আইনের সংস্কার যখন সময়ের দাবি

গোপা মল্লিক:

নারীর চলার পথ কখনই মসৃণ ছিল না। যখনই নারীরা নিজেদের অধিকার সমন্ধে সচেতন হয়ে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে তখনই তাদের নারীবাদী ট্যাগ লাগিয়ে তাকে সমাজে একজন পুরুষবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমাজের ধর্মধ্বজাধারী মানুষরা চেয়েছে মেয়েরা চিরকাল নির্যাতন সহ্য করুক তবু মুখে রা টি না কাটুক। তবেই সে লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে। এজন্য তারা যত নিয়ম তৈরি করেছে তার অধিকাংশ মেয়েদের জন্য প্রযোজ্য।

নারীদের আদর্শ রূপে সাবিত্রী /বেহুলার মতো পতিব্রতা স্ত্রী চরিত্রের অবতারণা করা হয়েছে, অথচ ধর্ম বলুন বা সাহিত্য, কোথাও এমন কোনো সৎ চরিত্রবান পুরুষ চরিত্র নেই যে নিজ চারিত্রিক পবিত্রতা/কৌমার্য্যের বরে মৃত স্ত্রীর জীবন ফেরাতে পারে। তারা সীতার মতো সর্বংসহা স্ত্রীকে সংসারে আদর্শ বলে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, কিন্তু এটা বলেননি যে কেন রাজা রামচন্দ্র তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে বিপদসংকুল বনবাসে পাঠিয়েছিলেন? রাজ্যভার ও প্রজাদের সামলানোর জন্য তার আরও তিনটি সুযোগ্য ভাই ছিল। তিনি কি পারতেন না নিজের সহধর্মিনীর পাশে থাকতে? সীতার সর্বংসহা রূপকে মহান করা হয়েছে তার নির্যাতিত করুণ বনবাসী জীবনকে ঢেকে দেবার জন্য। সতীদাহ প্রথা, গৌরীদান প্রথা, মুলাকারাম প্রথা(ব্রেস্ট ট্যাক্স) এগুলো আপনাদেরই মতো কোনো না কোনো পুরুষের সৃষ্টি। অবশ্য সেকথা এখন মনে করালে অনেকেই লজ্জা পাবেন। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বন্ধ করালেন, গৌরীদান প্রথা বন্ধ হলো সেসময়কার শিক্ষিত সচেতন গুটিকয়েক অভিভাবকের সিদ্ধান্তের ফসল হিসেবে, মুলাকারাম (ব্রেস্টট্যাক্স) (দক্ষিণ ভারতের একসময়কার কুপ্রথা) বন্ধ হলো নাঙ্গেলির আত্মদানে, বিধবাবিবাহ আইন প্রবর্তিত হলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের হাত ধরে। কই তখন তো কেউ বললেন না তারা নারীবাদী!

নারীদের মঙ্গল চিন্তা সে যুগেও হয়েছে, আর এ যুগেও হয়। সে যুগেও সমালোচনা করার লোক ছিল, আর একালেও আছে। আর বিরোধিতা? সে তো চিরাচরিত নিয়ম।
আপনারা বলবেন সতীদাহ নিয়ে ধর্মগ্রন্থে কিছু বলা নেই। স্বেচ্ছায় সহমরণে যাবার উল্লেখ আছে। তবে এটা কি? “আমরা মৃতের বধু হওয়ার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখেছি।” তথ্যসূত্রঃ (অর্থববেদ ১৮/৩/১,৩)
” যে সতী নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্রবেশ করে সে স্বর্গে পূজা পায়” তথ্যসূত্রঃ (দক্ষসংহিতা ৪ঃ১৮-১৯)

এটা একপ্রকার তাকে সহমরণে উৎসাহিত করা। যদিও কেউ এখন অতটা নির্বোধ নয়। আর আইনও এটা হতে দেবে না। আপনারা বলবেন বেদ হিন্দু নারীদের স্বামীর মৃত্যুর পর পুনরায় বিবাহের অনুমতি দিয়েছে। আমি সেটা জানি। তবে স্বামীর জীবিতাবস্থায়ও নারী পুনরায় বিবাহ করতে পারবে সেইটা হয়তো আপনার জানা নাই। আমি রেফারেন্স দিচ্ছি। সেই বিশেষ ক্ষেত্রগুলো হলো-

১. যদি স্বামী গোপনে সন্ন্যাস নেয়
২. যদি স্বামী নিখোঁজ হয়
৩.যদি সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়
৪.স্বামী যদি অধার্মিক ও অত্যাচারী হয়।
তথ্যসূত্র – পরাশর সংহিতা (৪-৩০)
আই কোট পয়েন্ট নং ৪।

তাহলে কেন এখনকার হিন্দু মেয়েরা প্রয়োজন মনে হলে পূর্ণ বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারবে না? কেন শুধুমাত্র সেপারেশন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে? কেন এখনো হিন্দু মেয়েদের দ্বিতীয় বিবাহ করার আইনত অনুমতি নেই? বেদে আছে- “একজন নারীর যেন কোনো সতীন না থাকে। ” তথ্যসূত্রঃ (অর্থববেদ ৩/১৮/২)
“স্বামীর উচিত শুধু একমাত্র স্ত্রীর প্রতি অনুরক্ত থাকা। দ্বিতীয় কোনো নারীর প্রতি অনুরাগ থাকা উচিত নয়।” তথ্যসূত্রঃ (অর্থববেদ ৭/৩৮/৪)
তবে কেন স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে একজন হিন্দু নারী আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন না? কেন একজন হিন্দু পুরুষ চাইলেই বিনা বাধায় একাধিক বিবাহ করতে পারে আর আইন তাকে অনুমতি দেয়?
বেদে এটাও বলেছে পিতার সম্পত্তিতে পুত্র এবং কন্যা সমান অংশীদার। আমি রেফারেন্স দিচ্ছি।
#পিতার সম্পত্তিতে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে।।
(ঋগ্বেদ, ৩/৩১/১)

এবার আপনারা যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে পারেন কনকাঞ্জলির প্রসঙ্গ। কিংবা গোত্র পরিবর্তনের কথা। তবে ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হয়েও সেখানে এ আইন পাশ হলো কীভাবে? আপনাদের জ্ঞাতার্থে বলছি- হিন্দু বিয়ের নিয়ম হিসেবে বেদে কয়েকটি ধাপ বর্ণিত আছে। সেগুলি হলো-

১.পাটিপত্র ২.পানখিল ৩.দধিমঙ্গল ৪.গায়ে হলুদ ৫.শঙ্খ কঙ্কণ ৬.বর বরণ ৭.সাতপাক ৮ শুভদৃষ্টি ৯.মালাবদল ১০.সম্প্রদান ১১.অঞ্জলি ১২.সিঁদুর দান।
সিঁদুর দানের মধ্য দিয়ে বিবাহ সম্পূর্ণ হয়। এর পরের আচার অনুষ্ঠানগুলি নিয়ম নয়, প্রথা। নিয়ম হলো তাই যা অবশ্য কর্তব্য। আর প্রথা ঐচ্ছিক, অঞ্চল ভেদে ভিন্ন হতে পারে, এবং পরিবর্তনযোগ্য। যেমন পূর্বে আমি সহমরণ প্রথা ও গৌরীদান প্রথার কথা উল্লেখ করেছি। নারীরা এতোদিন পৌরহিত্য করতে পারতো না। কিন্তু এখন হচ্ছে। ভারত এবং বাংলাদেশেও বেশ কিছু মেয়েরা সরস্বতী পূজায় পৌরহিত্য করেছে, বিয়েতে পৌরহিত্য করছে। তারা এতোদিনের চলে আসা প্রথার বিরুদ্ধে যেয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। আর এটা শুনেও একদল লোক ছি ছি রি রি করে তেড়ে আসবেন। অথচ তাদের যদি সিম্পল গায়ত্রী মন্ত্রটাও বলতে বলা হয়, তখন অনেকেই বলবেন “হেইডা আবার কী?”

মেয়ে সম্প্রদান করার বস্তু নয়। মেয়েরাও মানুষ। আর তিন মুঠি চাল পিছন ফিরে ছুড়ে কনকাঞ্জলি দিলেই বাবা মায়ের এতো বছরের ঋণ একদিনে, একমুহূর্তে শোধ হয়ে যায় না। এটাই সত্য।

যদি স্ত্রীধনে (মাতার অর্জিত সম্পদ সম্পত্তিতে) পুত্র কন্যার সমান অংশীদারত্ব থাকে, তবে পিতার সম্পত্তিতে কেন নয়? কন্যা সন্তান জন্ম দেবার দায় কি শুধু একজন মায়ের?
মেয়েদের সাথে এমন বঞ্চনা করা হয় বলেই কন্যা ভ্রুণ হত্যা করা হয়, পর পর কয়েকটি কন্য সন্তান থাকার পরও পুত্রের আশায় বাড়ির বউকে আরও একবার সন্তান নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। কারণ নিজের কষ্টার্জিত সম্পদ ভোগ করার কেউ থাকবে না এটা ভেবে।
আর ভাই না থাকলে শুধুমাত্র যে বোনের পুত্র সন্তান আছে সেই-ই সব অধিকার পাবে, এই নিয়মও অমানবিক। তাই অচিরেই এই আইনগুলো সংস্কারের প্রয়োজন।

আমি এর আগেও বলেছি ধর্মান্তরিতদের জন্য বিশেষ বিধান রেখে পৈতৃক সম্পত্তির আইনের সংস্কার হোক। যে বোনেদের সম্পত্তির প্রয়োজন নাই, তারা পরবর্তীতে ভাইদের লিখে দেবেন। কিন্তু অসহায় মেয়েদের কথা ভেবে দয়াকরে এর বিপক্ষে অবস্থান নেবেন না।

হিন্দু পুরুষরা স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবেন না, আর করলে তা শাস্তিযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং প্রথম স্ত্রী আদালতের দ্বারস্থ হয়ে মামলা করতে পারবেন। এছাড়া হিন্দু নারীরা বিবাহবিচ্ছেদের পর পুনরায় বিবাহ করতে পারবেন এ মর্মে হিন্দু বিবাহ আইনেরও সংস্কার প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

পুনশ্চঃ এক দেশ দুই নীতি হতে পারে না। আমরা হিন্দু মেয়েরা বেশি কিছু চাই না। একজন মুসলিম নারী এদেশে বিবাহ আইন, বিবাহবিচ্ছেদ আইন ও পৈতৃক সম্পত্তিতে যে অধিকারটুকু ভোগ করে, আমরা কেবল সেটুকুই চাই। একচুল বেশিও না কমও না।
এদেশের একজন নাগরিক হিসেবে, ভোটার হিসেবে আমি এর দাবিদার। আর রাষ্ট্রকে তা দিতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 245
  •  
  •  
  •  
  •  
    245
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.