু রক্ষা করে। ট্রাডিশনাল পোশাক এর ফাকফোকর এবং শরীরের উচু নীচু ঢেউ ঢাকার উদ্দেশ্যে বোরখা ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং তা পরতে হয় বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের অস্বস্তি দূর করার জন্য, নিজের জন্য নয়। আবার অনাত্মীয় নয় এমন ২০ প্রকার বিপরীত লিঙ্গের উপস্থিতিতে বোরখা পরার বাধ্যবাধকতা নেই। সমলিঙ্গের নারীদের উপস্থিতিতেও নেই (অবশ্য লেসবিয়ানদের কথা মাথায় রাখলে তারাই সবার আগে মাথাব্যথার কারণ হতো)! এতে প্রমাণিত হয়, এর উদ্দেশ্যে নিজের শরীর/পোশাকের আব্রু নয়, অনাত্মীয় বিপরীত লিঙ্গের চোখের আব্রু হিসাবে কাজ করা। সেই হিসাবে বোরখা আসলে কোন পোশাক নয়, কাপড় দিয়ে বানানো পর-পুরুষের ঘোলা চশমা যেটা তাদের আর কষ্ট করে পরতে হয় না, নারীই এই গুরুদায়িত্ব তাদের হয়ে পালন করেন!

৪) বোরখা কি আমাদের সংস্কৃতির অংশ?

আমার পর্যবেক্ষণ তা বলছে না। এই গরম হিউমিড দেশে তাহলে কারো ডার্ক রঙের বোরখা সেধে পরার কথা না। অথচ আমদের মতো দেশে অধিকাংশ বোরখাই তাপবাহক কালো রং এর হয়ে থাকে। মিডল ইস্টের রুক্ষ, ধুলোময় আবহাওয়ায় শরীর মাথা ঢাকা পোশাক পরার জাস্টিফিকেশন থাকতে পারে, আমাদের দেশে নয়। ৩ নং পয়েন্ট ব্যতীত এর কি আর কোন ইউটিলিটি আছে? (পরিচয় লুকিয়ে ডাকাতি বা পালিয়ে যাওয়া ছাড়া) না নেই, যদি না বোরখা/হিজাব পরলেই নারীরা মোডেস্ট হয় – এই ফলস ভার্চু সিগনালিং এ কেউ বিশ্বাস করে! বোরখা/হিজাব আমাদের মত আইন শৃঙ্খলাহীন দেশে ধর্ষণ প্রতিরোধে কাজ করে, এমনটি প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রচুর ভিক্টিম বোরখা পরেও নিজেকে বাঁচাতে পারেনি। আমি আজ পর্যন্ত এই বর্ষা প্রধান দেশে কোন বোরখা ওয়াটার প্রুফ হিসাবে বানানো হয়েছে বলেও শুনি নাই। অথচ এটি ছাতার বা রেইন কোট এর সার্বক্ষণিক সুন্দর একটি বিকল্প হতে পারতো! তাছাড়া বোরখা যে কাজ করে, আমাদের মা-মাসীরা ট্রাডিশনাল ফুল হাতা ব্লাউজ আর শাড়ির আঁচলের ঘোমটা দিয়েই সেই কাজ সেরেছেন। তাই বোরখাকে একমাত্র ধর্মীয় কারণ ছাড়া সংস্কৃতির অংশ করা নিতান্তই বাহুল্য। বোরখা এমনকি কোন কোন মহলের মতে ইসলাম ধর্মেরও অংশ নয়, মিশরে এই যুক্তিতে বোরখা ব্যান এর আন্দোলন চলছে, অনেক দেশে ব্যানও করা হয়েছে।

এই এথিলিট নারী অবশ্য আরেকটি ইউটিলিটি উল্লেখ করেছেন। বোরখা তাকে বাসে সিট পেতে এবং ইভ টিজিং থেকে রক্ষা করে! কিন্তু একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন, দেশের সব নারী যদি বোরখা পরা শুরু করেন তাহলে এই স্পেশাল ট্রিটমেন্ট তিনি পাবেন কি? তখন কেউ বাসে সিট ছেড়ে দিলে কি বলা হবে? বোরখার জন্য ছেড়েছে? নাকি নারী বলে শিভালরি দেখিয়েছে, যা পাশ্চাত্য আধুনিক সেকুলার সংস্কৃতির অংশ? পৃথিবীতে পর্ন ইন্ডাস্ট্রি চলে, কারণ আমাদের সভ্যতায় পাবলিক স্পেসে নগ্ন হয়ে ঘোরা যায় না। ইয়াং জেনারেশনের কৌতুহলের কারণে ব্যাপক চাহিদা থাকায় কিছু নারী নগ্ন শরীর প্রদর্শন করে বাড়তি পয়সা কামানোর সুযোগ পায়। সবাই নগ্ন হয়ে ঘুরলে কেউ পয়সা খরচ করে তাদের দেখতে আসতো না। এই বোরখা প্রমোটার নারীও একই ট্যাকটিস ধরেছেন, তবে উল্টোটা। তিনি শরীর উন্মুক্ত না করে আরো ঢেকেঢুকে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের ফায়দা নিচ্ছেন।

৫) বোরখা কি আবহমান বাংলার সংস্কৃতি?

যে অর্থে ধর্ম ও সংস্কৃতির অংশ? বিদেশি উপাদান সংস্কৃতির অংশ হতে পারে কিন্তু সেক্ষেত্রে তার একটি ধারাবাহিক মসৃণ আত্মীকরণ ঘটা জরুরি। না হলে হঠাৎ করে খুব দ্রুত তা সমাজে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হলে এবং স্থানীয় কৃষ্টিকে প্রতিস্থাপিত করলে তাকে আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলি, বিনিময় বলি না। আমরা কি শাড়ির মতো এই বাংলায় ধনেখালির তাঁতের বোরখা, টাঙ্গাইলের বোরখা ইত্যাদি নামে বিক্রি করতে শুনেছি? না বোরখার বাজারে শুধু মিশরি, আফগানি, ইরানি ইত্যাদি টাইপ দেখেছি? বোরখার ফ্যাশন চেঞ্জ হলেও তা কেন শুধুই বিদেশি ইরানি তুরানি ফ্যাশন ট্রেন্ড ফলো করে? স্থানীয় সংস্কৃতিতে তাহলে বোরখার আত্মীকরণ কোথায়? এটি শুধু ধর্মীয় খেলাফতি সাম্রাজ্যবাদ এর ভ্রাম্যমান ফ্ল্যাগ হিসাবেই ব্যবহৃত হয়েছে।

বলতে পারেন প্যান্ট শার্টেরও কি আত্মীকরণ হয়েছে? হ্যাঁ ভাই হয়েছে, আপনাদের বাপ দাদাদের আমলেই। ইংরেজদের প্যান্ট শার্ট সরাসরি আসেনি। প্রথমে পাঞ্জাবীর হাতায় বোতাম বসেছে, কলার বসেছে। পাম্প সু ও কোট ধুতি/পায়জামার সাথে সহাবস্থান করেছে কয়েক দশক। তাছাড়া প্যান্ট শার্ট স্যুট কলোনিয়াল ইংরেজ শাসকদের কল্যাণে পপুলার হয়নি এদেশে, বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফর্মাল বিজনেস পোশাক হিসাবেই যুগের চাহিদা হিসাবে কমন লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা ইংরেজি ভাষার মতো তা সবাই গ্রহণ করেছে। না হলে চাইনিজরা কেন তাদের হাজার বছরের কালচার বাদ দিয়ে চাইনিজ কলার প্রিন্স কোট ছেড়ে স্যুট-টাই পরতে যাবে? ইতালিয়ান ভাষা যেমন মিউজিক্যাল নোটেশন শাসন করে, তেমনি গ্রিক ভাষা শাসন করে অংক আর পদার্থ বিদ্যার যত টার্ম। আমাদের আইনের ভাষা এক সময় ফার্সি ছিল। যে জাতি যে বিষয়ে দক্ষ সেই বিষয়ের সাথে তার অনেক সংস্কৃতি আপনা-আপনিই চলে আসে। এখানে শুধু কলোনিয়াল প্রভু প্রীতি বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভূমিকা নেই। পাকিস্তান আমলে ইসলাম এর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও তাই পর্দার চল হয়নি এদেশে, পুরান ঢাকা, সিলেট চিটাগং এর কিছু রক্ষনশীল পরিবার ছাড়া যারা রিকশার হুডের চারপাশে শাড়ি পেঁচিয়ে চলাচল করতো। পশ্চিম পাকিস্তানী সম্ভ্রান্ত নারীদের প্রথম পছন্দ ছিল শাড়ী। বোরখা হিজাবের চল পরিকল্পিত আরব কালচারাল সাম্রাজ্যবাদ এর অংশ হিসাবে এদেশে ছড়ানো হয়েছে মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক তৈরির পাশাপাশি।

ষাটের দশকের রক এন রোল গ্রহণ করলেও ৮০ এর দশকের পাঙ্ক মুভমেন্ট আমরা গ্রহণ করি নাই। কিছু পোলাপান চুল স্পাইক করে মুখে রং মেখে পাড়ার মোড়ে মাটিতে গড়াগড়ি করে ব্রেক ডান্স দিত। হানিফ সংকেত ইত্যাদিতে ‘ওদের কে পাঙ্কু বলে’ গান বেধে পচিয়ে এই মুভমেন্ট ঝেটিয়ে বিদায় করেছেন। তাহলে বোরখা হিজাবের এই আগ্রাসন আমরা গ্রহণ করবো কেন? কিছু মহল এখন আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে ঘোলা করতে চাইছে পরিবর্তনের অজুহাত দেখিয়ে। তারা পোশাকের বাইরে সতীদাহ, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি বিষয় এনে এগুলো সেকুলাররা আবহমান বাংলার অংশ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে বলে শাড়ি ছেড়ে বোরখার পথ মসৃণ করার উদ্দেশ্যে কুযুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন। নারীরা আগে ব্লাউজ পরতেন না, এখন পরেন, তার মানে কি তারা আরো রক্ষণশীল হয়েছেন? মোটেই না। ব্লাউজ/জ্যাকেট এর কনসেপ্ট এদেশে এনেছে উদার ব্রাহ্ম ঠাকুর বাড়ির ধনী নারীরা ফ্যাশনের অংশ হিসাবে। গা ঢাকার বাড়তি তাগিদে নয়। আমরা নেংটি ছেড়ে প্যান্ট ধরেছি বলে কি আমাদের রাতারাতি বোরখা ধরা জায়েজ হয়ে যায়? আমরা তো নেংটি লুঙ্গির উপরে প্যান্ট পরি নাই, শাড়ির উপরে সালোয়ার কামিজ পরি নাই, তাহলে শাড়ি, কামিজের উপরে হঠাৎ বোরখা হিজাব কেন? প্যান্ট শার্ট স্পোর্টস রিলেটেড পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাক যেমন কমন আন্তর্জাতিক ড্রেসকোড, চলাফেরার সুবিধা মাথায় রেখে গ্রহণ করা হয়েছে, বোরখাও একই সুবিধা মাথায় রেখে গ্রহণ করা হয়েছে, তবে সেই সুবিধা হচ্ছে নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখার সুবিধা! বোরখা যে মোবিলিটির ক্ষেত্রে সমানতালে আধুনিক পোশাকের সাথে তাল রাখতে পারে না তা ভালভাবেই প্রমাণিত। শাড়িরও অত না হলেও মোবিলিটির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে। তাহলে আমরা শাড়ীর উপর বোরখা আমদানি করে কী অগ্রগতি লাভ করলাম?

৬) বোরখা বনাম বিকিনি: দর কষাকষির খেলা

অনেকে বলেন তারা পোশাকের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং বোরখা এবং বিকিনির উদাহরণ টানেন। অনেকে দুটোকেই নারীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া পুরুষতান্ত্রিক পণ্য মনে করেন। এটি কয়েকদিক থেকে একটি ফলস ইকুইভালেন্সি। প্রথমত, এদেশে মুখে বললেও কেউ বিকিনি পরে ক্রিকেটের মাঠে কেন, সমুদ্র সৈকতে হাজির হলেও চোখা রাঙ্গাবে। তারা জানে এটি কখনোই ঘটবে না, তাই আরাম করে ‘এলাউ’ করে উদার সাজে, আর বোরখার মতো একটা মধ্যযুগীয় বৈষম্যমূলক কনসেপ্ট প্রমোট করার ক্ষেত্রে দাবার চাল/দর কষাকষির ইন্সট্রুমেন্ট হিসাবে ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত, বিকিনি প্রায়োগিক অর্থে বোরখার বিপরীত নয়, অর্থাৎ শরীর অপেক্ষাকৃত বেশি উন্মুক্ত করা পোশাক নয়। এটি সাঁতারেরও পোশাক নয় আসলে, বোরখা পরেও গায়ে পানি লাগানো যায়। বিকিনি নারীরা পরে সূর্যস্নান এর জন্য। ঠাণ্ডার দেশে যে অল্প কয়মাস সামার থাকে, মানুষ ত্বকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি সংগ্রহের জন্য পাবলিক নুইসেন্স না করে শরীর যতদূর সম্ভব এক্সপোজ করে ত্বকে সূর্যের আলো লাগিয়ে থাকে। এখানে চাপিয়ে দেওয়া কোথায় হলো? ছেলেরা ব্রিফ পরে শরীরে রোদের আদর মাখতে পারবে, আর নারীরা পারবে না? মোল্লাদের মতো ত্বক উন্মুক্ত দেখেই তা শরীর দেখানো হচ্ছে বলে ফতোয়া দিলে আর তাদের সাথে পার্থক্য রইলো কী? আজ পর্যন্ত কোথাও কোন নারীকে বিকিনি পরে বিজ্ঞাপনে মডেল হতে জোর করা হয়েছে? নাকি দোররা মারা হয়েছে? এখানে ‘শিয়াল মুরগির স্বাধীনতা চাইবেই’ জাতীয় কোন স্বার্থ নেই পুরুষের, যে নারী বোরখা খুলে ফেললে সে দৃষ্টিসুখ নেবে। নারী তার নিজের শরীরকে ঢেকে রাখার মত প্রেশাস বা অচ্ছুৎ দুইই ভাবা থেকে বিরত হয়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে আরেকজন পুরুষের মতোই সাধারণভাবে বাহু, গলা, মাথা, চুল উন্মুক্ত করে স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারবে — এই আত্মবিশ্বাস নারীর স্বার্থেই জরুরি।

৭) নবজীবন বনাম নর্মালাইজেশন

বোরখা পরে খেলাধূলার চর্চা (আসল ম্যাচ নয়) করলে কেউ তেড়ে আসছে না প্রপার পোশাক নেই কেন বলে। মোল্লারাও তেড়ে আসছে না ধর্ম গেল বলে। তারা ভালো করেই জানে নর্মালাইজিং কাকে বলে। বোরখা পরে সব ধরনের কাজ, খেলাধূলা করা যায় – এটা প্রতিষ্ঠিত করাও তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। তারা জানে এই বিংশ শতাব্দীদে চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতি মোকাবেলা করতে ডুয়াল ফ্যামিলি ইনকাম ছাড়া গতি নেই, নারী আজ না হলেও কাল বাইরে পা বাড়াবেই। হিজাব এবং বোরখা হচ্ছে সেই মুক্তির ফ্রিডম ট্যাক্স। যা খুশী করো, বাস্কেটবল খেলো, ফেন্সিং করো, কিন্তু তুমি যে পুরুষতন্ত্রের কন্ট্রোলে এবং মনিটরে আছো, সেই ফ্ল্যাগ তোমাকে বহন করতেই হবে! বোরখা/হিজাবী নারীদের খেলাধূলা তাই আশাব্যঞ্জক প্রগতির/মুক্তির সিম্বল ততটা নয়ু, যতটা পরাধীনতার সিম্বল। মোল্লাতন্ত্র পারলে পরিবারের মেয়েকে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টারেও পাঠাবে, যদি সে তার নিয়ন্ত্রণ এর সিম্বল হিসাবে হিজাবকে সারা দুনিয়ায় এডভার্টাইজ করার সুযোগটা পায়! এই অন্দরমহলের বাসিন্দারা বাইরের পৃথিবীর স্বাদ পেয়ে আস্তে আস্তে বোরখা হিজাব ত্যাগ করবে, সেই আশা করা বাতুলতা। কারণ দেখা গেছে হিজাবি এথলিট বলে এরা বাড়তি মিডিয়া এটেনশন পেয়ে যত ‘আধুনিক’ হচ্ছে, হিজাব আরো চেপে ধরছে তাদের চয়েস বলে! ডিসকোয়ালিফাই, বা দল থেকে বাদ পড়লেই ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ আনছে।

আলোচ্য নারীটি মোটেই বোরখা থেকে মুক্তির প্ল্যান নিয়ে ক্রিকেটে উৎসাহ দিতে আসেননি, যেমনটি অনেকে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এই প্রাক্তন এথলিট নারী জন্ম থেকেই মুক্ত ছিলেন, পরে বোরখা ধরেছেন। শ্বশুর তাকে খেলাধূলার অনুমতি দিয়েছেন বিয়ের পরে, কিন্তু কঠোর শর্ত ছিল যে তাকে পর্দা করতে হবে! এই পরস্পরবিরোধী আদেশ শুনে আমাদের কতিপয় সো-কল্ড সেকুলার নাস্তিক ব্যক্তিত্ব গলে জল হয়ে আশাবাদি হলেন, কিন্তু একবারো ভাবলেন না, কোন প্রফেশনাল স্পোর্টস তাকে এই পোশাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার সুযোগ দেবে? বোরখাকে কখনোই অ্যারো ডাইনামিক করা সম্ভব নয়, সেটা করতে গেলে শরীরের সাথে লেপ্টে থাকতে হয়, যা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এর আর আধুনিকিকরণ সম্ভব নয়। কম্পিটিটিভ তো নয়ই। এখন কেউ যদি পুরানো স্থবির কোনকিছুকে চয়েজ হিসাবে আঁকড়ে ধরতে চায় তাহলে তাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রশ্ন করা একেবারেই অনুচিত। কিন্ত সেটিকে আশাব্যঞ্জক বা বিপ্লব হিসাবে প্রমোট করা আরো বেশি অনুচিত, প্রগতিবিরোধী কাজ, যেখানে আলোচ্য ব্যক্তি মুক্ত জীবনের ছোঁয়া ইতিমধ্যেই পেয়েছেন। ব্যক্তিগত লেভেলে না গিয়ে বোরখার ইন জেনারেল সমালোচনা অব্তোঁ রাখা জরুরি, যদি কেউ একমত হন যে বোরখা একটি আত্মমর্যাদাহীন চয়েজ, এক ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।

৮) বোরখায় বোরখা আনে, মুক্তি নয়

একটি ছবিতে দেখলাম, ওই বোরকা পরা নারী সাথে করে আরো দুই বোরখা পরিহিতা ‘সহেলিয়া’ নিয়ে এসেছেন। জীবন্ত বস্তুর ছবি থাকে বলে জাতীয় পশু বাঘের মুখের লোগোতে টেপ দিয়ে ঢেকে দেয়া দেশের একজন খ্যাতনামা মোল্লা ক্রিকেটার, যে কিনা কোরবানির দিন পশুর রক্তমাখা ছুরি হাতে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছবি আপলোড করেন, সেই তিনি উপহার সামগ্রী নিয়ে মা ছেলেকে বরণ করতে এসেছেন তিনি বোরখা ত্যাগ করবেন বলে নয়, বরং দলবল ভারী করে প্রমোট করবেন, এই আশাতেই। এভাবে একে একে এক সময়ে আবৃত্তি করা বোরখাওয়ালীরা টিভি চ্যানেলের নিউজ রুমে খবর পড়া প্র্যাকটিস করবেন, প্লেনের ককপিটের সিমুলেশনে নারী ক্যাপ্টেন পাইলটের পাশে বসে এক্স-পাইলট বোরখাওয়ালী প্লেন চালানো প্র্যাকটিস করবেন, এক সময়ের ডাক্তার বোরখাওয়ালী নারী হার্ট সার্জেন এর সাথে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে শ্যাডো প্র্যাকটিস করবেন আর এই দৃশ্য দেখে একদল যখন প্রকাশ্যে বলবে যে বোরখা নারীর ক্যারিয়ারে কোন বাধা নয়, তখন আমরা আশাবাদী হয়ে তালি দেব যে উনারা একসময় বোরখা ছুঁড়ে ফেলবেন? অথবা এটি নিছক মা ছেলের নির্মল বিনোদন বলে আর কোন ডাইমেনশন দেখতে অস্বীকার করবো? অন্যরা যারা অন্য কিছু খুঁজে পায় তাদের চোখ রাঙ্গাবো?

ইসলাম এভাবেই আপাত নিরীহ, সেকুলার প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের সাথে আধাআধি সংযুক্ত হয়ে টিকে থাকে। একদল বলে শুধু বোরখাই দেখলেন, মানবতা দেখলেন না? আরেক দল বোরখা ছাড়া একই কাজ করলে বলে শুধু মানবতাই দেখলেন, অশ্লীলতা দেখলেন না? এই চালাকি বোঝা তো খুব কষ্টকর নয়। সেকুলারদের সেকুলার ভ্যালুজ দিয়েই ক্রমাগত ঘায়েল করে যায় মৌলবাদীরা, আর কিছু বললেই সেকুলাররাই পাল্টা বিগট্রির অভিযোগ তোলে! সারাক্ষণ সিস্টেম আর সিস্টেম এর ভিক্টিম এর মধ্যে লুকোচুরি খেলে যেন সিস্টেম মানুষ চালায় না!

বোরখা যদি চয়েজই হয়, আমাদের সংস্কৃতির অংশই হয়, তাহলে ছুঁড়ে ফেলাতেই বা তারা এতো খুশী কেন? তাদের খবর পড়া, প্লেন চালানো, সার্জারি করার মতো গুণ থাকলে পোশাকে কি আসে যায়? এমপ্লয়াররা কেন এদেরকে সুযোগ দিতে ডিসক্রিমিনেশন করবেন? অতএব সর্বস্তরে ওহাবিজম এর সিম্বল বোরখার প্রসার ঘটুক! কিন্ত এই আশাবাদী উৎসাহদাতারাই আবার চান ইসলাম নিপাত যাক…কি অদ্ভুত বৈপরীত্ব! এনারা বলেন বোরখার পেছনে না লেগে সিস্টেম বদলাতে, কিন্তু এটা কখনোই বলেন না যে ইভটিজিং থেকে বাঁচার উপায় হিসাবে বোরখাকে প্রমোট না করে ইভটিজিংকেই দূর করতে হবে! সেইবেলা তারা বলেন, “আহারে, নারী যদি ইভটিজিং থেকে বাঁচতে বোরখা ধরেন তাহলে তাকে সেই স্বস্তিটুকু আমাদের দেয়া উচিত!”

৯) ইসলামী এপোলজিস্ট এর নতুন ভার্সন সেকুলার হোপোলজিস্ট

আমাদের সেকুলার মুক্তমনাদের অনেকের প্রবণতা হলো তার একান্ত নিজস্ব সেন্সিভিটির লেভেলকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করা। তারা মূল বিষয়ে একমত যে অমুক বিষয়টি আদর্শ নয়, বরং ক্ষতিকর। কিন্তু অভ্যাস, সংস্কার, সিস্টেম এর অজুহাতে তারা কিছু ছাড় দিতে চান। এবং কেউ মূল লজিকে তার পজিশন অনড় রেখে সমালোচনা চালিয়ে গেলে তাদের জাজমেন্টাল, উগ্র, নিষ্ঠুর ইত্যাদি বলে অভিহিত করেন। ছাড় দেওয়া মানে হচ্ছে কিছু না কিছু কম্প্রোমাইজ করা, কমপ্যাশন দেখানো বলতে অনেক সময়েই ‘আমি জানি অমুকে অন্যায় করেছে, কিন্ত তাকে মাফ করে দেওয়া হোক’ বলে শর্তহীন দায়মুক্তি চাওয়া বোঝায়। এই দাবী একটি রিকোয়েস্ট হিসেবে পেশ করার কথা ছিল, কিন্তু এপ্রোচটা অনেক সময়ই ‘দাবি মানতেই হবে’ টাইপ হয়ে যায়। এরা দুই লাইন ইসলাম এর সমালোচনা করেন তো এক লাইন ব্যালেন্স করার জন্য ব্যস্ত হয়ে যান। নিজের পয়েন্ট মেক করার সময়ে সবার উপরে লজিক থাকলেও অন্যের পয়েন্ট মেক করার সময় সবার উপরে মানুষ এসে যায়!

তাও কোন কনসিস্টেন্সি নেই। এক ইস্যুতে নরম তো সিমিলার আরেক ইস্যুতে গরম! একেবারে রাজা রাজরার আমলের এটিচিউড; আজকে মেজাজ খারাপ তো বন্দীদের গর্দান নাও, কালকে বাদশাহর জন্মদিন বিধায় মেজাজ খোশ তো ২০০০ বন্দী মুক্ত করে দাও! একটু ‘আহারে’ বলে ধুয়া তুললেই হল। বাকি সবাইকে তাদের এই মুড সুইং এর উপর ভিত্তি করে কমপ্যাশনের পারদ ওঠা নামানো করতে হবে সব যুক্তি শিকেয় তুলে রেখে! এই নিজের মন মত বিচার করার, ডিসক্রিসান এপ্লাই করে রায় দেবার একক অধিকার তাদের কে দিয়েছে? এটা বাদ দিয়ে ওটা করেন, অমুকটা ইগনোর করেন, তমুকটা না বললে কী হয়? — এই রেটরিকগুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত ওপিনিয়ন এবং টেম্পেরামেন্ট এর বিষয়। এগুলো মূল বিতর্কের অংশ হতে পারে না। আপনি দয়ালু বলে তর্কে জিতে যাবেন না আপনা আপনি। কোনটা লেনিয়েন্সি আর কোনটা কম্প্যাশন সেটা বুঝতে হবে। লেনিয়েন্সির সোশ্যাল রিপারকাশান, প্যারলদাতার দায়িত্ব সম্বন্ধে ধারণা রাখতে হবে। যুদ্ধপরাধীকে ক্ষমা করা মানবিকতা নয়, ভিক্টিমদের বিচার পাবার অধিকারকে অস্বীকার করার অমানবিকতা।

আপনার নিকটাত্মীয়া বোরখা পরে বলে আপনার সমালোচনা করতে বাধে, তাই আর কেউ সাহস করে তার আপনজনদের বেলায় তা করতে পারবে না, করলে তা বাড়াবাড়ি হবে সেটা ধরে নেওয়া কি ঠিক? কেউ এন্টিবায়োটিক এর ডোজ পুরা করতে চাইলে তাতে বাধা দেবার আপনি কে? অন্যে অধম বলে আপনি উত্তম হন ভাল কথা, কিন্তু সবাইকেই উত্তম হতে হবে কেন? কোন পদ্ধতি ইপ্সিত রেজাল্ট আনবে সেই বিতর্কে না গিয়েও স্পেড কে স্পেড বলা যায়। বলা উচিত ও যদি যুক্তি আপনার পক্ষে থাকে। বাস্তবতার সাথে ফ্রি স্পিচ এর কোন সম্পর্ক নেই। একশনের সাথে থাকতে পারে।

‘জাজমেন্টাল’ কোন গালি হতে পারে না, যদি জাজমেন্টকে ভুল প্রমাণ না করা যায়। আপনি কোন ব্যক্তিগত কারনে বা সাহসের অভাবে স্পেড কে স্পেড বলতে অক্ষম সেজন্য কেউ আপনাকে সমালোচনা করছে না। সবার সাহস, সুযোগ, স্যাক্রিফাইস বা ডেডিকেশন লেভেল সমান হয় না। করছে যখন আপনি উল্টো জাজ না করাকে প্রমোট করেন বা অন্যরা কেন জাজ করছে তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন, তখন।

শেয়ার করুন:
  • 150
  •  
  •  
  •  
  •  
    150
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.