শান্তির নীড়

ফাহমিদা খানম:

বোধ হবার পর থেকেই দেখি দাদীর রান্নাঘর আর নিজের ঘরের বাইরে কোনো জগতই নাই। পুরনো ধ্যান-ধারণা নিয়েই তার জগত — আজও দাদা ভাইয়া আর বাবা চাচারা খেতে বসলে দাদী সামনে বসে সবাইকে পাতে তুলে দেন, চাচী কয়েকবার বলেও ফেলেছে—
“পাতে দেবার কী আছে? বাটিতে করে টেবিলে দিচ্ছে, যে যার মতো করে নিয়ে নিলেই হয়!”
“কার কোনটা পছন্দ সেইটা আমি জানি, এসব তোমরা বুঝবা না”

মা চুপ করেই থাকে, কারণ দাদীকে এসব বারবার বলেও শোধরানো যায়নি, মা চুপ করে থাকলেও চাচী আবার সহ্য করতে পারে না, তাই বলে চাচী কিন্তু খারাপ না। বাসায় প্রতিবেলা কী রান্না হবে সেইটা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই দাদীর চোখ সজাগ, লুকিয়ে কিছু করার উপায় নাই। চাচী অবশ্য মাঝে-মধ্যে বলেন—

“আম্মা সবাই বড় হইছে, এতো চাপিয়ে দেয়া ঠিক না”
“আমার সংসারে সবকিছু এই নিয়মেই চলবো বৌ” – ‘আমার’ কথাটায় খুব জোর দিতেন দাদী।

আমি অর্থী এ বাড়ির প্রথম হবার সুবাদে দাদীর সাথেই আমার সখ্যতা বেশি, দাদীর দুই নেশা, জর্দা দিয়ে পান খাওয়া আর সন্ধ্যার পর টিভিতে সিরিয়াল দেখা, এটা নিয়েও চাচী বাগড়া দেয় –
“আম্মা এসব দেইখেন না”

লেখক: ফাহমিদা খানম

দাদী কারো কথা শুনে না, আমার ছোট দুই বোন আছে, যমজ। এই বাড়িতে বাবা আর চাচারা মিলে তিনজন –এক চাচু নাকি আবার অসুস্থ হয়ে জন্মেছিলেন, শুনেছি ১২ বছর বিছানায় ছিলেন, দাদী কোথাও বের হতে পারতেন না, ঘরই তার জগত, আর ছোট চাচু পড়ালেখা শেষ আর করেনি। বাবা আর বড় চাচুর ধারণা, দাদীর আদরেই চাচু বিগড়ে গেছে। দুজন যেহেতু ভালো চাকুরি করে তাই বাড়ির নিচে দুইটা দোকান করে দিয়েছে চাচুকে। কিন্তু ছোট চাচু সারাদিন আড্ডা আর বন্ধু নিয়েই পড়ে থাকে। দাদীর শখ চাচুকে বিয়ে করাবেন– যদি বউ এসে চাচুকে ঠিক করতে পারেন!

দাদাভাইয়া হাসে আর দাদীকে বলে—
“মা ঠিক করতে পারলো না, পরের মেয়ে এনে তার উপরে এই দায়িত্ব দেয়া ঠিক না”
“আরে বয়স কম দেখবা, বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যাবে”
“আম্মা, আপনি এক মেয়ের মধ্যে এতো গুণ খুঁজেন কেনো? এমন করলে দেখবেন ওর বিয়ের বয়স পার হয়ে যাবে”
“আমার ছোট ছেলের বউ, আমি কি একটু দেখেশুনে আনবো না?”

ওয়ারীতে পাঁচতলা একটা বাড়ি আছে আমাদের, তবে দোতলা পুরোটা নিয়েই সবাই একসাথেই আছে ,চাচীও একটা স্কুলে চাকুরি করেন। মায়ের সাথে বনিবনাও খারাপ না, যেহেতু সকাল আর দুপুরে সাহায্য করতে পারেন না, তাই সন্ধ্যা আর রাতের দায়িত্ব নিজে থেকেই করেন। চাচী আধুনিক মনের, তাই দাদীকে বোঝাতে যায়, আর দাদীর সাথে লেগেই যায়। দাদীও চাচিকে তেমন পছন্দ করেন না, প্রায় সন্ধ্যায় চা-নাস্তা দিতে গিয়েই চাচী বলেন—
“আম্মা এসব কী দেখেন? এসব দেখলে কুটনামি ছাড়া কিছুই শিখবেন না”

এসব বলে দেখে চাচী চাচার কাছেও বকা খায়—
“থাকুক না উনি উনার মতো, কী দরকার বলার?”
“আমিতো উনার ভালোর জন্যেই বলি, দেখো আমরা যাই বলি না কেনো, উনি সেটাকে পজেটিভ ভাবে না এসব দেখেই”

দাদী চাচীর এসব কথাকে পাত্তাই দেয় না – আজো বাবা, চাচু ঘর থেকে বের হবার আগে দাদীকে না বলে বের হয় না, দাদীর জোর সেটাই। দাদী সবসময় বলে চাকুরি করা মেয়েরা নাকি মুরুব্বি মানে না, মুখে যা আসে তাই বলে ফেলে!

দাদা হজ্ব করতে যাবেন ডিসিশন নেবার পর বাবা আর চাচু বারবার দাদীকে বললেন, মৃত্যুর ভরসা নাই — সবকিছু যেন উইল করে যায় দাদা। এই বাড়িতে দাদাভাইকে এটা বলার সাহস কারোরই নাই। দাদাভাই যাবার পর পরেই সামান্য ব্যাপার নিয়ে দাদী আর চাচীর তুমুল ঝগড়া হলো। চাচী নাকি শুনেছেন, ছোট চাচুর কোনো এক প্রবাসীর বউয়ের সাথে প্রেম আছে – এটা শোনার পর দাদী চাচীকে ইচ্ছামতো বকাবকি করার পর চাচী বাবার বাড়ি চলে গেলো – চাচা আনতে গেলেও ফিরলো না। আগে কখনই এমন হয়নি, তবে খুব দ্রুতই সবকিছু বদলে গেলো। খবর এলো হিট স্ট্রোকে দাদা সেখানেই মারা গেছেন, আর সেই শোক সামলে না উঠতেই ছোট চাচু এক মহিলাকে বাচ্চাসহ এনে ঘোষণা দিলেন উনি বিয়ে করেছেন।

“এক বাড়িতে এভাবে থাকা সম্ভব নাহ, আপনি আমাদের আলাদা করে দিন আম্মা”
দাদী আসলে দুইটা ধাক্কা সামলে উঠতে পারছিলেন না, তার মধ্যেই আলাদা হবার প্রস্তাব!

তবুও ছোট চাচাকে দাদী বললেন–
“তুমি তোমার বউ নিয়ে আলাদা বাসায় থাকো, এই বাসায় তোমার জায়গা হবে না”
“বাড়ির হক আমারও আছে, আমি আলাদা বাসায় কেনো যাবো? ঠিক আছে, উইলে যেভাবে আছে, সেভাবে ভাগ করে দেন সবাইকে”
এই ব্যাপারে বাবা, চাচাও একমত হলেন, অথচ দাদী চাচুকে বের করে দিয়ে সংসারটা আগলে রাখতেই চেয়েছিলেন মাত্র!
এ বাড়িতে ছোট চাচী আর দাদীর একদম বনিবনা হয় না, প্রায় সময়ই ঝগড়া লেগেই থাকে, আশেপাশের মানুষেরাও শুনতে পায়। বাড়িতে হুট করে পুলিশ এলো ছোট চাচুকে ধরতে, আর ছোট চাচীর বাবার বাড়ির লোকেরা এসে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করার পর সেই প্রথম দেখলাম দাদী সারাদিন কিছুই খাননি – এমনকি পান পর্যন্ত। অথচ তার ভাত না খেলেও পান খাননি, এমন দিন আমি দেখিনি।

“একই বাড়িতে আর সম্ভব হচ্ছে না, আমরা আলাদা হচ্ছি মা”
দাদী কিছুই বললেন না চুপ করে দেখলেন শুধু, বাবার কথার উত্তরে বললেন –
“আচ্ছা”

চাচুও চলে গেলেন শ্বশুরবাড়ি – এতোবড় বাড়িটা হাহাকার করছে,
“দাদী, দেখবেন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে আগের মতো”
“নাতিন, ভাংগা জিনিস জোড়া দিলেও আর আগের মতো হয় না”

দাদীর মন খারাপ দেখে চুপ করে তার সাথে বসে থাকি। বাবা এই বাড়িতেই আছেন, কিন্তু আলাদা হয়ে গেছেন দাদী থেকে, এটা আমি মানতেই পারছিলাম না।
“তোর চাচীর কথা যদি শুনতাম, তাইলে আমার বাসা শান্তির নীড়ই থাকতো রে, তোর চাচা যে এমন কাজ করবো আমি ভাবি নাই”
“দাদী সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন”
“কী জানি হয়তো হইবো, কিন্তু আমি থাকুম না, নাতিন, পানি সবসময়ই নিচের দিকে গড়ায়”

দাদীর কথায় চমকে উঠলাম – সবাই আলাদা হবার জন্যে কি প্রস্তুত হয়েই ছিলো? চাচুর ব্যাপারটা কি একটা অজুহাত নয়?
“তোর দাদায় অনেক ভাগ্যবান, এসব তারে দেখতে হইলো না। এই যে আমি সারাজীবন ‘আমার’ ‘আমার’ কইরা গেলাম, কেউই আসলে আমার নারে নাতিন!”

দাদীর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো। কিছু শোকের সান্ত্বনার ভাষা হয় না। বাবা বাজার এনে দাদীর জন্যে পাঠালেও দাদী সবই ফিরিয়ে দিলেন। আমরা খেয়াল করলাম, দাদী নিজেই বের হয়ে জিনিস কিনে বাসায় ফিরতেন। কেউ সাহায্য করতে গেলেও নিতেন না– খুব কষ্ট হতো আমার। সারাজীবন দেখেছি এক রূপে আর এখন! দাদী কিন্তু কোনো অভিযোগ করতেন না, কিন্তু সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিলেন– টিভি দেখতেন না, কারও সাথে কথা বলতেও চাইতেন না, ছোট চাচু জামিন থেকে বের হবার দুইদিন পর শুনি গোছলে যে ঢুকেছেন আর নাকি বের হননি – দরজা ভেংগে দাদীকে হাসপাতালে নেবার পর শুনি, স্ট্রোক বাথরুমেই করেছেন। বাবা, বড় চাচা, চাচী সবাই ছুটে এলো – নাহ, জ্ঞান আর ফিরেনি দাদীর, চলেই গেলেন।

দাদার মৃত্যুর ছয় মাসের মধ্যে দাদীরও মৃত্যু হলো, এতোটাই কি তাড়া ছিলো?

ছোট চাচুর ডিভোর্স হয়ে গেছে, সবাই এখন এক বাড়িতে আলাদা থাকে – সবার একটাই আফসোস, মায়ের কাছে ক্ষমা চাইবার সুযোগ পর্যন্ত পেলেন না! যতবার বাড়ি থেকে বের হই, বাড়ির নেমপ্লেটের দিকে চোখ যায়, আর অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে, দাদীর জন্যে একবুক হাহাকার বুকটা জুড়ে। সবই ঠিক আছে, কিন্তু যে মানুষটার সংসার আর সন্তানের বাইরে কোনো জগত ছিলো না সেই নাই। দাদী খুব শখ করেই বাড়ির নাম রেখেছিলেন –
‘শান্তির নীড়’।

শেয়ার করুন:
  • 101
  •  
  •  
  •  
  •  
    101
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.