বোরখা পরে ক্রিকেট খেলায় কী সমস্যা?

পুন্নি কবীর:

না, কোনো সমস্যা নাই। আমি যদি ক্যামেরাসহ পল্টন ময়দানে ওই সময় এক্সিডেন্টলি উপস্থিত থাকতাম তাহলে আমিও এরকম মুহূর্তের ছবি ধারণ করতে চাইতাম (তবে অবশ্যই অনুমতি নিয়ে, পত্রিকার সাংবাদিকরা অনুমতি নিয়ে ছবি তুলেছে কিনা আমার জানা নাই)। একজন ফটোগ্রাফারের জন্য এখানে অনেকগুলো মজার উপাদান আছে।

এক> কনট্রাস্ট: একজন বোরখা পরিহিতা নারীর যে প্রতিনিধিত্বকারী রুপায়ন, তার থেকে এই চিত্র খুবই আলাদা।
দুই> মোশন: গতিময় বিষয়কে স্থিরচিত্রে বন্দী করা সবসময়ই ফটোগ্রাফারদের পছন্দনীয়।
তিন> ইমোশন: মা- ছেলের নির্মল আনন্দের কিছু মুহূর্ত, যার পরিস্কার ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন এখানে পাওয়া যায়। তাই দৃষ্টিলব্ধ আবেদনের মূল্য বিচারে এক কথায় এই ছবিগুলা মন ভালো করে দেয়।

তাহলে সমস্যা কী?

সমস্যা হচ্ছে এই ছবিগুলাকে নারী স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে দেখা। এই ছবিগুলার কী অর্থ তৈরি করা (ইন্টারপ্রেটেশন) হচ্ছে, তার ধারণা নেয়া যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় এ সম্পর্কে যে সরগরম আওয়াজ উঠেছে তা বিশ্লেষণ করলে।

একটা বিশাল অংশ এই ছবির জয়জয়কার করছে এই বলে যে, এই তো, বোরখা পরেও নারীরা কীরকম স্বাধীনতা উপভোগ করছে! পর্দা করেও সব করা যায়। আরেক ধাপ বেশি উদারমনারাও বলছে যে, নারীর যেমন বিকিনি পরে সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার স্বাধীনতা আছে, তেমনি বোরখা পরেও ক্রিকেট খেলার স্বাধীনতা আছে। এই দুই দলের কাছেই আমার প্রশ্ন, বোরখা কি নারী স্বাধীনভাবে তার জন্য কখনও নির্বাচন করে? পুরুষতান্ত্রিক ধর্মের ভয়ংকর ডমিনেশন ছাড়া ৩৪-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কি একজন নারী বোরখার মতো একটা পোশাক নিজের জন্য বাছাই করবে? বোরখা কি জাস্ট ‘আ পিস অফ ক্লোদ?’ এর উত্তর দেওয়াটা সহজ করার জন্য আরেকটা প্রশ্ন করি, আমরা এই করোনা-কালে কি মাস্ক পরে একটা সুস্থ-স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপন করতে পারছি? এর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে নাক- মুখ-কান-চুল সব ঢেকে কোনরকম চোখ দুটি বের করে কোন নারী কীভাবে সুস্থভাবে একটা সামাজিক জীবন যাপন করতে পারে?

লেখক: পুন্নি কবীর

আমি ছোটকালে আমাদের পাড়ায় ক্রিকেট খেলতাম। তখন বয়স ১০-১১। বাসায় আমাদের একটা লম্বা প্যাসেজ ছিল যেখানে আমি আমার বাবা আর ভাইয়ের সাথে আরও আগে থেকেই সময় অসময়ে খেলতাম। ব্রায়ান লারার ব্যাটিং মুগ্ধ হয়ে দেখতাম, আর বোলিং করতে চাইতাম ওয়ালশ এমব্রসদের মতো। পাড়ায় আমরা অল্প কয়েকজন সমবয়সী ছেলেমেয়ে পিচের রাস্তায় ক্রিকেট খেলতাম, আর মাঠটা ছিল ছেলেদের দখলে। আমাদের সাথে যে কয়জন ছেলে খেলতো ওরা তখনও ছোট ছিল দেখে বড়দের সাথে খেলার চান্স পেত না। আমি যতো প্যাশন নিয়ে বোলিং অনুশীলন করতাম, এতো প্যাশন নিয়ে জীবনে এখন পর্যন্ত আর কোন কিছু করি নাই।

সে যাই হোক, খুব আনন্দের ছিল সেই দিনগুলো। যখন আমরা ক্লাশ এইট-নাইনে উঠে গেলাম তখন বাকি মেয়েরা খেলা বন্ধ করে দিল আস্তে আস্তে। যৌবনে পা দেয়ার সাথে সাথে তাদের খেলতে বের হওয়ার উপর পরিবারের বাধা আরোপ হওয়া শুরু করলো। আগে যেমন ট্রাউজার টিশার্ট পরে খেলতাম, সেই চলের পরিবর্তন হলো আমাদের শারীরিক গঠন বদলানোর সাথে সাথে। এই বয়সে এসে ওড়না পরার পারিবারিক- সামাজিক চাপ সবারই অনুভূত হলো। যে অল্প কয়েকজন বিকালে বের হতাম, তারপরেও কিছুদিন ওড়না বেঁধে খেলার চেষ্টা করেছি। এভাবে কি আগের মতো সচ্ছন্দে খেলা যেত? জ্বী না, যেত না। পাশাপাশি যে ছেলে বন্ধুরা আমাদের সাথে খেলতো ওরাও এই সময় আস্তে আস্তে বড়দের সাথে খেলার চান্স পেতে শুরু করে। সব মিলায়ে আমার জীবন থেকে ক্রিকেট খেলার অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

আমি ভাবছিলাম এই নারী যদি আরও কিছু বোরখা পরিহিতা বান্ধবীর সাথে ক্রিকেট খেলতেন, তাহলে এটার গ্রহণযোগ্যতা কেমন হতো? এই নারীকে নিয়ে জয়জয়কার হচ্ছে, কারণ তার ছেলের সাথে তার কিছু সময়ের খেলাধুলার মুহূর্ত তার সন্তানের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নকে সমর্থন ও উৎসাহ দেয়াকে প্রতিনিধিত্ব করে। নারীর এই রূপই তো দেখতে চায় সিংহভাগ জনতা, নারী পর্দা করবে আর একজন ‘আদর্শ’ মায়ের ভূমিকা পালন করবে। এখানে ক্রিকেট শুধুমাত্র একটা ভিসুয়াল চার্ম ছাড়া আর কিছু না (অবশ্য ক্রিকেটের সাথে আমাদের ‘গর্জে ওঠার’ একটা বাড়াবাড়ি আবেগও আছে)।

কোন একটা সংবাদ মাধ্যম ছবিগুলোর ক্যাপশনে লিখেছে, মায়েরা সব পারে! এই ভয়াবহ গরমের মধ্যেও বোরখার মতো নিষ্ঠুর একটা পোশাক পরার যে বাধ্যবাধকতা, তার বিরুদ্ধে কি তিনি বিদ্রোহ করতে পারেন? তিনি নিজে এথলেট হওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তারুণ্যে, সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পারেন? ফলো আপ সংবাদগুলোতে যখন জানতে পারলাম যে তিনি নিজেও আগে বিভিন্ন রকম খেলাধুলার সিরিয়াস চর্চ্চা করতেন, আমার জানতে ইচ্ছা হয় তখনও কি তিনি এরকম বোরখা পরে ২০০ মিটার – ৪০০ মিটার দৌড়, বর্শা নিক্ষেপ ইত্যাদির অনুশীলন করতেন? নাকি বিয়ের পর পরতে বাধ্য হয়েছেন?

এ বিষয়ে অনেকেই হয়তো বলবে যে অনেক নারীই তার বাবা কিংবা স্বামীর কথায় না, বরং তার নিজস্ব ধর্মীয় চর্চার কারণে ‘স্বাধীনভাবে’ বোরখা অথবা হিজাব পরার সিদ্ধান্ত নেন। এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু ধর্ম কি নারীকে স্বাধীনভাবে পোশাক বাছাই করতে দেয়, নাকি নানান রকম ভয় দেখায়ে পর্দা করতে বাধ্য করে? সেই একই ধর্ম পুরুষকে তার পোশাক নির্বাচনে একই পরিমাণ বাধ্যবাধকতা দেয় না। অতএব নারী যদি মনে করেন তিনি নিজের ইচ্ছায় স্বাধীনভাবে পর্দা নির্বাচন করছেন, তিনি অবচেতন মনে অনেক আগে থেকেই নারী পুরুষের ডিস্ক্রিমিনেশনকে মেনে নিয়েই বোরখা নির্বাচন করেন।

সন্তানের আনন্দে মায়ের আনন্দ এ কথায় কোন দ্বিমত নাই, এবং সেই আনন্দের মুহূর্ত খুবই মূল্যবান। কিন্তু পর্দার আড়ালে মায়ের স্বপ্ন, সম্ভাবনা, এবং আকাঙ্ক্ষার যে দমন, তাও চিহ্নিত করা জরুরি।

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.