তিতলীরা এভাবেই মার খেয়ে যায়

সারারা মুশাররাত তূর্ণা:
(এ গল্পের সকল চরিত্র কাল্পনিক, বাস্তব কোন ঘটনার সঙ্গে মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়)

আয়নায় হাতটা উল্টিয়ে দাগটা দেখে আপন মনেই মুচকি হেসে উঠলো তিতলী। এই দাগের রঙটা ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। প্রথম কয়েক ঘণ্টা লালচে ছিল, তারপর দু’দিন বেগুনি, আজ আস্তে আস্তে কালচে নীল। আগামী কয়েকদিনে বাদামী, এরপর হলুদ; কিছুদিন বাদে মিলিয়ে যাবে পুরো দাগটাই। এই কালশিটে দাগগুলোর রঙ বদলের খেলাটা খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করে তিতলী। এবারের দাগ আর ব্যথার অভিজ্ঞতাটা নতুন, পরিমাণটা সম্পর্কে তাই কোন পূর্বানুমান করা যায়নি।

প্রথম যেদিন এমন দাগ করে ফেলেছিল অনির্বাণ, সেদিন বিস্ময়, ভয়, ঘৃণা সব মিলেমিশে জাপটে ধরেছিল তিতলীকে, সে তাও আরও প্রায় কয়েক বছর আগের কথা। তখন এসবের পর বেশ কান্নাকাটির পর্ব চলতো। আজকাল আর কাঁদে না। কেঁদে লাভ নেই যে। অবশ্য লাভ লোকসানের হিসাব তিতলীর মতো মেয়ে খুব একটা করে বলে মনে হয় না।

তো যা বলছিলাম, অভিজ্ঞতাটা নতুন। এর আগের আঘাতের হাতিয়ারের তালিকায় ক্রিকেট ব্যাট, স্ট্যাম্প, চেয়ার, স্কেলসহ বেশ কিছু নাম আছে, সেগুলোর তুলনায় এবার প্যান্টের বেল্টটা বেশ শিশুই বটে। অনির্বাণের বোন এসে জড়িয়ে ধরেও আঘাতটা থেকে পুরোপুরি বাঁচাতে পারেনি তিতলীকে।

দোষটা তো তিতলীরই। এ ঘটনার মিনিট পাঁচেক আগে রাগ করে হালকা দুটো ধাক্কা আর হাতের কবজিতে আঘাত করে শুধু তিতলীর একটা দরকারি জিনিস ভেঙে ফেলেছিল অনির্বাণ। বোকা মেয়েটা এটার প্রতিবাদ না করে চুপ করে গেলেই তো আর বেল্টটা হাতে উঠতো না, নাকি? যেহেতু তিতলী জানে অনির্বাণের রাগ এমন পশুর মতো, তা ওর রাগ ওঠার সময় মানিয়ে নিয়ে চললেই তো হতো! শুধু শুধু এতো ঝক্কি ঝামেলা করে এমন ফেরেশতাসম ছেলেটার বদনাম করার কীই বা দরকার বল তো?

তাও তিতলীর শ্বশুরবাড়ির লোকগুলো নিতান্ত ভালোমানুষ বলে তিতলী টিকে যাচ্ছে বারবার। নাহয় কবেই হয়তো বাসা থেকে বের করে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হতো তাকে, ‘সংসার করতে পারে না’ এই তকমাটা সাথে ফ্রিতে পেয়েও যেত। যদিও ছেলের আচরণে বিরক্ত হয়ে শ্বশুরমশাই নিজেই বাকি সবাইকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার হুমকি দিয়েই চলেছেন। কিন্তু একবারটি ভেবে দেখছেন না, এই পশুটার কাছে মেয়েটাকে ফেলে গেলে ভবিষ্যৎটা কী দাঁড়াবে! নিজের মেয়েকে এমনভাবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কাছে ফেলে যেতে পারতেন না হয়তো। ওনার সেকেলে ধারণায় উনি তিতলীকে সন্তান নেয়ার পরামর্শ দিয়ে বসলেন এবার। তাতে নাকি ছেলেকে লাইনে আনা যাবে। কিন্তু শ্বশুরমশাইকে কে বোঝাবেন যে যুগটা আর আগের মতো নেই। আর সন্তানের দোহাই দিয়ে স্বামীর অত্যাচারী আচরণ বন্ধ করা যায় না। বরং এক নিষ্পাপ শিশু বড় হতে হতে দেখবে বাবার হাতে প্রতিনিয়ত মার খেয়ে যাচ্ছে তার ‘দোষী’ মা।

ভাবছেন তিতলী কেন সয়ে যাচ্ছে? গাধা নাকি মেয়েটা? হ্যাঁ, গাধাই বটে, তিতলীর মতো এই সমাজের অধিকাংশ মেয়েই গাধা। ‘মায়া’ আর ‘ভালোবাসা’ নামক শব্দগুলো হৃদয়ে এমনভাবেই ধারণ করে যে নিজের বিশ্বাসের কাছেও হেরে যায়। অথচ এই তিতলীকে পুরো সমাজ জানে স্বাধীন, স্বনির্ভর, একরোখা, রগচটা এক ‘আধুনিক’ নারী হিসেবে। যে নারী যেকোনো অন্যায় প্রতিরোধে সদা সোচ্চার। যে কারও অধিকার আদায়ে সবার আগে এগিয়ে আসা এক সাহসী মেয়ে।

তাহলে কেন সহ্য করছে তিতলী দিনের পর দিন? এমনকি নিজের পরিবার, বন্ধু কারও সাথে কোনদিন এসব নিয়ে কথা বলেনি। প্রথমদিকে শ্বশুরবাড়িতেও বলেনি, ঘটনাক্রমে তারা জেনেছে, কারণ দিনশেষে একই ছাদের তলায় একসাথে বাস করছে বলে। তিতলীর ভাষ্যমতে, না বলার অনেক অনেকগুলো কারণ আছে, যদিও সেগুলো শুনে আমার কাছে খুব একটা যৌক্তিক মনে হয়নি। অনির্বাণকে নিজের জীবনের চেয়েও নাকি বেশি ভালবাসে তিতলী, তাই কারও কাছে ছোট করতে চায় না। অনির্বাণের শত শত গুণ আছে ‘পারফেক্ট’ স্বামীর খেতাব পাওয়ার, অকপটে বুক ফুলিয়ে সবার কাছে সেগুলো বলে ফেলে তিতলী। কিন্তু যেই অভ্যেসটা তার শত গুণ এক নিমিষে ধুয়ে দিয়ে তাকে পাষণ্ড প্রমাণ করে, সেটা বলতে মনে হয় নিজেরই ঘৃণা হয় খুব বেশি। প্রতিবার অনির্বাণ একটু পরেই আবার মাটির মানুষ হয়ে যায়, অনির্বাণ মন থেকে ক্ষমা চায়, আর বারবার ক্ষমা করে দেয়ার ভুলটা তিতলী করতেই থাকে। ফলাফল, কিছুদিন পর আবার যেই লাউ সেই কদু!

তিতলী খুব ভালো করে জানে, এই সমাজ দিনশেষে তার দোষটাই খুঁজে বের করবে অনির্বাণের ‘অতিরাগ’ এর কারণ বের করতে গিয়ে। তিতলীর হয়তো সত্যি হাজারটা দোষ আছে সংসারে। কিন্তু এর কোনটার জন্য কি মার খাওয়াটা তার প্রাপ্য?
নিজের বাবা-মা এমনিতেই হাজারও সমস্যায় জর্জরিত, এই বয়সে তাদের চিন্তার ভার আর বাড়াতে চায় না তাই। তার মধ্যে প্রেমের বিয়ে তিতলীর। কী জবাব দেবে মা-বাবাকে? মার খাওয়া অশান্তির সংসার করার জন্য বিয়ে করেছিল এঁকে? তার চেয়ে বাবা-মা জানে তিতলীর অসীম সুখের সংসার; সে-ই ভালো।

অনেকবার বলবে বলবে করেও নাকি শেষমেশ বলতে পারেনি কাউকে। তিতলী বুঝে গেছে এ সমাজে বলে লাভ নেই। ছোট থেকে বাবা-মা শিখিয়ে গেছেন, যা কিছুই হোক কিছুতেই বিয়ে ভাঙা যাবে না। তিতলী তোমার রাগটা বরং কমাও, এই রাগ নিয়ে সংসার করবে কীভাবে? যা কিছু হোক মানিয়ে নেয়া ভালো, আজকালকার ছেলেপিলেগুলো এত্ত একরোখা, এজন্যই তো এতো ডিভোর্স! ওই দেখ অমুকের মেয়ের ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে, মেয়েগুলো বাবা-মা, বংশের মান ইজ্জত ডোবাচ্ছে একদম। পরিবারে একটা ডিভোর্সের ঘটনা মানে তো পুরো কলঙ্কের দাগ লেগে পড়া। আর লোকেই বা কী বলবে?

এই যে এই ‘লোকে কী বলবে’ মার্কা বাক্য গুলো থেকে বের কিন্তু হতে পারেনি এ যুগের তিতলীও। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ভালো বেতনে চাকুরী করা তিতলীর মাথায়ও ঘুরতে থাকে সমাজ কী বলবে? অথচ তিতলীর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ঘুরে এসে মনে হয়েছিল সে বেশ ‘আই ডোন্ট গিভ আ ** টু দ্য সোসাইটি’ গোছের নারী। সেই তিতলী এতোকিছুর পরেও কোনদিন রাগ করে বাড়ি চলে গিয়ে বলতে পারেনি, ‘মা, আমি চলে এসেছি আমার বাড়িতে’। কারণ, তিতলীর মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই তোমার বাড়ি। কিন্তু তারা কি জানে যে তিতলীর স্বামী বারবার তাকে মনে করিয়ে দেয় ওটা তিতলীর বাড়ি নয়, ওটা শুধুই অনির্বাণের বাড়ি!

তাহলে তিতলীর আসল ঠিকানাটা কোথায়? তিতলীর পরিবারের মতই আমাদের দেশের বাবা-মারা কোনদিন তাদের এই আত্মবিশ্বাসটা দেয় না যে, যা কিছু হোক আমরা আছি, এটাই তোমার বাড়ি, কারও অবহেলা সয়ে অন্য বাড়িতে থাকতে হবে না তোমার। আর একারণেই তিতলীরা বড় বেশি একা হয়ে পড়ে। আঁকড়ে ধরার সামান্য কোন খুঁটি ওদের হাতে ধরা দেয় না। শেষবার কথা বলার পর বুঝলাম, তিতলী বেশ গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে, গত কয়েক বছর ধরেই সেটা ধীরে ধীরে করছে অবশ্য।

হাতে কালশিটের দাগটা ছাড়া আরও কিছু দাগ রয়ে গেছে। সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে তিতলী। এ দাগগুলো নিজের করা, নিজের উপর ঘেন্না, রাগ থেকে নিজেকে দেয়া শাস্তি। তেমন বেশি কিছু করার সাহস পেয়ে ওঠে না এখনও। তাই শুধু সে রাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট কতক্ষণ হাতের বাহুতে ধরে রেখেছিল আর সেটার ওপর পরে বেশ কয়েকবার কম্পাস দিয়ে খুঁচিয়েছে। কী অদ্ভুতভাবে দাগগুলো দেখছে তিতলী। আবারও ঐ একইরকম মুচকি হাসি দিল।

এভাবেই হয়তো চলতে থাকবে। হয়তো একদিন সাহস জুগিয়ে নিজের জীবনের কাছে হেরে গিয়ে ‘মায়া’ আর ‘ভালবাসা’র অনুভূতিগুলোকে পাশ কাটিয়ে হারিয়ে যাবে তিতলী! যেখানে যাবে, সেখানে ওর জায়গা হবে তো? নাকি সেখানেও মেয়েদের নিজের ঠিকানা নেই?

 

(সম্পাদকের বক্তব্য: তিতলীদের এভাবে মার খেতে থাকাটা কোনভাবেই কাম্য নয়, হেরে যাওয়াও নয়। তিতলীরা আবারও হেসে উঠবে, সব জঞ্জাল পায়ে দলিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে, তখন পিছন ফিরে দেখলে মনে হবে, কী বোকাই না ছিলাম! কাজেই এরকম শত শত হাজার হাজার তিতলীর দিকে হাতটা বাড়িয়ে রেখেছি আমরা অনেকেই, তিতলীরা হারতে পারে না, হারবে না কখনই। )

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.