জামাত-শিবির-রাজাকার ও ধর্মান্ধতা (২য় কিস্তি)

Religion in BDতানিয়া মোর্শেদ: (এপ্রিল ৩, ২০১৩) বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান ভাবেন “মুসলমান (মানুষ নয়) সৃষ্টির সেরা জীব।” তাই মন্দির, অন্য ধর্মের  উপসানালয় ভাঙ্গলে কোনো প্রতিবাদের মিছিল হয় না। অন্য ধর্মকে কটাক্ষ করে কিছু বললে কারো ধর্মানুভূতিতে  আঘাত লাগে না। মুসলমানরা হিন্দুদের সামনে গরু খাওয়ার গল্প তো বটেই, গরু জবাই করতেও পিছপা হয় না। একবার কি এরা ভেবে দেখেছেন, যখন খৃষ্টানদের দেশে বাস করেন, তখন যদি শুয়োর মারা দেখতে হতো, শুয়োর খাবার গল্প শুনতে হতো এমন কারো কাছ থেকে যে জানেন যে, তিনি তা খান না!

একবার একজন বলেছিলেন যে, একজন হিন্দু একজন বাংলাদেশী মুসলমানের সামনে শুয়োরের মাংস খেয়েছিলেন রেঁস্তোরায়। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, অভিযোগকারী মানুষটি কি গরুর মাংস খাচ্ছিলেন তখন সেই হিন্দু মানুষটির সামনে? উত্তর কি হবে তা জানতাম!  বলেছিলাম তাহলে অভিযোগ কেন? খৃষ্টান কেউ ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হলে মহাখুশী। ইসলামকে ব্যবহার করে খৃষ্টান/ হিন্দু মারলে সবাই চুপ। কোনো প্রতিবাদ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে গোরকে ভোট দেননি, কারণ লিবারম্যান ইহুদি। ভোট দিয়েছেন বুশকে! ইহুদিদের কোম্পানিতে চাকুরি করতে অসুবিধা নেই। রবীন্দ্রনাথ ভারতের! নজরুল বাংলাদেশের! নেই দু’জনের সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান।

নাস্তিকতা নিয়ে তো কথাই বলা যাবে না। কলমের/কী বোর্ডের আঘাতে ধর্মানুভূতি কাৎ! জামাত-শিবির রগ, কল্লা কেটে ফেললেও (অবশ্যই অন্যদের) প্রতিবাদ নেই।

এতদিন ভেবেছি, বাংলাদেশে বাস করলে তো আর এসব দেখতে/ শুনতে হতো না! আজ ভুল ভাঙ্গলো! মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলের সরকার বাংলাস্তান বানানোর ব্যবস্থা শুরু করেছেন! চাপাতির বদলে কীবোর্ড-এর ভয়ে অস্থির! তাই এত এত বড় বড় অপরাধী বাদ দিয়ে নাস্তিক ব্লগার ধরতে লেগেছে। হেফাজতে (জামাতে) ইসলামের তেরটি দাবি দেখবার পর থেকে মনে হচ্ছে, সন্তানকে আর মিথ্যে মিথ্যে (সত্য ভেবে যা বলি তা কী আসলে সত্য?) বাংলাদেশের মানুষদের সম্পর্কে ভালো কথা বলবো না!!

এপ্রিল ৪, ২০১৩: এক ব্লগারের পোস্টে পড়লাম, কেন, কিভাবে গ্রামের দরিদ্র শিশুরা মাদ্রাসায় যায়। যা আমার অজানা কিছু নয়। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে অসংখ্য দেশে মানুষের দারিদ্র্য আর অশিক্ষাকে পুঁজি করে চলছে এই ধর্ম ব্যবসা, অনেক অনেক বৎসর ধরে। ১৯৭১-এ গ্রামের অশিক্ষিত/ অর্ধ শিক্ষিত মানুষেরা না থাকলে স্বাধীনতা আসতো না, তাঁদের ত্যাগ  অপরিসীম, বেশীর ভাগ মুক্তিযোদ্ধার শেকড় গ্রামে। তাঁদের কাছ থেকে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” যেদিন থেকে শুধুই শহুরে বুদ্ধিজীবীদের দখলে চলে যায়, সেদিন থেকেই রাজাকার-জামাত- শিবিরের পুনরুত্থান! অথচ স্বাধীনতার পর  আরো বেশী করে গ্রামের মানুষকে বোঝানো দরকার ছিল, স্বাধীনতা কি করে ধরে রাখতে হয়। যে দেশের ৮০+% মানুষের বাস  গ্রামে সে দেশে উন্নয়ন থেকে শুরু করে যে কোনো চেতনাই শুধুমাত্র শহরমুখী হলে চলে? আজ বাংলাদেশের অনেকের মুখে, “দেশ আজ কোথায়/ কী নেই বাংলাদেশে” ইত্যাদি এত গর্ব ভরে উচ্চারণ শুনি! কখনো সরবে কখনো নীরবে বলি, কাদের রক্তঝরা শ্রমের বিনিময়ে? পোষাক শিল্প আর বিদেশে শ্রমিকদের উপার্জনের মাধ্যমেই তো! এ তো রক্তঝরা শ্রম! আরা এরা কারা জানেন তো?

এপ্রিল ৬, ২০১৩-টিভিতে পিল পিল করে আসা লং মার্চের হেফাজতি মোল্লাদের দেখে আমি পেট চেপে ধরে বলা শুরু করলাম যে আমার অনেক ব্যথা হচ্ছে … অনেক ব্যথা! এ কাজ আমি কখনোই করিনি। না প্রথমবার বায়েপসি রেজাল্ট জানবার পর … না দ্বিতীয়বার …না তৃতীয়বার!! আতংকে, ঘৃণায়, দুঃখে, হতাশায়, লজ্জায় বলতে লাগলাম যে, আমি এই দেশে জন্মেছি? এই দেশে? এই দেশের মানুষের জন্য আমার প্রাণ সব সময় কাঁদে? এই দেশের মানুষের খবর আমি আই, সি, ইউ’তে জিজ্ঞেস করেছি? অসুস্থ বাবা, চিন্তিত মা কেমন আছেন জানতে চাইনি! হাত সামান্য নাড়াবার মত হতেই এই দেশের মানুষের জন্য কাজ শুরু করেছি আবার? (এখন পর্যন্ত আমি আমার সন্তানের জন্য কয়েকদিন ডিম সেদ্ধ আর একবার অতি সহজে রান্না করা যায়, রান্না না বলাই ভালো, স্যুপ বানিয়েছি)।  যাদের জন্য কিছু করবার চেষ্টা করছি তাদের মধ্যে কেউ এই মিছিলে শামিল (ভবিষ্যতে) হবে না এমন নিশ্চয়তা কে দেবে? আমি আর কাউকে বিশ্বাস করবো কি ভাবে? কেন?

আমি একবার বললাম যে, একাত্তরে কি এত পাকিস্তানী সেনা এসেছিল? আমার পায়ে সার্জারী এবং ক্যান্সার জানবার পর মাঝে মাঝে আমার মনে হতো ক্যান্সার আমার পা থেকে উঠে আসছে উপরের দিকে, শিউরে উঠতাম! সত্যি ক্যান্সার সেল আমার পা থেকে লাংসে বাসা বেঁধেছে (ছিল কী বলতে পারবো!) আমার আরেক দুঃস্বপ্ন শুরু হলো! আমি দেখতে থাকবো কি মোল্লারা উঠে আসছে … উঠে আসছে … আমার প্রিয় জন্মভূমিকে … না আমি আর ভাবতে চাই না!

ছোট্টবেলায় দীপ্ত একবার জিজ্ঞেস করেছিল যে, আমি ও’কে বেশী ভালবাসি না বাংলাদেশকে? কয়েক সেকেন্ড পর বলেছিল যে, আমি যদি বলি বাংলাদেশ, তাহলে ওর কোনো অসুবিধা নেই! ছোট্টবেলায়ই সে বুঝে গেছে যে, তার মা’র কাছে বাংলাদেশ কী! আমি আর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখতে চাই না! যদি এই দুঃস্বপ্নই দেখতে হবে তবে একাত্তরেই পাকিস্তানীসেনাদের হাতে মারা যাইনি কেন?

লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.