লুব্ধক

শীলা মুস্তাফা:

কয়েকদিন থেকেই একটি কথা মনের মধ্যে রিন রিন করে বাজছে। কে যেন বলেছিল “প্রতিটি মানুষ তোমার জীবনে আসে কোন না কোন কারণ নিয়ে”। কথাটির মধ্যে কোথাও একটু সুপারস্টিসাস গন্ধ আছে। তবুও এই জীবনের সিংহভাগ হেলায় হারিয়ে বাকিটুকু ‘সতর্ক’ হতে শিখছি। অকারণে হাহা হিহি করার মধ্যে কোন অপরাধ নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে সেই হাহা হিহি থেকে কিছুটা সময় বের করে বাথটাবের ফেনিল পানিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে বই পড়তে, গান শুনতে কিংবা “সাদগুরু” শুনতে মন্দ লাগে না। তাই কারও সাথে একটি বিকেল কাটানোর ভাবনা এলেও মনে হয়, সময়টা মাঠে মারা যাবে না তো! এই প্রবাসে সেজেগুজে স্বামীর “প্লাস ওয়ান” বা “বাহুবন্দী” হয়ে অনেক “পার্টি” হয়েছে। এখন মনের খোড়াক যেখানে নেই সেখানে আর শাড়ি পরার ঝক্কি তো দূরে থাক, চটচটে লিপিস্টিক লাগানোর ঝক্কি পোশাবে কিনা ভাবতে হয়। আসলে সেসব কিছু নয়। যেখানে যাই, যা করি, তাতে মন কিছু পেলো কিনা সেটাই কথা।

সেদিন এক বিকেলে আমার দুই বন্ধু এলো আমাকে নিয়ে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখবে। এ বিষয়ে আমার কখনো না নেই। চলো যাই! আসল আয়োজন যে করছে সে আমার বন্ধুর বন্ধু, ধরা যাক আমার বন্ধুর নাম মেখলা, আর তার নাম রোচনা। রোচনার সাথে আমার এর আগে পরিচয় এবং দেখা শুধু দুদিনের। খুব খোলা মনের, অনর্গল কথা বলে। কিন্তু সেসব কথা শুনতে ভাল লাগে। কারো মন পেতে কিছু বলছে না, যা মাথায় আসছে তাই বলছে। তাকে সমাজ সংসার কি মনে করলো তার তোয়াক্কা নেই। কথার সাথে কেউ দ্বিমত পোষণ করলেও আত্মপক্ষ সমর্থন করছে, নির্দ্বিধায় উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। সবাইকে বলে দিচ্ছে, এটা ঠিক নয়। ওঠা ঠিক নয়। মানুষ কেন যেন তাতে রাগও হচ্ছে না বরং হাসছে। বিষয়টা অদ্ভুত। রোচনা প্রথগত ধর্মে বিশ্বাসী নয়। একা থাকে, ভাল চাকরী করে। মদ্য পান করে অবলীলায়। যেখানে পান করছে সেখানে ছেলেরা হরদমই মদ্য পান করছে । কিন্তু ছেলেরা খাবে বলে একটি মেয়ে ঘরে ঢুকেই মদের ওখানে যেয়ে তার পছন্দমতো পানীয় নিয়ে সাবলীল ভাবে বসবে, আর সবাই আড় চোখে দেখবে না, তা কি করে হয়। কিন্তু মনে হোল তারা এতে অভস্থ। প্রবাসে এবং বাংলাদেশে প্রচুর পার্টিতে যাওয়া হয়েছে যেখানে মদ খাওয়া হচ্ছে কিন্তু ছবি তোলা বিরাট “নো নো’। জাত যাবে, মানুষ কথা বলবে, “পাবলিক ইমেজ” বলে একটা কোথা আছে। কী দরকার! আমিও তাতেই অভ্যস্ত।

যাই হোক সেই বিকেলের গল্প বলি। মেখলা রোচনা আমাকে উঠিয়ে নিল। বাইরে সুন্দর উষ্ণ বাতাস। আমরা তিনটি মধ্যবয়সী মেয়ে চলছি সূর্যাস্ত দেখতে। কারো সাজের কোন অতিরঞ্জন নেই, যদিও পাঁচতারা হোটেলে সমুদ্র দেখতে দেখতে বিকেলেই রাতের খাবার খাওয়ার কথা আছে। গাড়ি ছুটছে স্পেসিফিক কোস্ট হাইওয়ে ধরে। একদিকে সবুজে সবুজ রহস্যময় পাহাড় আর অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগর। আমি পেছনের সিটে বসে রোচনার প্লান বোঝার চেষ্টা করছি। গাড়ির পেছনে প্রচুর খাবার পানীয়ের ব্যবস্থা করেছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু প্লান কী তা কিছু বোঝা যাচ্ছে না। মেখলাও তেমন বুঝতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে না। যাই হোক পাঁচতারা হোটেলের কাছাকাছি একটি পারকিংয়ে গাড়ি পার্ক করা হলো। আমি বুঝতে পারছি না, হিল পরবো নাকি ফ্লিপফ্লপ। স্কার্ফ নেবো, নাকি শাল।

– আচ্ছা প্লানটা কী? আমরা কি সমুদ্রের পাড়ে যাচ্ছি নাকি হোটেলের লাউঞ্জে? জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। রোচনার উত্তর।
– দুটোই।
– বলো কী! এতোসব খাবার দাবার, কুলার নিয়ে হোটেল লাউঞ্জে বসলে ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যাবো।
– নানা আগে ডিনার হবে হোটেলে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে, তারপর বিচে যেয়ে বসবো, চাঁদ দেখবো।

আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এক্ষুনি সব নিয়ে রওয়ানা দিতে হবে না। সৈকতে তখনও প্রচুর দর্শণার্থীর ভিড়। এই করোনাকালে কোন রেস্টুরেন্টের ভেতরে বসার সুযোগ নেই। বাইরে বারান্দায় বসতে হবে। অপেক্ষার তালিকায় নাম লিখিয়ে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। আমরা পাঁচতলার বারান্দায় বসে প্রথমেই পানীয় অর্ডার করলাম। আমার আর মেখলার প্রিয় মারটিনি, আর রোচনা অর্ডার দিল রেড ওয়াইন। পানীয় খেতে খেতে খাবার অর্ডার দেয়া হলো। বড় বড় প্লেটে ছোট ছোট খাবার এলো। শিল্পকর্মে আমি মুগ্ধ, খাবো না বাঁধিয়ে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখবো এই বিতর্কে না যেয়ে কাঁটাচামচ আর ছুরি দিয়ে স্যামন ফিস আর ঘাস লতাপাতা খেলাম।

ততক্ষণে ক্লান্ত অবসন্ন সূর্য অস্তাচলে। তার বিদায়ের রঙে রক্তিম সমুদ্র। বিল এলো, রোচনা আগেই বলে রেখেছে আজ সে আপ্যায়নের দায়িত্বে। কিন্তু এই তথাকথিত “বাঙ্গালী” প্রথা ভাঙ্গার তাগিদেই রোচনার দাবিকে অগ্রাহ্য করে আমি ও মেখলা দুজনেই কার্ড এগিয়ে দিলাম। তিনজন সমান ভাগে বিল দিয়ে বেরিয়ে এলাম। গাড়িতে যেয়ে সৈকতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে চলে গেলাম পানির কাছাকাছি। ততক্ষণে মানুষের ভিড় কমে গেছে। প্রকৃতির কাছাকাছি এলে মানুষও ক্রমশ প্রকৃতির অংশ হয়ে যায়। তখনো সূর্যের রেশ রয়ে গেছে।

রোচনা বিরাট এক চাদর বিছিয়ে তাতে বিভিন্ন খাবার ছড়িয়ে বসলো, বিভিন্ন ফল, চিপস, ওয়াইন সাথে পারসিয়ান টিরামিসু কেক। আমার অবাক হবার পালা। রোচনা মেখলা শুভ জন্মদিনের গান গেয়ে আমাকে অবাক করে দিল। এখনও জন্মমাস চলছে। রোচনা ফ্লাস্কে করে ঠাণ্ডা ওয়াইন নিয়ে এসেছে। আমাদের অফার করলো। আমার ইচ্ছে থাকলেও খেলাম না। যদি গাড়ি চালাতে হয় এই ভেবে। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপাড়ে সূর্যাস্তের রক্তিম আভা ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে, পাহাড়ের ওপরের দূরবর্তী বাড়িগুলোতে বৈদ্যুতিক সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে উঠছে, আর আকাশে সন্ধ্যাতারা। সামনে অশান্ত সমুদ্র, আকাশে জ্বলে উঠছে অসংখ্য মিটিমিটি তারা, চাঁদের ম্রিয়মাণ আলো এসে পড়ছে সমদ্রের ঢেউয়ের উপর। মানুষের ঘরে ফেরার পালা, আর আমাদের কথার শাসন,নিঃশব্দ বক্র ভ্রুর শাসন, সমাজের অদৃশ্য শাসন এড়িয়ে নিঃসংকোচে বাঁচার পালা। পায়ের কাছে সমুদ্রের কত আনুনয় বিনয়কে অগ্রায্য করে তিনজন আকাশের দিকে মুখ করে চিত হয়ে শুয়ে আছি। মেখলা গেয়ে উঠলো “প্রেমে পড়া বারণ কারণে অকারণ, আঙুলে আঙুল রাখলেও হাত ধরা বারণ …”

কতক্ষণ এভাবে শুয়ে ছিলাম জানি না। রোচনা এরই মধ্যে অন্ধকার সমুদ্রের পানির মধ্যে গা ভিজিয়ে এসে আবার আমাদের পাশে এসে বসলো। ওয়াইনের ফ্লাস্ক মুখে দিচ্ছে। আমি বললাম, এবার কিন্তু তোমাকে থামতে হবে। তুমি ড্রাইভ করবে তো। হ্যাঁ এটাই লাস্ট সিপ বলে ফ্লাস্কটা ব্যাগে
ঢুকিয়ে রাখলো রোচনা।
তারপর আমার দিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– তুমি তো লেখালেখি করো, আমার জীবনের গল্প লিখবে?
– তোমার জীবনের গল্প তো আমি জানি না। আর তাছাড়া একজনের জীবনের গল্প অন্য কেউ লিখলে তাতো আর তার গল্প থাকবে না, সেখানে লেখকের জীবনের কিছুও তো বলা হয়ে যাবে।
– তা কেন হবে? আমি যা বলছি তাই লিখবে।
– তাতো লিখবো, সাথে আমি তোমাকে যা দেখছি তাও তো লিখবো।
– লিখবে।
– আমার দেখা রোচনার সাথে তো তোমার মিল নাও হতে পারে। তুমি তোমাকে একভাবে দেখছো, আমি অন্যভাবে। তখন তো সেই গল্পে তোমাকে আমি অবিচার করবো। তোমার খারাপ লাগবে না?
– আমার খারাপ লাগবে তখন যখন আমি যা নই তাই আমাকে বানিয়ে ফেলবে।
-যেমন?
-এই যেমন ধরো আমি প্রথাগত ধর্মে বিশ্বাস করি না, মদ খাই, আমি লিভ টুগেদার করি। আর তুমি যদি লেখো রোচনা মদ খায় না, নামাজ রোজা করে, রান্না বান্না করে সংসার করছে। তাহলে তুমি আমার উপর অবিচার করবে। আমাকে অসম্মান করবে। আমি যা তাই নিয়ে লিখলেও তো আমার জীবনের গল্প লেখা যায়। যায় না?
– কেন যাবে না?
– এই যেমন ধরো শরচন্দ্রের দেবদাস, সে তো মদ খেতো, চন্দ্রমুখীর কাছে যেতো। তার গল্প পড়ে কি আমরা কাঁদিনি? কিন্তু মেয়েদের বেলায় কেন নয়?
– মেয়েদের বেলায় সবকিছুই উল্টো বন্ধু , মেখলা ফোঁড়ন কাটে। ছেলেদের অমন একটু দোষ থাকতেই পারে, আমাদের সমাজ তা “ক্ষমাসুন্দর” দৃষ্টিতে দেখে, এমনকি মায়ের কাছেও ছেলে আর মেয়ের জন্য ভিন্ন দাঁড়িপাল্লা। বিদেশে আছো বলেই সব বদলে যাবে না।

– তাতে কী, আমি এসব মানি না। আমি যা তা-ই। আমাকে যে ভালবাসবে সে আমার সবটুকু নিয়েই ভালবাসবে, সে প্রেমিক হোক, বন্ধু হোক কিংবা পরিবার। আমি রবীন্দ্রনাথের সেই “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে” পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। এই লুকোচুরি খেলা আমার পোষাবে না। তারপর রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রোচনা জীবনের গল্প বলে। একটি অল্পবয়সী মেয়ের প্রবাসে বেড়ে উঠার গল্প, আমি আর মেখলা রূপকথার গল্প শোনার মতো চুপ করে গল্প শুনি। মনে হয় এই নিশীথ রাতের গহীন অন্ধকারে আকাশের চাঁদ, সমুদ্রের গর্জন আর তার মাঝে রোচনার কণ্ঠ ছাড়া আর কোন জীবনের অস্তিত্বই নেই চড়াচড়ে। গল্প শেষ হয় না, কিন্তু রাত গভীর হয়ে আসে। আকাশ মেঘে মেঘে ঢাকা তবুও এরই মধ্যে কিছু তারা দেখা যাচ্ছে। একটি তারা তারই মধ্যে উজ্জ্বল, একি লুব্ধক তারা? পৃথিবীর আকাশের উজ্জ্বলতম তারা? আমি লুব্ধক তারার মধ্যে রোচনার মুখটি অন্ধকারে দেখতে পেলাম। মেখলার আনমনে গেয়ে উঠে “আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,. তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,. বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান…”

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.