ঐতিহ্য নয়, অসমতার পরিবর্তন চাই

আসলাম আহমাদ খান:

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় সামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে সমাজ অভ্যন্তরস্থ রীতি-নীতি সহ বিদ্যমান ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন। পরিবর্তনের এই গতি-প্রকৃতি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, কিছু পরিবর্তন যে বিবর্তনের ন্যায় ধীরগতিতে হয়- এ বিষয়ে কারো বিরোধ নেই। মানুষ তার সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে সমাজের রীতি-নীতি, আইন-কানুন, আচার-আচরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে আদিম বন্যদশা থেকে আজকের সভ্য সমাজের রূপান্তর ঘটিয়েছে- একথা যেমন সত্য, তেমনি এই সমাজেরই কিছু মানুষ পরিবর্তনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে- একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। ইতিহাস তাই বলে। আবার কিছু মানুষ বিরোধিতা না করলেও, পরিবর্তনে সম্মতি দিয়ে নতুনত্বকে গ্রহণ করতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে বা দোটানায় পড়ে। অর্থাৎ কোন পরিবর্তনই কলি থেকে ফুল ফোটার মতো স্বতস্ফূর্তভাবে হয়নি।

যুগে যুগে সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে গিয়ে মানুষকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কৃষির উদ্ভাবনের মাধ্যমে সভ্যতার সূচনা করেছিল নারীরা। তখনকার পরিবারগুলোও ছিল মাতৃতান্ত্রিক। এক সময় সমাজে গোষ্ঠীগত ও দলগত বিবাহ, (অর্থাৎ একদল পুরুষ ও একদল নারী- দলের প্রত্যেকে প্রত্যেকেই স্ত্রী ও স্বামী) বহুস্বামী ও বহু-স্ত্রী বিবাহ, এমনকি ভাই-বোনদের মধ্যে বিবাহ-ও সমাজস্বীকৃত ছিল। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটেছে, মানুষ তার নৈতিক অবস্থান থেকে কিছু বৈবাহিক সম্পর্ককে অনৈতিক আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে অন্যান্য প্রাণীকুলের সাথে মানুষের পার্থক্যটা স্পষ্ট করেছে।

এর পরেও বহুবিবাহের অস্তিত্ব সমাজ থেকে একেবারে মুছে যায়নি। এক সময় ভারতীয় উপমহাদেশে অমানবিক সতীদাহ প্রথা ও দাস বিবাহের প্রচলন ছিল। সময়ের ব্যবধানে দাস বিবাহ ও সতীদাহ প্রথাও সমাজ থেকে দূরীভূত হয়েছে। বিবাহ ও পরিবারের কাঠামোগত এই পরিবর্তনের পাশাপাশি বিবাহকে ঘিরে নানান আনুষ্ঠানিকতা ও আনন্দ আয়োজনেও পরিবর্তন এবং বৈচিত্র্য এসেছে। এই পরিবর্তনগুলি কিন্তু রাতারাতি হয়নি,হয়েছে ধীরগতিতে। বিবাহের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজনের তাগিদে হলেও, আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়েছে শখ ও বিনোদনের বৈচিত্র্যের কারণে। সমাজের এই দীর্ঘ বিবর্তনের ধারায় পরিবারের কর্তৃত্বেরও পরিবর্তন ঘটেছে,মাতৃতান্ত্রিক পরিবারগুলো রূপ নিয়েছে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজ একটি গতিশীল চলমান প্রক্রিয়া। মানুষ যতদিন সমাজবদ্ধ থাকবে, সমাজের এই গতিশীলতাও ততোদিন চলমান থাকবে। আবার সমাজ পরিবর্তনের ধারায় পূর্বের সবকিছু বিসর্জনও দেয়নি মানুষ; কিছু গ্রহণ করেছে, কিছু বর্জন করেছে; গ্রহণ-বর্জনের এই ধারায় যা কিছু টিকে আছে – সেটাই আমাদের ঐতিহ্য। কাজেই ঐতিহ্য লালনে অন্যায় কিছু দেখি না, যদি সে ঐতিহ্যের নিজস্বতা থাকে। পরিবর্তনেও অসুবিধা দেখি না, যদি সে পরিবর্তন সমাজের জন্য মঙ্গলজনক হয়। তবে, ভেতরে সমস্যা জিইয়ে রেখে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন কোন মঙ্গলের বার্তা বয়ে আনে না।

বাংলাদেশের বিয়ের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। দেনমোহর , পণপ্রথার আইনগত স্বীকৃতি বহাল রেখে উদযাপনের রীতি পরিবর্তন অন্তসারশূন্য। এখনও বাংলাদেশের মেয়েরা তাদের মা-বাবার কাছ থেকেই বৈষম্যের শিকার, এখনও বাংলাদেশের দু’জন মেয়ে একজন ছেলের সমান সম্পত্তি পায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আবার তা-ও পায় না। মা-বাবা, ভাই-বোন ইচ্ছা করলেও নিতে কিংবা দিতে পারে না। কিন্তু আইনটি যদি সমতাভিত্তিক হতো , তাহলে কম দেয়ার চিন্তা কেউ মাথায়ই আনতো না। মেয়েরা যেটুকু পায়, সেটুকুও নিতে লজ্জাবোধ করে ; কারণ ওয়ারিশ নেওয়া এখনও সামাজিকভাবে নিন্দনীয়; ওয়ারিশ নেয়া মানে ভাইদের সাথে চিরতরে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

আমি আমার নিজের বোনকে জানি, যার কিনা নিজ অস্তিত্বের প্রয়োজনেই মা-বাবার সম্পদের ভাগ তার বিশেষ প্রয়োজন, কিন্তু সামাজিক সংস্কারের কারণে বলছে, না খেয়ে থাকবো কিন্তু ওয়ারিশ নেবো না। সমাজে বাস্তবিকই এমন অনেক অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা আছে, যার কারণে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সম্পদ নিতে পারে না, একবার ওয়ারিশ নিলেই বোনরা পর হয়ে যায়। অর্থাৎ স্নেহ ভালোবাসাও সম্পদ দেয়া-নেয়ার মানদণ্ডে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইনও তাই বলে। আমি ইচ্ছে করলে ব্যক্তিগত সহানুভূতি দেখাতে পারি, কিন্তু আইনের পরিবর্তন করে বৈষম্যের অবসান ঘটাতে পারি না। তবে আমি এবং আপনি ইচ্ছা করলে এই বৈষম্যের অবসানের জন্য সোচ্চার হতে পারি, নিন্দা করতে পারি; কিন্তু তা না করে আমরা মোটর সাইকেল চালানোর নিন্দায় ব্যস্ত। মেয়েরা সাইকেল চালায়, বিমান চালায়, মহাকাশে ভ্রমণ ও গবেষণা করে- সবই অগ্রগতির লক্ষণ। মেয়েটি বাইক চালিয়ে শ্বশুর বাড়িতে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে গেছে, এতে দোষের কিছু দেখি না। মেয়েদের মোটর সাইকেল চালাতে কি এই প্রথম দেখছি ? সিনেমায় দেখলে তো হাতাতালি দেই- তাহলে বাস্তবে এতো স্ববিরোধী কেন ? কিছু মানুষ তো এটাকে ইস্যু বানিয়ে রীতিমতো যুদ্ধে নেমেছে, যেন মোটর সাইকেল চালানোর অপরাধে রাত পোহালেই মহাপ্রলয় শুরু হবে। কেউ কেউ তো সীমাহীন বকাবকি শুরু করে দিয়েছেন।

আরে ভাই, এতো বকাবকি করার কি আছে ? কোন মেয়েকে মোটর সাইকেল চালাতে কি এই প্রথম দেখেছেন ? আর ওকে বকাবকি করার অধিকারই বা আপনাকে কে দিয়েছে ? আপনি কি তার অভিভাবক ? রাস্তাঘাটে প্রতিদিন হাজার হাজার মেয়ে রাস্তায় বাইক চালিয়ে, রিক্সা চালিয়ে, মাটি কাটার মতে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জীবন চালায়- সেগুলি আপনাদের চোখে পড়ে না ? এরোপ্লেনে চডে যখন এক দেশ থেকে আরেক দেশে যান- তখন কি পাইলট মহিলা হলে, যেতে অস্বীকার করেন ? সুন্দরী এয়ার ক্রুরা খাবার পরিবেশন করলে কি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন ? বরং হাসিমুখে কথা না বললে গোস্বা করেন।

আর আমি বুঝলাম না, সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতেও এটা একটি বড় সংবাদ হলো কী করে ? মেয়েটি একটু ফান করেছে- এতে করে তো সমাজে কোন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা ইউটিউব চ্যানেলের সাথে মেইনস্ট্রিম বলে পরিচিত সংবাদ মাধ্যমও এ ঘটনাকে পুঁজি করে মেয়েটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সাবস্ক্রাইব বাড়ানোর জন্য।

আমেরিকার মতো উন্নত নারী স্বাধীনতার দেশে বসবাস করে এমন অনেককে জানি, যাদের ছেলে-মেয়েরা উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করে, বিয়ের আগে ব্যাচেলর পার্টি করে-তারাই আবার মসজিদে গিয়ে অন্য মানুষকে নসিহত করার হাস্যকর বয়ান দেয়। আরে ভাই, নিজের ঘর ঠিক করেন আগে। আপনার মেয়ে যখন গাড়ি চালিয়ে কাজে যায়, তখন কি বারণ করেন ? মেয়েটি তো বিয়ের সাজে বাইকে চড়েছে , আপনার মেয়ে যখন পুঁজিবাদের খপ্পরে পড়ে শরীরে কম কাপড় রাখার প্রতিযোগিতায় নামে, তখন মহাভারত অশুদ্ধ হয় না ?

আমার বোনদেরও বলি, আসল জিনিসে হাত না দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু করে বিশেষ কোন সুফলও পাওয়া যাবে না। আর ঐতিহ্য নষ্ট করারই বা কী প্রয়োজন আছে! ঐতিহ্যের পরিবর্তনের চেয়ে অসমতার পরিবর্তন জরুরি।

তাছাড়া, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার এই ঐতিহ্য রক্ষা করেও অসমতার পরিবর্তন সম্ভব। আমেরিকায় বিয়ে রেজিষ্ট্রি হয় রাষ্ট্র নির্ধারিত আইন অনুযায়ী। এবং এই আইন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও একই আইন। এ আইন সংশোধন হতে হতে এ পর্যায়ে এসেছে, কিন্তু উদযাপনের ঐতিহ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি; বরং ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আইন অনুসারে বিয়ে হলেও, উদযাপনটা হয় প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম ও সম্প্রদায়ের রীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। কাজেই উদযাপনের রীতি পরিবর্তনের চেয়ে বৈষম্যমূলক আইনের পরিবর্তনে মনোযোগী হওয়া জরুরী।

আমি ব্যক্তিগতভাবে, বিয়ের অনুষ্ঠানকে ঘিরে সামাজিক রীতিকে রক্ষা করার পক্ষে। যদি কেউ আমাকে রক্ষণশীল বলেন- বলতে পারেন। হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতা ক্ষতিকর নয়, বরং মানুষ ইচ্ছা করেই এটাকে লালন করে। ইউরোপ আমেরিকার যে মেয়েরা প্রতিদিন গাড়ি কিংবা বিমান চালায়, আবার বিয়ের অনুষ্ঠানটি করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিকে অনুসরণ করেই। এমনকি জাতিসংঘও বিশ্বের সমস্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে।

বিশ্বের অনেক দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে এখনও অশ্বারোহী বাহিনী আছে। আধুনিক যুগে এখন তো কেউ ঘোড়া দিয়ে যুদ্ধ করে না, কিন্তু ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।

বৃটেনে তো একটা স্বীকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজা-রাণীর কোন প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই, কিন্তু ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে রাজা-রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। তেমনি আমাদের দেশে বিয়েকে ঘিরে যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, তা ধরে রাখার পক্ষে। রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে পালকি কিংবা নৌকাকে করে পাত্র শ্বশুর বাড়ি যায়- এমন দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। কিন্তু ক্ষতির তো কিছু দেখি না। বরং এতে আছে ঐতিহ্যের গর্ব। একেকটি দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র মিলেই তো সমৃদ্ধ বিশ্বসংস্কৃতি। সুতরাং যে প্রথা সমাজের কারো ক্ষতি করে না, তা নষ্ট না করে, যা কিছু অসুন্দর ও অসম- আপাতত: সেগুলি পরিবর্তনে মনোযোগী হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

৩০ আগস্ট, ২০২০
নিউ ইয়র্ক।

শেয়ার করুন:
  • 160
  •  
  •  
  •  
  •  
    160
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.