একটি শুভংকরের ফাঁকি

সাজু বিশ্বাস:

খুলনার বটিয়াঘাটার অভিমণ্যু মন্ডলের বিধবা স্ত্রী গৌরিদাসীর স্বামীর চাষের জমি নিজের নামে রেকর্ড করানো নিয়ে তার দেবর যে রিট করেছিলেন গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট সেই রিট খারিজ করে গৌরিদাসীর পক্ষে রায় দিয়েছেন।

এই রায়কে যুগান্তকারী হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।
নতুন কী আছে এই রায়ে? ১৯৩৭ সালে দ্য হিন্দু উইমেন্স প্রোপার্টি এ্যাক্ট বলে একটা আইন পাস হয়েছিল। তাতে স্বামীর কৃষি, অ-কৃষি সমস্ত জমির উপর বিধবার উত্তরাধিকার সূত্রে অধিকার ছিল। কিন্তু ১৯৪১ সালে এক রিটের উপর ভারতের হাইকোর্ট নির্দেশ দেন যে, বসতভিটের উপর বিধবার উত্তরাধিকার বজায় থাকবে, কিন্তু জমির উপর অধিকার থাকবে কি থাকবে না তা নির্ধারণ করবে ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় আইন।

বাংলাদেশ যেহেতু একটি আলাদা দেশ তাই ১৯৪১ সালের রিটটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। এবং সেই মর্মে গৌরিদাসীসহ বাংলাদেশের সকল হিন্দু বিধবারা আগে থেকেই স্বামীর বসতভিটে এবং আবাদি জমির উপর অধিকার ভোগদখল করে আসছেন। এই আইন নতুন করে কেবল তা পুনঃব্যক্ত করেছে।

এইবার হিন্দু আইনে মেয়েদের সম্পত্তির উপর অধিকার কতটুকু আছে তাই দেখি।
হিন্দু আইন মোতাবেক হিন্দু মেয়েদের সম্পদ দুই প্রকার। ১. উত্তরাধিকার এবং ২. স্ত্রীধন।

উত্তরাধিকার হলো স্বামীর সম্পত্তির উপর স্ত্রীর কতটুকু অধিকার থাকবে না থাকবে তার মাপকাঠি। স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় স্বামীর সম্পদের উপর কোনোরকম অধিকার স্ত্রীর নেই। যেগুলো আছে সেগুলো কেবল তার স্ত্রীধন। এই স্ত্রী ধনগুলো কী কী জিনিস? বিবাহ এবং বিবাহ সংক্রান্ত ব্যাপারে একটি মেয়ে বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে যেসব উপহার উপঢৌকন পেয়ে থাকেন সেইগুলো, স্বামী খুশি হয়ে স্ত্রীকে যা উপহার দেন সেইগুলো, বাবা-মা এবং ভাই মেয়েটিকে যেসব উপহার দেন সেইগুলো… বিশেষত গহনা এবং অর্থকড়ি এইসবের মধ্যে পড়ে।

থাকলো উত্তরাধিকার বাকি। স্বামীর সম্পত্তিতে বিধবা নারী কেবল উত্তরাধিকার পায়। উত্তরাধিকার হলো, জীবিত থাকাকালীন তিনি সন্তানদের পাশাপাশি সমানভাবে স্বামীর সম্পত্তির ভাগ পাবেন এবং তা ভোগ দখল করতে পারবেন, কিন্তু বিক্রয় করতে বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। একে সহজ ভাষায় জীবনস্বত্ব বলে। এমনকি তীর্থে যাবার বা চিকিৎসার প্রয়োজনেও স্বামীর সম্পত্তি বিক্রি করার অধিকার ঐ বিধবার নেই। বিধবার মৃত্যুর পর ঐ সম্পত্তি ঐ মৃতব্যক্তির পরবর্তী পুরুষ উত্তরাধিকারীদের হাতেই ফিরে যাবে।

গৌরীদাসীর মামলাটিতেও নতুন কিছুই নেই। কেবলমাত্র বাস্তুভিটার সাথে সাথে আবাদি জমির উপরেও বিধবার উত্তরাধিকার বা জীবন সত্ত্ব আইন পুনঃব্যক্ত ও নির্দ্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

তাহলে কী দাঁড়ালো? বিধবাকে জমির মালিক করা হলে তিনি জমি বিক্রি করে দেবেন, হিন্দু মহোদয়গণ জমির মালিকানা হারাবেন বলে যারা হাহাকার করছেন এই কয়দিন — তারা এইবার পরাণ জুড়ান!

বাবার সম্পদের উপর হিন্দু মেয়েদের কী অবস্থা?
সাধারণভাবে বলতে গেলে কিছুই নেই। হিন্দু ধর্মে বিয়ের অর্থ হলো কন্যা সম্প্রদান। পুরো কন্যা সম্প্রদানের অনুষ্ঠানটাকেই বিয়ে বলা হয় আর কী!
তো কন্যা সম্প্রদানের সময় মেয়েটিকে গোত্র ত্যাগ করিয়ে স্বামীর গোত্রভুক্ত করে দেওয়া হয়। এই নিয়মের নাম কনকাঞ্জলি। মূলতঃ সমাজ এবং আত্মীয়স্বজনের সামনে কনকাঞ্জলি নেওয়ার পর মেয়েটিকে শ্বশুর বাড়ির অংশ হিসেবে ধরা হয়। এই সাথে সাথে সে পিতার সমস্ত সম্পত্তির উপর থেকে অধিকার হারায়।

হ্যাঁ, একমাত্র অবিবাহিত মেয়ের ক্ষেত্রে এই নিয়ম চলে না। মেয়ে অবিবাহিত রেখে বাবার মৃত্যু হলে, সেই মেয়ে অন্যান্য ভাইসহ মায়ের সাথে সমান হারে বাবার সম্পদের মালিকানা পায়। কিন্তু মেয়ের অবিবাহিত থাকা কোনও নিয়ম নয়, কোনও স্বাভাবিক অবস্থা নয়, এটি নিয়মের একটি ব্যতিক্রম মাত্র। আবার সেই অবিবাহিত মেয়ে কোনদিন বাবার সম্পত্তি বিক্রি করার অধিকার পায় না। কিন্তু ভাইদের থাকে সেই অধিকার। একই বাবা-মায়ের সন্তান হয়েও কী ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হয় মেয়েরা!

বেদে এবং মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, যারা যারা মৃত ব্যক্তির পিণ্ডদান করবে তারা সবাই মৃতের সমস্ত সম্পদের অধিকারী হবেন। সাধারণ নিয়মে ছেলেই পিতার পিণ্ডদান করে। তার মানে ছেলেই পিতার সম্পত্তির প্রথম উত্তরাধিকারী। ছেলে না থাকলে ছেলের ছেলে বা ছেলের নাতি সেই অধিকার পায়। তাও না থাকলে মেয়ের ছেলে পিণ্ডদান করবে, এইখানে খেয়াল করার মতোন কথা হলো, মেয়ের যদি ছেলে থাকে তাহলে মেয়ের আর উত্তরাধিকারের প্রশ্ন উঠছে না। একেবারে সরাসরি মেয়ের ছেলেই ঐ মৃতব্যক্তির পরবর্তী উত্তরসুরী। তাও যদি না থাকে, এরপর ভাইয়ের ছেলেরা মৃতব্যক্তির পিণ্ডদান করবে এবং তারাই তার সম্পদের মালিকানা পাবে।

মেয়েদের ক্ষেত্রে, কেবলমাত্র বিধবা স্ত্রী, কন্যা, পিতামহী এবং প্রপিতামহীকে মৃত ব্যক্তির পিণ্ডদানের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। তাও কোনো পুরুষ প্রতিনিধি না পাওয়া গেলে হয়তো তখন সেই নিয়ম পালন করা হয়।

তাহলে দেখা গেল পুরো হিন্দু নিয়মেই এখনও পর্যন্ত জমির উপর মেয়েদের একক মালিকানা নেই। উত্তরাধিকার হলো বিধবা নারীর কেবল ভোগদখল করার অধিকার। হস্তান্তর বা বিক্রয়যোগ্য না।
আর বাপের সম্পদের উপর বিবাহিত হিন্দু মেয়ের কানাকড়িও অধিকার নেই সাধারণ নিয়মে।

এরপরে যদি কেউ কোনো বিপ্লব খুঁজে পান, বা বিপ্লব হইছে বলে বিধবা জমি পেয়ে বিক্রি করে দিল, — আমাদের হিন্দুদের জমির মালিকানা হাতছাড়া হয়ে গেল….. ইত্যাদি ইত্যাদি বলে হাহাকার করা শুরু করেন, — করতে পারেন।

তবে এই জিনিস বরাবর চলবে না। আশাকরি একদিন এইসব পুরনো নিয়মের পরিবর্তন হবে। এবং পুরুষের মতো হিন্দু নারীরাও সম্পদের উপর একচ্ছত্র অধিকার পাবে। তখন সেই নিয়মই হয়তো নর্মাল মনে হবে সবার কাছে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.