সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার এবং পারমিতাদের অস্তিত্ব

আশীষ ভট্টাচার্য:

হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার দেয়ার মহামান্য হাইকোর্টকে ধন্যবাদ। ২০১৮ সালে একটা সত্যি ঘটনার ছায়ায় লিখেছিলাম নিচের গল্পটি। হিন্দু মেয়েদের সমানাধিকারে এখনো অনেক পথ বাকি। আমরা হয়তো তাদের অস্তিত্বকেই স্বীকার করি না। নিচের গল্পটি শুধু গল্প নয়। আপনার আমার সবার ঘরের স্বাভাবিক ঘটনা।

 

আজ সাতদিন হয় পারমিতা বাবার বাড়িতে। মেয়ে লন্ডনে পড়তে যেতে চায়। তাই একাউন্টে একটা মোটা অংকের টাকা দেখাতে হবে। ভিসার জন্যে। এতো টাকা পারমিতার নাই। স্বামী অসময়ে মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। তাই বাবার বাড়িতে আসা। বাবা গত হয়েছেন। দাদা আছে। নানান দিকে ছড়িয়ে থাকা বাবার প্রায় শতকোটি টাকার ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। বোনের সাথে বসার সময়ই পাচ্ছেন না। পারমিতা সবসময়ই ভাইয়ের সাহায্য পায়। এবারেও আশায় আছে।

পারমিতা চোখ বুলায় চারিদিকে। এই ঘরেই ওর জন্ম। দেয়ালে টানানো সুতার কাজের ছবিটা ওরই করা। বাবা খুব খুশি হয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। জল এসে যায় পারমিতার চোখে। মেয়েদের কি কোন বাড়ি নেই? নিজের বাড়ি ভেবে যে বাড়িতে বড় হয়েছে, বিয়ের পর থেকে তা বাবার বাড়ি। নামে আছে, অধিকারে নেই। তিলে তিলে ভালবাসায় সাজানো স্বামীর বাড়িতে অধিকার গেছে স্বামীর মৃত্যুতে। পারমিতার একটি মেয়ে। ছেলে জন্ম দিতে পারলে সে সম্পত্তি ও ব্যবসায় অধিকার পেত। মেয়ে বা পারমিতা কিছুই পাবে না। তাই নিজের বলতে পারমিতার কিছুই নেই। শ্বশুর বাড়িতে দেবর ভাসুরের দয়াতেই আছে। পারমিতা এখন আশ্রিতা।

পাশের দেশ ভারতে হিন্দু মেয়েরা সম্পত্তিতে ছেলেদের সমান অধিকার পায়। অথচ বাংলাদেশে হিন্দু মেয়েদের সম্পত্তির কোন অধিকারই নেই। সরকার ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে হাত দেবে না। ওদিকে হিন্দু সমাজপতিরা ধর্মান্তরিত করে জমি দখলের অজুহাতে এর বিপক্ষে। সবার উপরে আছেন ভাইয়েরা। তারা বোনেদের ভাইফোঁটা নেবেন। রাখী বাঁধবেন। অথচ এ বিষয়ে বোনেদের পাশে থাকবেন না। কারণ লাভক্ষতির হিসাব। পারমিতার এমন একটি বাবা বা ভাই দেখার খুব ইচ্ছে যারা কিনা তাদের কন্যা বা বোনকে এই অধিকার না চাইতেই দিয়েছেন। পারমিতার মন কিছুতেই মানে না। যা কিছু দাদার, তা পারমিতারও। যা কিছু তার স্বামীর, তা পারমিতা বা তার মেয়ের নয় কেন? তবু আইন বলে কথা। সেই সভ্য সমাজ এখনও স্বপ্নে। তাই ভাইয়ের দয়ার ভারসাতেই আছে পারমিতা।

দেয়ালে মা ও বাবার ছবি। মালা পড়ানো। খুব অভিমান হয় পারমিতার। বাবা প্রিন্সেস ডাকতেন। মা পরী। দুই ভাইবোনের সংসারে কোন কিছুর অভাব হয়নি। চাওয়ার আগে এসেছে সব। তবু একদিন জানতে হলো বাবার বাড়ি মেয়েদের আসল বাড়ি নয়। প্রস্থানের আয়োজনে লাগলো উৎসবের রং। বিয়ে হলো পারমিতার।

নামী ধণাঢ্য পরিবারে পারমিতার ভবিষ্যৎ সুখের হিসাব কষেছিলেন বাবা। ভুল হয়নি। এক রাজকুমার নিয়ে এসেছিলেন রাজকুমারীর জন্য। পারমিতাও সুখী হয়েছিল। ভালবাসা আর ঐশ্বর্য দুটিই ছিল সংসারে। যৌথ পরিবারে চোখের মণি হয়ে মাঝে মাঝে নিজের ভাগ্যকেই ঈর্ষা হতো পারমিতার। পুতুলের মতো এক কন্যাকে নিয়ে বিভোর জীবনে দু:খের ছোঁয়া ছিল না কোথাও। একদিন সব উলট-পালট হয়ে গেল। বুকে ব্যথা বুঝতে না বুঝতে স্বামী চলে গেলো পরপারে। সাদা শাড়ি গায়ে উঠলো পারমিতার। সেইসাথে জীবনটাও বর্ণহীন হয়ে গেল। তার একমাত্র আদরের কন্যা বুলির জীবনও ভরে গেলো অন্ধকারে। কাকা জ্যাঠারা না পারতে কিছু কর্তব্য অবশ্যই করেন। তবে সেটা এক বিধবা ও পিতাহীন কন্যার হিসেবেই। ওখানে সবকিছুতেই কৃচ্ছতা। ভালবাসাতেও।

পারমিতা এমনই আনমনা হয়েছিল, লক্ষ্যই করেনি কখন দাদা এসে সোফায় বসেছে। সম্বিত ফেরে দাদার ডাকে।
– পারু…
দাদা অই নামেই ডাকে আদর করে। এখন বড্ড বেমানান লাগে এই ডাক।
– দাদা এসেছো?
– তোর বৌদি আমাকে বলেছে। দাদা মাটির দিকে তাকিয়ে বলে।
– দাদা, বুলি লন্ডন পড়তে যেতে চায়। ভিসার জন্য হিসেবে কিছু টাকা দেখাতে হবে।
– টিউশন ফি কী করবি? দাদার গলায় এখন বিরক্তি।
– দাদা গয়না বিক্রি করে দেবো। বাকিটা ও কাজ করে ম্যানেজ করে ফেলবে।
– বিদেশ পড়ার পোকা ওর মাথায় কে ঢুকালো রে? রিমি? আমার মেয়েটা একটা হতচ্ছাড়ি। দাদার গলায় রিমির জন্য আদর ঝরে পড়ে।
– দাদা রিমি ওর কলেজ থেকে সব কাগজ পাঠিয়েছে।
– পারু, তোর মেয়েকে বোঝা। সবার সব সাজে না। রিমি আমার মেয়ে। লন্ডনে পড়ছে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তোদের এসব সাজে না।
– দাদা, আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই এমনই বলে। ওরা বুলিকে বিয়ে দিয়ে আপদ বিদায় করতে বলে। অথচ নিজেদের সন্তানদের জন্য তাদের সমীকরণ ভিন্ন।
– ওরা ঠিকই বলে। সবার সব চাইতে নাই। ভুল আমারই। আমি তোকে মাথায় তুলেছি। তোর বৌদি ঠিকই বলে। আর নয়।
– দাদা! পারমিতা ভাষা হারায়।
– কবে যাবি? গাড়ি ভাড়াটা তোর বৌদির কাছ থেকে নিয়ে যাস।

পারমিতা এখন রাস্তায়। শ্বশুর বাড়ি যাবে। পথে শহীদ মিনার। পারমিতা থেমে যায়। বেদির পাদদেশে বসে পারমিতা। দেশকে বলতে হবে পারমিতাদের অস্তিত্ব কোথায়? পারমিতাদের সব হারিয়ে কেন যায়? অনশন শুরু করে পারমিতা। আর বিস্ময়ে আবিস্কার করে সে একা নয়। পারমিতারা ঘরে ঘরে। মেয়েদের চিতায় তুলে দেয়া সমাজটির অন্তকরণ আজও বদলায়নি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.