হিন্দু বিধবা নারীর সম্পত্তিতে অধিকার সংক্রান্ত খবরে ‘ভুল বোঝাবুঝি’

সুপ্রীতি ধর:

বেশিরভাগ সংবাদ মাধ্যমেই খবরটি প্রকাশ করা হয় এভাবে, ‘বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীরা স্বামীর কৃষি জমির ভাগ পাবেন বলে হাইকোর্ট রায় দিয়েছে। আইনজীবীরা বলেছেন, ৮৩ বছরের পুরোনো হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইনে স্বামীর বসতভিটাতেই শুধু অধিকার দেয়া হয়েছিল। এখন হাইকোর্টের রায়ের প্রেক্ষাপটে হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর সব সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে’ (বিবিসি)।

খবরটি প্রকাশের সাথে সাথে নানারকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিবিসি এমনকি এও বলেছে যে, ‘হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারি নারীরা বলেছেন, এখন শত শত বছরের বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে বেরুনো সম্ভব হতে পারে বলে তারা মনে করেন’।

আসলেই কি তাই? বাংলাদেশের হিন্দু পরিবারে জন্ম নেয়া একটি মেয়ে জন্ম থেকে শুরু করে যেসব বৈষম্যের মধ্য দিয়ে যায়, বৈধব্যের পর সেইসব বৈষম্য আজ থেকে মুছে যাবে? সাধুবাদ জানাতে গিয়েও কেন জানি হোঁচট খেলাম।

গতকাল থেকে এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম মতামত পড়ছিলাম। নিজের মনেও খটকা লাগছিল এই ভেবে যে নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার, অথচ এতো সহজে একটা রায় দিয়ে দিল হাইকোর্ট! এর আগে-পিছনে কোনো খবরই জানা হলো না? দেশের হিন্দু সমাজের অভিভাবক বলে খ্যাত নেতাদের স্বার্থ ডিঙিয়ে এমন একটি রায় দেয়া তো চাট্টিখানি কথা না। আবার এও মনে হলো, কেবলমাত্র বিধবা নারীরাই কেন স্বামীর সম্পত্তির অধিকার পাবে? পেলেও সেটা কতটুকু অধিকার? মানে অধিকারের সীমারেখাটুকু কতোটা? স্বামী বেঁচে থাকতে কেন পাবে না? আবার দীর্ঘদিন ধরে আমরা যে দাবি জানিয়ে আসছি পৈতৃক সম্পত্তিতে হিন্দু মেয়েদের অধিকারের বিষয়ে, তারই বা কী হলো?

এতোসব ভাবনা নিজেদের বন্ধুমহলে বিনিময় করেও সুরাহা করতে না পেরে অবশেষে দ্বারস্থ হয়েছিলাম সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের। তিনি বললেন, নতুন কিছুই হয়নি। নতুন আইনও হয়নি। নতুন বার্তাও নেই এতে। এটা কেবল একটা মামলার রায়, আর কিছু না। কিন্তু সাংবাদিকরা না বুঝে এরকমভাবে উপস্থাপন করেছে যেন ঐতিহাসিক কোনো রায় হয়েছে। যা হয়েছে তা হলো, ১৯৩৭ সালের আইন অনুযায়ী হিন্দু বিধবারা “জীবন স্বত্বে সীমিত যে অধিকার” টুকু পাবার অধিকারী ছিল, হাইকোর্টের এই রায়ে সেটাই কেবল পুনঃব্যক্ত করা হয়েছে। ১৯৩৭ সালের আইনে কৃষি-অকৃষি বলে কিছু ছিলো না, এখনও নেই।

তিনি বলেন, খুলনায় গৌরীদাসী নামের একজন বিধবা নারী স্বামীর কৃষিজমি অধিকার দাবি করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন তার দেবর জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল। বিধবারা স্বামীর কৃষিজমির ভাগ পাবেন না-এই দাবি নিয়ে মি: মণ্ডল ১৯৯৬ সালে খুলনার আদালতে মামলা করেছিলেন। প্রথমে মুন্সেফ কোর্টে যে রায় হয়েছিল সেটি ছিল ওই দেবরের পক্ষে। নিম্ন আদালতের এই রায়টি ১৯৩৭ সালের আইন অনুযায়ী সঠিক ছিলো না বিধায় জেলা জজ ও পরবর্তীতে হাইকোর্ট রায়ে বলে বিধবারা স্বামীর কৃষি অকৃষি সকল সম্পত্তিরই তার ভাগ পাবে। ব্যস, এটুকুই।

তবে এখানেও অনেক ফাঁক রয়ে গেছে, বললেন কৃষ্ণা দেবনাথ। যেমন, হিন্দু বিধবা নারী স্বামীর সম্পত্তিতে Absolute Right পাবে না, সে কেবল ভোগদখল করতে পারবে। আর দায় মেটাবে স্বামীর। যেমন নিজের প্রয়োজনে কখনই এই সম্পত্তি, তা জমি হোক বা বসতভিটা হোক, বিক্রি করতে পারবে না নারী। কিন্তু তখনই পারবে যদি স্বামীর রেখে যাওয়া সন্তানের বিয়ে বা স্বামীর আত্মার মঙ্গল কামনায় যদি সে তীর্থে যেতে চায়। নিজের ইচ্ছায়, নিজের স্বপ্নপূরণে সেই জমি বা বাড়ি বিক্রির ওপর কোনো অধিকার নেই বিধবা হিন্দু নারীর। অর্থাৎ সমাজের ধরাবাঁধা ‘Legal necessity’ অর্থাৎ স্বামীর রেখে যাওয়া দায়-দায়িত্ব পূরণ করা ছাড়া নারীর কোনো অধিকার আগেও ছিল না, এখনও নেই। অর্থাৎ জীবনস্বত্ব এবং সীমিত অধিকার আগের মতই থাকবে অর্থাৎ বিধবার মৃত্যুর পর আবার তা স্বামীর উত্তরাধিকারীদের কাছে চলে যাবে।

তো, কী দাঁড়ালো? এই যে গতকাল থেকে ফেসবুকে বিভিন্ন মানুষের উল্লম্ফন দেখছি, তারা কতটুকু বুঝে বা না বুঝে তা করছে? এই যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভিন্ন জন ‘সাংঘাতিক সাফল্য’ বলে মন্তব্য করা শুরু করলো, তারা কি একটু বিশদ জানার জন্য অপেক্ষাও করতে পারেনি? তাদেরই বা দোষ দিই কীভাবে? বিবিসিকে রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি এটর্নী জেনারেল শাহ মো: আশরাফুল হক নিজেই তো লেছেন, “এই রায়ে হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর সব সম্পত্তিতেই অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। এই রায়ের ফলে কোর্ট যেটা বলছেন, একজন হিন্দু বিধবা নারী তার স্বামীর কৃষি জমিতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, ভাগ পাবেন। আনুপাতিকহারে সম্পত্তির ভাগ পাবেন।” কী ভয়াবহ মিথ্যাচারিতা, ভুল একটা তথ্য ওনার মতোন অবস্থানে থেকে বলে দিলেন একটা আন্তর্জাতিক মাধ্যমকে! আর সাংবাদিকরাও তাদের কথার ওপর ভিত্তি করে তা চাউড় করে দিল ভুল শিরোনাম দিয়ে।

উল্লেখ্য, ১৯৩৭ সালের হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইনে স্বামীর বসত ভিটাতেই শুধু বিধবা নারীদের অধিকার ছিল। তবে এটা এমন কোনো আইন না, জাস্ট থাকার অনুমতিটুকু তাদের থাকতো, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের উচ্ছেদ হতে হতো সেই ভিটে থেকে কোনরকম আইনের তোয়াক্কা না করেই। আর যেহেতু পৈতৃক সম্পত্তিতেও হিন্দু মেয়েদের কোনো অধিকার নেই, ফলে স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে নিজের বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে বাধ্য হলেও অচ্ছুৎ হয়ে বা অনেকটা দাসীর মতোনই জীবন কাটাতে হয় তাদের।

স্বাধীনতার পর আইনগুলো প্রণয়নের সময়েই যে সংশোধনটা সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল, অর্থাৎ সার্বজনিন উত্তরাধিকার আইন, সন্তানের অভিভাবকত্ব, এসব বিষয়ে কোনরকম পরিবর্তন না এনেই, বরং হিন্দু আইনটা একেবারে অপরিবর্তনীয় রেখেই তা প্রণীত হয়েছিল। আর এর জের টানছে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল নারী।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.