বোরকা, হিজাব প্রশ্নে ‘চয়েজ’ শব্দটিই ভণ্ডামি

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)
প্রথমেই একটা ভ্রান্তি দিয়ে আপনারা এই আলোচনাটা শুরু করেন আর মূল প্রসঙ্গটা আড়াল করেন। বোরকা, হিজাব ইত্যাদি প্রসঙ্গে যখন আলোচনাটা আসে, যখন নারীবাদী বা নারী অধিকার কর্মী বা এইরকম কেউ নারীর উপর আরোপিত ‘পর্দা’ নিয়ে কথা বলেন, তখন আপনারা তার বিরোধিতা করেন। বিরোধ করতে গিয়ে প্রথমেই যেকথাটা বলেন সেটা হচ্ছে, নারীর নিজের পছন্দ বা ইচ্ছা ইত্যাদির কথা। আপনারা শুরুই করেন এই কথা বলে যে কেউ যদি হিজাব বা বোরকা পরিধান করতে চায় সেটা তার ইচ্ছা বা তার ব্যক্তিগত পছন্দ, সেটাতে বিরোধ করার কি অধিকার নারীবাদীদের আছে? ইত্যাদি। আপনাদের এই কথাটা মিথ্যা। নারী নিজের ইচ্ছায় বা নিজের পছন্দে পর্দা করে বা বোরকা পরে এই কথাটা সত্যি নয়- এটা মিথ্যা কথা, এটা ছল এটা প্রতারণা এটা চাতুরী।

কোন নারীই নিজের ইচ্ছায় পছন্দ করে বোরকা পরে না। নারীকে নির্দেশ দেওয়া আছে যে তুমি তোমাকে আবৃত করে রাখবে। তুমি হচ্ছ সুস্বাদু রসগোল্লার মত পুরুষের খাওয়ার জিনিস। তোমাকে দেখলে পুরুষের দিলের ভেতর লাল ঝরবে। তোমাকে দেখলে পুরুষের লোভ হবে। সেটা হবে চোখের জ্বিনা। তুমি নিজেকে অনাবৃত রেখে সেই জ্বিনায় অংশ নিচ্ছ, সেই জন্যে তুমি জাহান্নামের আগুনে অনন্তকাল জ্বলবে ইত্যাদি। এইটা হচ্ছে তার বিশ্বাসের নির্দেশ। সাথে আছে সামাজিক চাপ। পর্দা কর, হিজাব পর বোরকা পর, তাইলে লোকে তোমাকে ভাল বলবে, নাইলে মন্দ বলবে। পরিবারের চাপ- আমরা ধার্মিক পরিবার, আমাদের বাড়ীর মেয়েরা বোরকা পরতে হবে, হিজাব পরতে হবে, মজা দিয়ে পা হাত ঢেকে রাখতে হবে।

(২)
এই পরিবেশটা পুরুষরাই তৈরি করেছে। বলে কিনা মডেস্টি। মাছ যেমন পানিতে থাকে, পানিটাই তার কাছে পৃথিবী। আমরাও নারীদের জন্যে পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবী তৈরি করেছি। এইখানে আমরা মানবশিশুকে নারীতে পরিণত করি। শৈশব অতিক্রান্ত হতে থাকে আর শিশুটা নারী হতে থাকে। সে শিখতে থাকে যে তার পিতা তার ভাই এবং পরিবারের পুরুষরা, ওরাই হচ্ছে মানুষ আর সে হচ্ছে মেয়ে মানুষ। মেয়ে মানুষ নিজের মালিক নিজে নয়- মেয়েমানুষের মালিক হয় পুরুষ। পিতার ঘরে সে জন্মে বটে, পিতার ঘর তার ঘর নয়। পিতার কাছে ভ্রাতার কাছে সে একটি আমানত মাত্র। মূল্যবান আমানত। পিতা ও ভ্রাতার কাজ হচ্ছে ওকে খাইয়ে পড়িয়ে তরতাজা করে বড় করে ওর জন্যে একটা মালিক খুঁজে মালিকের হাতে তাঁকে তুলে দেওয়া। এইটাকেই সত্যি ধরে নিয়ে যে শিশুটি নারীতে পরিণত হয়, তার কি আর পছন্দ থাকে সে পর্দা করবে কি করবে না? না, থাকে না।

বেশীরভাগ সময় নারীরাই শিশু থেকে নারী তৈরি করে। মা খালা দাদী নাই ওরাই শিশুকে শেখায়- তুমি মেয়ে মানুষ, তোমার এই শরীরের মালিক তুমি নও, এটাকে তুমি রক্ষা করবে তোমার ভবিষ্যৎ মালিকের জন্যে। নারী আমনে হচ্ছে স্ত্রীলোক বা দাসী। তোমাকে তোমার স্বামী বা মালিকের হাতে তুলে দেওয়া হবে, মালিকই তোমার জান মালিকই তোমার প্রাণ, তোমার প্রভু। একসময় এটাও শেখানো হতো যে মালিকের মৃত্যুর সাথে তোমাকেও মরতে হবে- সহমরণ। নারীরা শেখায় বটে, কিন্তু এইটা হচ্ছে পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্রই নারীকে নির্দেশ দেয়- হিজাব পর, বোরকা পর। যেসব আন্রিরা এসব শেখায়, ওরা হচ্ছে চেতনার দিক দিয়ে পুরুষের দাসী। ওদের দোষ নাই- সেইভাবে ওদেরকে তৈরি করা হয়েছে।

আপনি একদিকে এই পুরুষতান্ত্রিক হেজিমনি বজায় রাখবেন আবার মিষ্টি হেসে বিজ্ঞের মতো বলবেন যে হিজাব পরবে কী পরবে না সেটা নারী ইচ্ছা, নারী পছন্দ, নারীর স্বাধীনতা। চাবুক দেখলে সিংহ গিয়ে উঁচু তুলের উপর বসে- সেটাকে বলবেন সিংহের স্বাধীনতা? ওর ব্যক্তিগত পছন্দ? এইসব হচ্ছে ভণ্ডামি।

(৩)
বলতে পারেন যে তাইলে কিছু নারী যে পর্দা করে না? সেটা তাইলে কী? বোরকায় আপাদমস্তক না ঢেকে শাড়ি ব্লাউজ পরে নারী বাইরে যাবে- এই জায়গায় আসতে নারীকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীকে গালি শুনতে হয়েছে- যারা পর্দা করে না ওদেরকে গালি দিতো একসময় সমাজের লোকেরা। নষ্টা ভ্রষ্টা হিসাবে চিহ্নিত করতো ওদেরকে। সেই প্রবণতা এখন পুরোপুরি নাই বটে, কিন্তু এখনো কোথাও কোথাও নারীকে কথা শুনতে হয় বোরকা না পরার জন্যে। এখনো হুজুররা গালি দিতে থাকেন জিহ্বায় সবরকম তিক্ততা আর ঘৃণা মেখে- গালি দেয় সেইসব নারীকে যারা শাড়ীর আঁচল উড়িয়ে রিকশায় করে চলাচল করেন। গালি দেয় সেইসব নারীকে, যারা কারখানায় বা অফিসে আদালতে কাজ করেন।

গত দুদিন ধরে দেখছি আপনারা বলছেন যে ঐ নারীটা বোরকা পরেছে, সেটা তার ইচ্ছা, ওকে সমালোচনা করা নাকি অন্যায়! বটে! নারী স্বেচ্ছায় নিজের পছন্দে বোরকা পরে? ফালতু কথার আর জায়গা পান না? নারীকে জোর করে বোরকা পরানো হয়। দৃশ্যমান গায়ের জোর হয়তো না- কিন্তু জোর তো বটেই। সরকারি চাকরি করে যে মেয়েটা- বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনদিন পর্দা করেনি- দেখবেন মাথায় একটা হিজাব জড়িয়ে ফেলেছে। কেন? এমনিই? চয়েস? জি না। ঐটা না পরলে লোকে ওকে মন্দ বলবে, গালি দিবে, সেই ভয়ে। নারীর মনে হয়, থাক, অসুবিধা কী, মানুষ ভালো বলবে ইত্যাদি। খুঁজে দেখেন আপনার আশেপাশে- জিজ্ঞাসা করেন নারীদেরকে, কেন হিজাব পরা শুরু করেছো? দেখেন কী বলে?

ঐসব ভণ্ডামি দেখাতে আসবেন না। নারীকে পর্দার পিছনে আড়াল করেছে পুরুষ- পুরুষ শাসিত সমাজ, পুরুষের প্রচলিত বিশ্বাস ইত্যাদি। আর ঐটার পিছনে যুক্তি কী? যুক্তি একটাই- নারী মানুষ না, নারী হচ্ছে ভোগের বস্তু, সুস্বাদু মূল্যবান বস্তু, ওকে ঢেকে রাখতে হবে। আর ঐখানেই পর্দা বা হিজাব বা বোরকাতে অন্যায়টা।

(৪)
এইটা যেদিন অনুধাবন করবেন, যে নারীও মানুষ একজন পুরুষের সমানই মানুষ, পিতার ঘর কন্যাশিশুরও ঘর, পিতার ঘরে সে আমানত নয় বা দুদিনের মেহমান নয়, তাইলে দেখবেন আপনার চোখ খুলে যাবে, আপনি স্পষ্ট দেখতে পাবেন পর্দাটা কেন নারীর উপর অন্যায়। যেদিন অনুধাবন করবেন যে আপনি আর আপনার বোন দুজন দুরকম বটে, কিন্তু দুজনেই মানুষ- আপনার বোন আপানর তুলনায় অধম নয়- সেদিন দেখবেন আপনার চোখ খুলে যাবে। যেদিন অনুধাবন করবেন যে নারীর শরীর দেখে যদি কারো দিলের মধ্যে লালা ঝরে সেটার দায় নারীর নয়, সেটার দায় ঐ লালামুখো শুকরের, সেদিন স্পষ্ট দেখবেন পর্দার নামে একজন মানুষকে এইরকম বস্তায় ভরে রাখা অন্যায়।

যেসব বন্ধুরা বিজ্ঞের মতো মতামত দিচ্ছেন, বোরকা পরে পুত্রের সাথে ক্রিকেট খেলতে গেছে তাতে অসুবিধা কী? যারা প্রগতিশীল নারীবাদী নাস্তিক এদেরকে মুখ ঝাল করে গালি দিচ্ছেন, ওদেরকে বলি- ভাই ও বোনেরা, ঐ নারীটিকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ও মা, তুমি বোরকা পরেছো কেন, সত্যি কথাটা বলো। দেখবেন সেই নারীটি কী জবাব দেয়। তিনি বিশ্বাসের কথা বলবেন, বা সমাজের কথা বলবেন, বা যাইই বলুন- এইটা পরতে আমার ভালো লাগে, নিজেকে সুন্দর মনে হয় এই কথাটা তিনি কক্ষনো বলবেন না (যদি না নিতান্ত মিথ্যাবাদী বা দাসী প্রকৃতির হয় আরকি)। বোরকা তিনি বাধ্য হয়েই পরেছেন, নিজের ইচ্ছায় পরেননি।

বাকি তর্কের আগে এইটা ঠিকঠাক মতো বুঝে নেন- হিজাব বা বোরকা কেউ বাই চয়েস পরে না, বাধ্য হয়ে পরে। এরপর তর্ক করতে আসবেন, তখন আপনাদের ‘কলনিয়াল মাইন্ডসেট’ ‘ইসলামোফোবিয়া’ ইত্যাদি নানারকম ভারি ভারি কথা শুনবো। তার আগে পর্যন্ত- হে মেল শভিনিস্ট পিগ, তোদের এইসব ফালতু বাত বহুত শুনেছি, ভাগ।

(লেখকের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া হয়েছে লেখাটি)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.