প্রতিশোধপরায়ণতায় মামলা ও আইনের সীমাবদ্ধতা

প্রমা ইসরাত:

১। প্রায় তিন বছর আগে একটি মেয়ে আইনী সহায়তার জন্য আসে। তার অভিযোগ, তার বয়ফ্রেন্ড তাকে বিয়ে করবে বলে শারীরিক সম্পর্ক করেছে এবং এক পর্যায়ে সে প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে কোন একটা ক্লিনিকে এবরশনও করিয়েছে। এখন সেই বয়ফ্রেন্ড তাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে না, যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে, এবং অন্য আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মেয়েটি এখন ধর্ষণের মামলা করতে চাইছে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ অনুযায়ী, ওই বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করার এই ধারাটি ফেমিনিস্ট লিগ্যাল থিওরি অনুযায়ী নারীর সমতার মর্যাদার দিক থেকে খুবই সাংঘর্ষিক। কারণ দুইজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষ, সম্পূর্ণ সম্মতিতে একটা সম্পর্কে গেলে সেখানে ওই বিয়ের প্রলোভন দেখানোর বিষয়টিকে কারণ হিসেবে দেখা মানে নারীকে মর্যাদার দিক থেকে বৈষম্য করা। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, প্রাপ্তবয়ষ্ক হলেও নারীর ধরন এমন যে তাকে প্রলোভন দেখানো যায়, শিশুর মতো। অথচ এই তত্ত্ব পুরুষের বেলায় তো দেখা যায় না। কোন নারী পুরুষকে প্রলোভন দেখিয়ে, শারীরিক সম্পর্ক করে আর বিয়ে করেনি বলে পুরুষ ধর্ষণের অভিযোগ করতে পারবে, এমনটি হয় না কেন?

এর পিছনের কারণটা এটাই যে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর যৌনতাকে উহ্য করে রাখা, এবং সতীত্বতার কনসেপ্টকে জিইয়ে রাখা। সেই সাথে নারীকে অবলা, এবং প্রলোভন দেখানো যায়, এমন একটি শ্রেণিতে ফেলে দেয়া যা পুরুষ থেকে মর্যাদায় নিচে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সেই মেয়েটি তার বয়ফ্রেন্ড, যে বয়ফ্রেন্ড তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে, তার সাথে সম্পর্ক অস্বীকার করছে, তাকে পাওয়ার জন্য, এটা করতে চাইছিলো, এবং না পেলে তাকে যেন আইনি ঝামেলার মাধ্যমে একটু হেনস্থা করা যায়, সেজন্য প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিলো। প্রেমে ধোঁকা খেয়ে মন ভাঙার এই ব্যাপারে আমি তার প্রতি সমানুভূতিশীল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মন ভাঙার জন্য কোন আইন নেই।
জোর করে সম্পর্ক হয় না। এবং আইনে এমন একটি ধারা থাকা সীমাবদ্ধতা, এটা নারীর যৌনতাকে অস্বীকার করার পুরুষতান্ত্রিক ধারণার প্রতিফলন।

২। স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে, এরপর স্ত্রী ভরণপোষণ ও দেনমোহরের মামলা করেছে, সেই সাথে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী যৌতুকের জন্য নির্যাতনের মামলাও করেছে।
কারণ কী? কারণ হচ্ছে, নারীটির স্বামী এই যে নারীটিকে তালাক দিলো, সে এই তালাকের বদলা নিতে চায়। অথচ লোকটি যৌতুক চায়নি, শারীরিক নির্যাতনও করেনি। এখন যৌতুকের মামলা করা হচ্ছে, কারণ তালাক দিলে এই সমাজে নারীটি বিপদে পড়বে তালাকপ্রাপ্তা হিসেবে। এই সমাজে তালাকপ্রাপ্ত নারীর জীবন যাপন দুষ্কর হয়ে ওঠে। আর পুরুষটির কিছুই হয় না। তাই তালাক দেয়ার বদলা হিসেবে যৌতুকের মামলা করা হয়। যা আইন ব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতা। তালাকপ্রাপ্ত হলে, তাকে নিয়ে সমাজে যেন কোন ধরনের হেয় প্রতিপন্ন করার সংস্কৃতি না থাকে, কেউ যেন এমন চর্চা না করে সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। এখন দেনমোহর ও ভরণপোষণ এর ক্ষেত্রেও বলতে হয় যে, নারীর আর্থিক দিক থেকে সক্ষমতা না থাকা, এবং বিয়ে সংসারকেই তার একমাত্র টিকে থাকার অবলম্বন হিসেবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্যেই, একজন নারীকে ভরণপোষন আর দেনমোহরের টাকার জন্য মুখিয়ে থাকতে হয়।

আবার নানান জায়গায় দেনমোহর বেশি ধরার চল আছে, যেন তালাক দিলে পুরুষটি বিপাকে পড়ে, কিংবা উচ্চ মূল্যের দেনমোহর পরিশোধের ভয়ে তালাক না দিতে পারে। সংসার টিকে থাকে এক্ষেত্রে, কিন্তু মানসিক অশান্তি নিয়ে সেই পরিবার টি দিন কাটাতে থাকে, যার জন্যে ক্ষতি হয়, এমন একটি পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুর।

৩। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে, সুস্পষ্ট আইন আছে, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০। কিন্তু এই আইনটি ব্যবহৃত হয় না। কারণ এই আইনের ২৯ ধারায় বলা আছে, আইনটি আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপোষযোগ্য। এতে যেই সমস্যা হয় সেটা হচ্ছে, যিনি অভিযোগ করেছেন, তার নিরাপত্তাজনিত সমস্যা তৈরি হয়। আবার জামিনযোগ্য, তাই ওই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উচিত শিক্ষা দিতে, আদালতে গিয়ে ঠুকে দেয় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা।

শহরে যখন এসেছি, চাচার নামে একটা মামলা দিয়ে যাই, এরকম একটা মানসিকতা নিয়ে যদি মানুষ চলে, তাহলে সম্ভাবনা থাকে শুধুমাত্র প্রতিশোধ নেয়ার জন্য, মামলা করা এবং সেই মামলায় আসামী হয়ে থানা আদালতে ঘুরপাক খাওয়ার হয়রানি।
আইন ও বিচার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। যেখানে অপরাধী সাজা পাবে, এবং যে ভুক্তভূগী সে আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাবে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বিচার পাবে।

কিন্তু আইনের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিশোধপরায়ণতার জন্য অনেক মানুষ ন্যায় বিচার পায় না।
আইনের সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে এর সংশোধন প্রয়োজন, প্রয়োজন সময়োপযোগী করে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন।

প্রমা ইসরাত
লেখক ও আইনজীবী।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.