জীবন আপনার, স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বটাও আপনার

আলী আদনান:

সময়ের ব্যবধানে দেশে উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। ই -কমার্স নির্ভর উদ্যোক্তাদের বড় অংশ নারী। আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটা আমাদের জন্য ইতিবাচক দিক। এই লেখাটি মূলত সেই সকল নারী উদ্যোক্তাদের জন্য যারা উদ্যোগ নেবো নেবো করে এখনও নানা কারণে নিয়ে উঠেননি।

জীবন আপনার, স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বটাও আপনার। উদ্যোগ নেওয়া বা উদ্যোক্তা হওয়া খুব সহজ একটা কথা নয়। আমাদের প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তা হতে গেলে নানা ধরনের বাধা বিপত্তির মোকাবেলা করতে হয়। পারিবারিক বাধা, সামাজিক বাধা, অর্থনৈতিক বাধা আরো কতো কী!

যারা নতুন উদ্যোগ নিচ্ছেন তারা ইতোপূর্বে যারা সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন তাদের জীবনের গল্পগুলো পড়ে দেখতে পারেন। বা তাদের সাথে আলাপ করতে পারেন। অনলাইনে সময় দিলে উদ্যোক্তাদের একে অপরের সাথে যোগাযোগ সম্ভব। পরিচয়ের মাধ্যমে একে অপরের গল্পগুলো শুনলে দেখবেন, কারও জীবনের গল্পই মসৃণ নয়।

আপনাকে উদ্যোগ নিতে বাবা দেয় না, মা দেয় না, স্বামী দেয় না- এরকম অসংখ্য ‘না’ দেওয়ার মানুষের অভাব নেই। আমাদের একেক জনের বাস্তবতা একেক রকম। আমাদের একেক জনের লড়াইও একেক রকম। আপনি আপনার লড়াইটা কীভাবে করবেন, সেই দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। আপনার লড়াই অন্য কেউ করবে না। করা সম্ভবও নয়।

মনে রাখবেন, নিজের দৃঢ় সংকল্প, মানসিক স্থিরতা, বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল দিয়ে অনেকগুলো ‘না’ কে মোকাবেলা করে ‘হ্যাঁ’ করানো আপনার দায়িত্ব। এবং এটাও আপনার উদ্যোগের একটা বড় অংশ। আজকে অনেকগুলো ‘না’ আপনার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু আপনি যদি সফল হন, তাহলে একই হাতগুলো ‘হ্যাঁ’ ‘হ্যাঁ’ বলে আপনাকে সাধুবাদ দিবে।

আপনি যদি নিজে উদ্যোক্তা হয়ে থাকেন বা উদ্যোক্তা হতে চান তাহলে উদ্যোগ নেওয়ার পর কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে পারেন-

এক. উদ্যোগ নিতে গিয়ে এমন লোকের সাথে পরামর্শ করবেন না যারা কাজটি সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। অন্য অনেকে পরামর্শ দিলেও সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি নিজেকে পুরোপুরি অন্যের পরামর্শের উপর ছেড়ে দিবেন না। তাহলে কাজ নিয়ে আপনার যে আগ্রহ ও স্বকীয়তা তা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

দুই. আপনি যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন সেভাবেই কাজ করুন। প্রথমদিকে আপনার কাজ ভালো নাও হতে পারে। রাতারাতি ভালো হবে এমনটা আশা করাও উচিত নয়। আপনি আপনার মতো করে করুন। করতে করতে সময়ের ব্যবধানে কাজে পরিপক্কতা এসে যাবে। ভুলত্রুটি ঝরে পড়বে। সময়ের ব্যবধানে আপনার কাজটি অনেকের জন্য উদাহরণ হবে।

তিন. আমাদের সমাজে বেশীরভাগ লোক তারাই – যারা নিজেরা কিছু করেন না। কিন্তু অন্যকে জ্ঞান দেওয়ার জন্য তাদের খুব আগ্রহ। তাদের মুখ বন্ধ করার ক্ষমতা আপনার হয়তো নেই। কিন্তু নিজের কান বন্ধ রাখার ক্ষমতা আমাদের আছে। তাই করুন। নিজের কান বন্ধ রাখার মধ্যে সফলতা নিহিত।

চার. আমি ইচ্ছে করলেও অন্য কারও মতো হওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমি আমার মতোই। সেটাতেই আমি সন্তুষ্ট থাকি। আমার কাজগুলো আমার মতোই হবে। এটা নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগার দরকার নেই। আমি আমার মতো করে আমার জায়গা থেকে উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষপাতি। নিজের মতো করেই নিজেকে উপস্থাপন করি।

পাঁচ. আপনার চোখের সামনে অন্য একজন থ্রি-পিস বা শাড়ি নিয়ে কাজ করে লাখপতি হয়ে গেছেন। তাই বলে আপনিও শাড়ি নিয়ে কাজ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কোন কাজটি ভালো পারেন? কোন ধরনের উদ্যোগ আপনার অনুকূলে বা আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন? কোন ধরনের কাজ আপনি মন থেকে ভালবাসেন? অর্থাৎ নিজের সিদ্ধান্ত নিজের জায়গা থেকে নেওয়া ভালো।

ছয়. পড়া এবং জানার বিকল্প নেই। যে উদ্যোগ নিতে চাচ্ছেন সেটি নিয়ে প্রচুর পড়াশুনা করুন। গুগলভিত্তিক লেখাগুলো পড়ুন। গুগলে সার্চ করলে পাওয়া যায় না এমন কিছু নেই। সেগুলো পড়ুন। সেখান থেকে যে ধারণা পাবেন, সেটার সাথে নিজের সৃষ্টিশীলতা যোগ করুন।

সাত. আপনি যে উদ্যোগটা নিয়েছেন সেটাকে আপনি নিজে মন থেকে ভালবাসা চাই। আপনি যদি আপনার কাজকে ভালো না বাসেন, অন্য কেউ আপনার কাজকে ভালবাসবে না। নিজের উদ্যোগের কথা সব জায়গায় বুক ফুলিয়ে বলুন। কোন ধরনের হীনমন্যতা রাখবেন না। সম্ভব হলে ভিজিটিং কার্ড করুন। কারও সাথে পরিচিত হওয়ার সময় সেটা দিন। নিজের কাজ সম্পর্কে বলুন।

আট. সততার বিকল্প নেই। ই কমার্সে ক্রেতা পণ্য ক্রয় করছে বিক্রেতাকে না দেখেই। অর্থাৎ এটা বিশ্বাস নির্ভর জগৎ। আমাদের দেশে ই- কমার্স যেমন সাড়া পেয়েছে, তেমনি কিছু অসাধু লোকের জন্য অভিযোগও কম নয়। যারা সুদূরপ্রসারী চিন্তা করছেন বা নিজের পণ্যের সুনাম দেশ বিদেশে ছড়াতে চান, তাদের ‘সততা’র কোন বিকল্প নেই। ধরুন, আপনি দুগ্ধজাত পণ্য নিয়ে কাজ করছেন। সেই পণ্য আপনি আপনার সন্তানকে খাওয়াচ্ছেন তো? যা আপনি নিজে খাবেন না বা আপনার সন্তানকে খাওয়াবেন না তা ক্রেতাকে খাওয়ানো কোন ভাবেই উচিত নয়।

নয়. নিজের কাজকে সময় দিন। আগে যে সময়টা ভিডিও গেমস বা লুডু খেলে নষ্ট করেছেন বা বিভিন্ন আজে বাজে গ্রুপে দিয়েছেন সেই সময়টা এখন নিজের কাজকে দিন। এতোটুকু বলতে পারি, আপনি নিজের কাজকে সময় দিলে কাজ আপনাকে খালি হাতে ফিরাবে না।

দশ. লেগে থাকুন। ভুলেও মাঝপথে হাল ছেড়ে দিবেন না। মায়ের গর্ভে যে সন্তান এসেছে সে পৃথিবীতে আসবেই। আপনি যে লক্ষ্য নিয়ে শুরু করেছেন তা পরিপূর্ণতা পাবেই। মা যেমন গর্ভের সন্তানের যত্নের জন্য বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, আপনারও একজন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নিয়ম মেনে চলার বিকল্প নেই।

 

লেখক: আলী আদনান, সঞ্চালক ও সমন্বয়ক, স্রোতের বিপরীতে যে জন

শেয়ার করুন:
  • 461
  •  
  •  
  •  
  •  
    461
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.