সিনেমার ‘নো, মিনস নো’ বাস্তবে কেন বোধগম্য নয়?

সালমা লুনা:

অবশেষে মৌলভীবাজারের সেই মেয়েটি মামলা করেছেন। তার অভিযোগ, তাকে অতিরিক্ত গাঁজা খাইয়ে তারই বন্ধু তার অচেতন অবস্থার সুযোগ নিয়ে ধর্ষণ করেছে। এবং তাকে সাহায্য করেছেন আরেকজন নারী। যার নারীবাদী এক্টিভিস্ট হিসেবে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও নারীদের জন্য কাজ করার বিশেষ খ্যাতি আছে। সাথে ছিলো তার এক পুরুষ বন্ধু। তাদের দুজনকেও অভিযুক্ত করেছেন তিনি।
শুধু তাই না। পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার নাম পরিচয় প্রকাশকারীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ দায়ের করেছেন। মেয়েটির সাহসের প্রশংসা করতেই হয়, খুবই ভালনারেবল পরিস্থিতিতে থেকেও শেষ পর্যন্ত তিনি তার বিরুদ্ধে ঘটা অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে আইনের আশ্রয় নিয়েছেন।

আকছার দেখা যায় এসব ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পেতে অনেক সময় লেগে যায়। কখনও ভিকটিম পিছিয়ে আসে। আবার আপোস নিষ্পত্তিও হয়ে যায় নিজেদের মধ্যে। সময়ই বলে দেবে কী হতে যাচ্ছে। তবে এর একটা সফল সমাপ্তি খুব দরকার।

কেন দরকার?

ধর্ষণ ঘটে থাকলে এর বিচার তো অবশ্যই হতে হবে। ধর্ষণের বিচারহীনতা এবং বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার যে ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সেই অচলায়তনকে ভাঙতেই এটি দরকারি হয়ে পড়েছে।

এছাড়া কয়েকটি ভাইটাল ইস্যুতেও এই অপরাধের ন্যায়বিচার হওয়া দরকার।

মেয়েটি স্বেচ্ছায় তার বন্ধুর সঙ্গে তাদের আরেক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছে। সেখানে তারা নিষিদ্ধ মাদক গ্রহণ করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, মেয়েটি কি জানতো না এভাবে পুরুষ বন্ধুর সাথে যাওয়া উচিত নয়? গিয়েছিল এবং নেশা করেছিল তাই এরপরে সেক্স হবে, এটা কি স্বাভাবিক নয়? যে মেয়ে বাইরে নেশা করার জন্য রাত কাটায় সে কেন বন্ধুর সাথে যৌনতায় বাধা দেবে?
প্রতিটির প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর সমাজকে, মানুষকে জানতে হবে। তাই এর অতি দ্রুত বিচার প্রয়োজন।

আরো দুতিনটি কারণেও এই বিচার অতি জরুরি।
একটি হলো নারী হয়ে নারীবাদীর তকমা গায়ে লাগিয়েও যিনি এইরকম একটি ঘটনার সাক্ষী ও সহযোগী হলেন, যাকে কেন্দ্র করে নারীবাদ প্রশ্নবিদ্ধ হলো, তার একটি সুরাহা হওয়াও খুব প্রয়োজন।
তার বিরুদ্ধে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে, সেটাও গুরুতর, তারও সুরাহা হতে হবে।
সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধ, মাদক, স্বেচ্ছাচারিতা, অবাধ যৌনতা এসবকে যেকোনো ইজমের সাথে গুলিয়ে ফেলা যে মনুষ্যত্ব অবমাননার সামিল, সেটিরও একটা সাক্ষ্যপ্রমাণ ও উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক এই ঘটনাটি।

আমরা আধুনিকতার তুঙ্গে অবস্থান করছি।
কোন নারী বা পুরুষ যদি তার শরীর ছোঁয়ার অনুমতি না দেয়, সে যদি স্পষ্ট ‘না’ বলে, তবে সেই না-কেই এস্টাবলিশ হতে হবে এই আধুনিক সমাজে।

বন্ধুকে বিশ্বাস করে বন্ধুর তস্য বন্ধুর বাড়িতে একটি মেয়ের স্লিপ ওভার করা, গাঁজা খেতে যাওয়া উচিত অথবা অনুচিত নিয়ে কিছু না বলি। এটি যার যার রুচি, ব্যক্তিত্ব ও পারিবারিক শিক্ষার বিষয়। তথাপিও যদি সে তার সেই বন্ধুকেও নিজের শরীর ছোঁবার অনুমতি না দেয় তাহলে সেই অনুমতি না দেয়াটাই এক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হবে। এবং এই ‘না’ কে জনমানসের গভীরে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই বিশেষভাবে এই ঘটনার বিচার হওয়া দরকার।

অমিতাভ বচ্চন আর তাপসী পান্নু অভিনীত ‘পিঙ্ক’ সিনেমা দেখে তো লাগাতার খুব আহা উহু করলাম সবাই। এবার বাস্তবে ‘নো, মিনস নো’ এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠার পালা এসেছে। এবার রূপালি পর্দা থেকে বাস্তবে নেমে আমাদেরও নিজেদের চিনে নেবার পালা।

একটি মেয়ে বন্ধুর বাড়ি আয়োজন করে বন্ধুকে নিয়ে গাঁজা খেতে গেছে নাকি গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি খেতে গেছে সেটা উকিঝুঁকি দিয়ে কেউ দেখতেই পারে, বিশেষ করে যার অতিমাত্রায় অ-সভ্য কৌতুহল আছে। সেটি গসিপের বিষয় হলেও ততক্ষণ গুরুতর না যতক্ষণ না খবর পাওয়া যায় মেয়েটি বন্ধু কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

সভ্যসমাজের উচিত তখন উঁকিঝুঁকি বাদ দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, এবং তাকে আইনের আশ্রয় নিতে সাহায্য করা।

আফসোস হচ্ছে মেয়েটি সমাজ ও পরিবারের ভয়ে দেরী করে ফেলায় ধর্ষণের কোনো আলামতই নাই, সাক্ষীরা ছাড়া। সাক্ষী তিনজনের দুইজন আবার নিজেরাই আসামী। আরেকজন বিভিন্ন উল্টাপাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে।
তবু মনে প্রাণে চাই এই ঘটনার বিচার হোক।

আমরা চাই বা না চাই আধুনিকতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাই এখন স্কুলের বাচ্চারাও শরীরের সম্পর্ক বিষয়ে জানে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে অনেকের কাছেই স্বেচ্ছায় শরীর বিনিময় করার নাম আজকাল মাস্তি, চিল করা।
তাছাড়া যেখানে খুবই সস্তায় শরীর মিলেও যায় অনায়াসে। সেখানে বন্ধু কেন বন্ধুকে ধর্ষণ করবে?
‘না, আমি এখন এইসব চাই না’ – বললেও কেন রাক্ষসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে? এতো আধুনিক হয়েও কি ওরা এখনও অশিক্ষিত বর্বর মুর্খদের মতো নারীকে ছিলা কলা, তেঁতুল, খোলা রসগোল্লা মনে করে?

তাহলে এই আধুনিকতার কী দাম!
এসব প্রশ্নকে তারা অশ্লীলতা মনে করেন। তারা বুঝতেই পারেন না পৃথিবীতে আসলে ধর্ষণটাই চরমতম অশ্লীলতা। নারীর দোষে ধর্ষণ হয় এটি বলাটাও অশ্লীলতা। নিজেদের সভ্য করে গড়ে তুলতে না পারাটা অশ্লীলতা।

আরেকটা কারণেও এই মামলা প্রাধান্য পাবে, যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় মেয়েটির নামধাম প্রকাশ করেছেন তার বিষয়ে আইন সুস্পষ্টভাবে কী বলে সেটাও জানা যাবে। সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক সোসাইটিতে এমন আচরণের একটি শাস্তি অবশ্যই দরকার আছে।

ফেসবুকে অনেকেই এই কাজটি করে থাকেন। বিশেষ করে নারীদের ছবি, নাম প্রকাশ্যে এনে তাকে হেয় করা হয়। এদের কাছেও একটা দৃষ্টান্ত হবে।
আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন বর্তমানে যাদের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য। তারা সামাজিক মূল্যবোধ, নীতি ও আদর্শের বিশয়ে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি নিজেরা একতাবদ্ধ হবেন এটাই আশা করি। একতাবদ্ধ হওয়াটা এখনই জরুরি, খুবই জরুরি।

মিডিয়া ট্রায়াল কিংবা ফেসবুক আদালত অথবা আরো কিছু বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে এই মামলা করার জন্য মেয়েটি এবং মেয়েটির পাশে যারা আগাগোড়াই আছেন, সাহস দিচ্ছেন সাহায্য করছেন তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ প্রাপ্য।

 

(উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখাই লেখকের নিজস্ব মতামত)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.