‘তাসের ঘর’ ও একজন দৃঢ়চেতা স্বস্তিকা

শেহেরীন আমিন সুপ্তি:

গেল ৩ সেপ্টেম্বর জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-এ মুক্তি পেয়েছে শর্ট ফিল্ম ‘তাসের ঘর’। পরিচালনায় সুদীপ্ত রায় এবং অভিনয়ে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়।

‘তাসের ঘর’-এর গল্প জুড়ে রয়েছে সুজাতা। একজন বাঙালি গৃহবধূ, যে একা থাকতেই ভালোবাসে। আর দশটা বাঙালি বউ এর মতো নিজের ঘর, সংসার, স্বামী সেবাতেই দিন কাটে তার। প্রথমদিকে দেখে মনে হবে কর্তৃত্ববাদী, পরকীয়ায় আসক্ত, মারকুটে স্বামীর সাথে নিরীহ গৃহবধূর নিত্যদিনের খাপ খাইয়ে চলার গল্প নিয়েই সাজানো পুরো ছবি। করোনা অতিমারীতে লকডাউনের সময় বিষাক্ত জীবনসঙ্গীর সাথে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতি মুহূর্ত এক ছাদের নিচে বদ্ধ জীবনযাপন করা তো কম জটিল গল্প নয়! কিন্তু আসলে তা না। এই ছবির কাহিনী এর চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

সবজি কাটার ছুরি থেকে শুরু করে পরকীয়া প্রেমের সম্পর্কের মতো সব দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য বিষয়কে সুজাতা বিচিত্র সব গন্ধ আর রঙ দিয়ে স্বতন্ত্র করে দেখে। একা থাকতে শেখার অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় ভিড়বাট্টা খুব একটা পছন্দ করে না সে। দর্শকদের সাথে সরাসরি গল্প করার ছলে চলচ্চিত্রের ভাষার ফোর্থ ওয়াল ব্রেক করে সে বারবার। সুজাতার জবানিতে তার জীবনের গল্প শুনতে শুনতে কখনও কখনও সুজাতাকে যেমন অসহায় আর নিরুপায় মনে হয়, তেমনি কখনো কখনও তার মুখভঙ্গিতে ফুটে উঠে প্রতিশোধ পরায়ণতার আভাসও।

‘তাসের ঘর’-এর সুজাতার মনস্তত্ত্ব নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রধান কারণ সুজাতার পরিস্থিতির সাথে অসংখ্য বাঙালি বধূর সাদৃশ্য। গৃহবন্দি নারীর নিজস্ব জগৎ নিয়ে বাংলা সিনেমা বা সাহিত্যে কাজের সংখ্যা বেশ নগণ্যই বলা চলে। এক্ষেত্রে ‘তাসের ঘর’ একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবেই আলাদা জায়গা নিয়ে থাকবে।

করোনাকালীন লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে অসংখ্য বাড়িতে বিষাক্ত সম্পর্কের ভেতর প্রতিনিয়ত শারীরিক, মানসিক নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছেন অগণিত নারী। চড়-থাপ্পড় থেকে শুরু করে বৈবাহিক ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের জন্য। দিনরাত্রি এসব অত্যাচার সহ্য করেও হাসিমুখে অসংখ্য গৃহবধূ সংসার করে যাচ্ছে। ‘তাসের ঘর’-এর সুজাতা চরিত্রটি সেসব গৃহবধূদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

অতিমারীতে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও তা নিয়ে আমাদের গণমাধ্যমগুলোয় উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ দেখা যায়নি। এরকম সময়ে এসে ‘তাসের ঘর’ এর মতো কাজ খুব দরকারি ছিল।

‘তাসের ঘর’-এর গল্প জুড়ে যার একমাত্র প্রাধান্য সেই সুজাতার চরিত্রে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় এর অভিনয় দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। স্বনামধন্য এই অভিনেত্রী তার অভিনয় জীবন ছাড়াও ব্যক্তিগত জীবনের সাহসিকতার জন্য বরাবরই আলোচিত হয়ে চলেছেন। ৩৯ বছর বয়সে এসেও ক্যারিয়ারে নিত্যনতুন সফল এক্সপেরিমেন্টের সাথে সিঙ্গেল প্যারেন্টের দায়িত্ব পালন করে যেতে হলে বোধ হয় সাহসী হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ নেই।

ব্যক্তিজীবনের নানা ধাপে অসংখ্যবার অপ্রাসঙ্গিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে স্বস্তিকাকে। এসব সমালোচনার দাঁতভাঙা জবাব দিতে একবারও ছাড় দেননি তিনি। তার প্রাক্তন প্রেম নিয়ে টিপ্পনীই হোক কিংবা বডিশেমিং অথবা নতুন কোনো হেয়ার স্টাইলের বিষয়ে কটু কথা, সবেতেই সরাসরি উত্তর দেন স্বস্তিকা।

নিজের লাইফস্টাইল, কাজ, ব্যক্তিত্ব নিয়ে এমন খোলাখুলি দৃঢ়চেতা অভিনয়শিল্পী খুব কমই চোখে পড়ে। কয়েকদিন আগে সাইবার বুলিং এর শিকার হয়ে তা এড়িয়ে যাওয়ার বদলে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে আবারও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে সবসময় ইতিবাচক চিন্তায় বিশ্বাসী এই অভিনেত্রী সামাজিক যেকোনো অসংগতি নিয়েও সবসময় সরব থাকেন সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে।

‘তাসের ঘর’-এর প্রচারণার সময়ও বেশকিছু ভিডিওচিত্রে স্বস্তিকার প্রতিবাদী বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায়। এ ছবির পোস্টারে সুজাতার ব্রা-এর স্ট্র্যাপ দেখা যাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল হওয়ার পর কড়া ভাষায় তার প্রতিবাদ করেন স্বস্তিকা।

শেহেরীন আমিন সুপ্তি

তার ভাষায়, “আজকাল সাধারণ বিষয়গুলোই তো অসাধারণ বিষয়। চাঁদে কে গেল, না গেল, তা নিয়ে মানুষের মাথাব্যথা আছে? অন্য গ্রহ নিয়ে যে গবেষণা হচ্ছে, সেটা নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। অতি সাধারণ বিষয়, মহিলার ব্রা, যেন কালকেই এটা সবাই জানলো। ওমা, মহিলারা ব্রা পরে বুঝি! আমার পোস্টারটা দেওয়ার পরেই যেন মানুষ জানতে পেরেছে মহিলারা অন্তর্বাস পরে। এটা যে কোভিডের থেকেও বড় ঘটনা। কোভিড ২০-র পর এটা ব্রা ২০। নতুন ভাইরাস। মানুষের তো এগুলো নিয়েই যত মাথা ব্যথা।”

তিনি আরো বলেন, “আমার শরীর, আমার বুক, আমার ব্রা, আমার স্ট্র্যাপ। যেরকম ইচ্ছা আমি ওটাকে রাখবো। কোথায় লেখা আছে অন্তর্বাস সেফটিপিন দিয়ে জামাকাপড়ের মধ্যে আটকে রাখতে হবে? ছেলেরাও তো স্যান্ডো গেঞ্জি পরে, শার্ট খুলে ঘুরে বেড়ায়। আমরা তো দেখি, দু-তিনটা বোতাম খোলা গেঞ্জি দেখা যাচ্ছে। আমরা কি তা নিয়ে মিটিং মিছিল করি? আর ব্রা-এর স্ট্র্যাপ দেখা যাচ্ছে, তা নিয়েই যত আলোচনা। আমাকে একজন লিখলেন ৩ সেপ্টেম্বর দেখবো, কী গল্প। আরে ব্রা-এর সঙ্গেও গল্প থাকতে হবে! এটা তো একটা বাড়ির মধ্যে থাকা গৃহবধূর গল্প। বাড়িতে ব্রা পরে আছি, এটাই অনেক না! লকডাউনে বাড়িতে ব্রা পরে থাকবোই বা কেন? পরেছি এ-ই অনেক। না পরা উচিত ছিল, এরপর থেকে আর পরবো না।”

ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, এমন ইতিবাচক চিন্তাধারার স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ‘তাসের ঘর’-এর মতোই বিচিত্র ও শক্তিশালী বার্তাসমৃদ্ধ সব কাজের মাধ্যমে আরো দৃঢ় মনোবলে এগিয়ে যাবেন, এই প্রত্যাশাই রইলো।

-শেহেরীন আমিন সুপ্তি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
  • 283
  •  
  •  
  •  
  •  
    283
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.