চতুর্থ ওয়েভের নারীবাদে আমাদের অবস্থান

শাহরিয়া দিনা:

অজপাড়াগাঁয়ের প্রাইমারি স্কুল শেষ করে দেড়-দুই মাইল দূরে হাইস্কুলে ভর্তি হলাম। স্কুল থেকে আমাদের ব্যাচে মেয়ে হিসেবে আমিই একমাত্র হাইস্কুলে গেলাম। মাটির রাস্তা, তাই কখনো খটখটে রোদ, কখনো শিশির ভেজা ঘাস কিংবা হাঁটু পর্যন্ত কাদা পেরিয়ে স্কুলে যাই। ততদিনে বইয়ের পাতায় পড়ে বেগম রোকেয়াকে চিনেছি। মেয়েদের জন্যও পড়ালেখা সমান দরকার বুঝেছি। ঘরে বই-পত্র থাকায় হাইস্কুলেই পরিচয় হলো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্রের পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদ কিংবা ইমদাদুল হক মিলনের লেখার সাথে।

সম্ভবত অনার্সে এসে তসলিমা নাসরিনের লেখা পড়তে শুরু করি। তার অনেককিছু অপছন্দ করলেও তার লেখা যে মেয়েদের ভিন্নভাবে পৃথিবীকে দেখতে শিখিয়েছিল তা অস্বীকার করা যাবে না। মেয়েদেরও কিছু চাহিদা রয়েছে, আছে একান্ত মত প্রকাশের অধিকার, নিজের শরীর-মন সম্পর্কে নিজের জানা এবং গুরুত্ব দেয়াটাও প্রয়োজন মনে হয়েছিল তার লেখা পড়ে। ততদিনে নারীবাদ, নাস্তিক্যবাদ, মৌলবাদ শব্দগুলোও পরিচিতি পেল শহর-গ্রাম সবখানে।

এই শতকের এই সময়ে এসে নারীবাদের যখন চতুর্থ ওয়েভ চলছে, তখন আমাদের দেশেও নারীবাদের চর্চা শুরু হলো জোরেশোরে। নারীবাদের প্রথম ওয়েভটা ১৮৩০-১৯০০ সাল পর্যন্ত। তখনকার প্রধানতম চাওয়া ছিলো সমতার চুক্তি এবং সম্পত্তির অধিকার। সাথে রাজনীতিতে অংশগ্রহন, ভোটের অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি সামনে আসে। নারীরা পুরুষের সমান অবদান রাখতে সক্ষম এই ধারণার সূত্রপাত হয়।

দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৬০-১৯৮০ নাগাদ। তখনকার সময়ে যৌনতা প্রাধান্য পায়, সাথে পরিবার ব্যবস্থা, সন্তান জন্মদানে সময় নির্ধারণে নারীর ইচ্ছার প্রাধান্য ইত্যাদি।

তৃতীয় ওয়েভ, ১৯৯০ থেকে ২০০০ বলা যায় এই সময়টাই নারীদের সামগ্রিক অবস্থা উন্নয়নে বেশী কাজ হয়। নারীবাদীরা লৈঙ্গিক সমতার ব্যাপারে সোচ্চার থেকে শিক্ষা,সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং কর্মক্ষেত্রে নিজেদের প্রমাণ করে। নারীদের প্রতি পারিবারিক অত্যাচার এবং সামাজিক সহিংসতা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে ওঠে।

চতুর্থ ওয়েভে ২০১০ থেকে শুরু হয়ে চলমান আছে। এই সময়টাতে অসমতা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রাধান্য পায়। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, যৌন হয়রানি, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় যোগ হয়। যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে #মিটু আন্দোলনের মতো ব্যাপারগুলো জনমত গঠনে সহায়ক হয়।

আমাদের দেশে ফেসবুক জনপ্রিয় হওয়ার আগেই ব্লগে লেখালেখি শুরু হয়, কিন্তু তা ছিল অনেকের ধারণার বাইরে। পরবর্তিতে যখন ফেসবুক ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে শুরু করে তখন অনেক তরুণ লেখকের জন্ম হলো এই অঙ্গনে। মেয়েদের লেখার জন্য প্রথম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম উইমেন চ্যাপ্টারের জন্ম থেকেই বিভিন্ন আলোচনার-সমালোচনায় উঠে আসে তার নাম। মেয়েদের একান্ত ভাবনাগুলো উঠে আসে বিভিন্ন কলামে। নিজের ভাবনা ভাগাভাগি করে নেবার এই প্ল্যাটফর্মে অনেকেই লেখে। কেউ থেকে যায় নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে, কেউবা পার্মানেন্টলি চলে যায়। কিন্তু উইমেন চ্যাপ্টার তার জায়গাতেই থেকে যায়। বর্তমানে যেকোনো পরিস্থিতিতে উইমেন চ্যাপ্টারের নারীবাদীরা কী বলে, কিংবা তারা চুপ কেন, এই ধরনের রব যখন ওঠে, তখন এর গ্রহণযোগ্যতাই প্রমাণ করে। একটা বা কয়েকটি সুনির্দ্দিষ্ট গ্রুপ তো ভুয়া আইডি খুলেই কেবলমাত্র এখানে বাজে মন্তব্য করবে বলে, লেখকদের হেনস্থা করবে বলে।

তো বাজে মন্তব্য বাজে শব্দ প্রয়োগ এখনকার সময়ে এসে মহামারির মতো অবস্থা। আগেকার জ্ঞানীরা নিজের পান্ডিত্য জাহির করে বেড়াতেন না, শুধু নিজের কাজটুকু করে যেতেন। মানুষও গুণীর কদর করতো। এখনকার দিনে আমি জানি, আমি বুঝি বলাটাই যেন ট্রেন্ড! প্রথমদিকে অস্বস্তি লাগলেও এখন আর অবাক হই না। যুগের সাথে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়। পরিবর্তনে মানিয়ে নেওয়াই শ্রেয়।

এখন ভেপ বা গাঁজার ধোঁয়া মুখে নিয়ে ছবি দিচ্ছে ছেলে-মেয়েরা, সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে কিংবা আধাখোলা শাড়িতে নিজেকে আকর্ষণীয় করে মনে করছেন যার শরীর তার সিদ্ধান্ত, সুতরাং এতে আপত্তির কিছু নেই। তবে বিপত্তি বাঁধে তখনই, যখন কেউ নারী স্বাধীনতার মানে এইসবই বুঝে। অশ্লীলতা কিংবা উগ্রতার সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক, কোন মতবাদের নয়। ব্যক্তিগত জীবনে আপনি যা তাতে অন্যের সমস্যা নাহলে ঠিক আছে। কিন্তু জীবনাচরণ যদি উচ্ছৃঙ্খলাতায় পরিপূর্ণ এবং স্বাস্থ্যকর না হয়, তবে কখনোই সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রমোট করতে পারেন না।

আপনি সিগারেট টানেন, মদ্যপান করেন, বয়ফ্রেন্ড বদল করেন, এটা একেবারেই আপনাদের ব্যক্তিগত বিষয়, কিন্তু এইগুলা কি শো-অফ করার মতো? ইচ্ছা করলেই, আর রুচিতে মিললে যেকেউ এসব করতে পারে। এইসব ব্যতিক্রমী কাণ্ডকীর্তি করেন, আবেদনময়ী ছবি দেন, কয়েকদিনে হাজার হাজার ফলোয়ার জোগাড় হয়ে যাবে। বেশিরভাগ বাঙ্গালী পুরুষ মুখে নাউজুবিল্লাহ বলে আপনারে গালি দিবে, আবার লুকিয়ে মোবাইল নিয়ে আপনার প্রফাইলই ভিজিট করবে। এসবে সস্তা জনপ্রিয়তা পেলেও উদাহরণ সৃষ্টি করার মতো রোল মডেল হওয়া যায় না।

হুজুগে পাওয়া জনপ্রিয়তা অনেক সময়ই অধঃপতন ডেকে আনে। সমাজ বা ইতিহাস তাকেই মনে রাখে যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। সুতরাং নারীবাদের চর্চা করতে হলে আপনার মেধা, শিক্ষা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা থাকতে হবে। সত্যিকারের নারীদের সমস্যা চিহ্নিত করে তা নিরসনে ভূমিকা রাখতে হবে। পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ নয়, দেশভিত্তিক এক্টিভিজম গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে দেখে শহুরে মেয়েটি যেমন তার সাথে ঘটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শক্তি পায়, ঠিক তেমন গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে স্কুলে যাওয়া মেয়েটিও যেন আপনার মতো স্বাবলম্বী মানুষ হবার স্বপ্ন দেখে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.