মুখ দেখাও নির্যাতিতা, মুখ লুকাক ধর্ষক

আনা নাসরীন:

অনুন্নত, পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর রাষ্ট্রগুলোতে অসংখ্য মানুষের কাছে এখনও ধর্ষণ নিয়ে কথা বলা এক বিরাট ট্যাবু। তাই যখন কোনো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়, তখন কোনও ভিজুয়াল মিডিয়ার সম্মুখীন হলে তাদের দেখা যায় মুখ ঢেখে রাখতে, অথবা প্রযুক্তির সহযোগিতায় ভিকটিমের অবয়ব ব্ল্যার করে দিতে। আবার কখনও কখনও দেখা যায় ধর্ষিতাকে একেবারেই অন্তরালে থাকতে।

এ থেকে বোঝা যায় ধর্ষিত হওয়াকে কেবল একটি ভয়ঙ্কর নির্যাতনের শিকার না ভেবে সামাজিকভাবে এটাকে নারীর ‘সম্ভ্রমহানি’ মনে করা হচ্ছে। এক সময় ধর্ষণের প্রতিশব্দ রূপে ‘সম্ভ্রমহনন’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার হতো গণমাধ্যমেও, এখনও পর্যন্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সামাজিক মাধ্যমে এধরনের শব্দ ব্যবহার হতে দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলে এখনও ধর্ষণের শিকার হওয়া মানেই কোনও নারীর ‘ইজ্জত যাওয়া’। এ ধরনের শব্দ ব্যবহারও ভিকটিম মেয়েটির অসম্মান বোধের জন্য দায়ী। একদিকে যেমন সামাজিক চিন্তা ধারণা থেকে শব্দ ব্যবহারের সূত্রপাত ঘটে, অপরদিকে প্রচলিত সেই শব্দের ব্যবহার অব্যাহত রাখা সামাজিক মনস্তত্ত্বের উপরেও আধিপত্য করে।

আমি জানি, সবাই ধর্ষণকে নারীর সম্ভ্রমহানি বলে মনে করেন না, কিন্তু শব্দটি ব্যবহার করেন। তাদের অনেকেই এই শব্দটি ধর্ষণের এক ধরণের ইউফেমিষ্টিক শব্দ হিসাবে বিবেচনা করেন। আমাদের বোঝা উচিত ধর্ষণ শব্দটিকে নারীর প্রতি অবমাননাকর শব্দ দূরেই থাকুক, এমনকি কোন ধরণের কোমল শব্দ দিয়েই প্রতিস্থাপন করাও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। শব্দ ব্যবহারে সচেতন হওয়া জরুরি, শব্দ সমাজের ধ্যান ধারণায় প্রভাব ফেলে। ধর্ষিতার প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসার আগে আমার আলোচনার বিষয়ের সাথে পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত আরেকটি বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলে নেয়া যাক।

যখন কোনো অপরাধ ঘটে তখন কে যে অপরাধী আর কে যে ভিক্টিম তা নিয়ে অবশ্যই সংশয় রাখা প্রয়োজন। কাউকে অপরাধী বা ভিক্টিম বলে গণ্য করার জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধ প্রমাণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। এমনটি ভাবা ভীষণ অন্যায় যে নারী মাত্রই ভিক্টিম, আর পুরুষ মাত্রই ধর্ষক। নারী, পুরুষ নির্বিশেষে ব্যক্তি স্বার্থে বা ভিন্ন প্রসঙ্গে প্রতিশোধ চরিতার্থ করতে অনেক মিথ্যে অভিযোগ দায়ের হতে দেখা যায়। তাই অভিযুক্ত ব্যক্তিমাত্রই অপরাধী এরকম ধারণা পোষণ করা নিশ্চয়ই ঠিক নয়।

কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হবার আগ পর্যন্ত গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখ অবশ্যই প্রচার/প্রকাশ করা অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি অন্যায় ও ভীষণ নীতিবিবর্জিত। অভিযুক্ত যদি প্রকৃতই অপরাধী না হয়ে থাকে, তাহলে এটি তাকে সামাজিকভাবে চরম অমানবিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে। অভিযুক্ত মাত্রই যে অপরাধী নয়, এই সাধারণ বোধ-বুদ্ধিটুকু আমাদের সমাজ ও গণমাধ্যম অর্জন করুক।

ফিরে আসা যাক ধর্ষণের শিকার মেয়ের প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে মেয়েটির মুখ ঢেকে রাখার ব্যাপারটা একটি অপরাধবোধ কিংবা লজ্জাবোধের ইঙ্গিত বহন করে। যদিও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘকালের এক ঘৃণিত ইতিহাস। একজন নিরীহ মানুষ যখন যে কোনো প্রকার নির্যাতনের শিকার হয় সেটা তার জন্য কষ্টের তো বটেই, তবে লজ্জার নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু অন্য সব নির্যাতনের মতো ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিটির জন্য সমাজের সমান সহানুভূতি থাকে না। উল্টো ভিকটিমের খুঁত উদঘাটনেই উৎসুক হয়ে ওঠে জনতা, অমানবিকভাবে প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠে যে নির্যাতিতা মেয়েটিই চরিত্র ভ্রষ্টা। এ ধরনের বর্বরচিত সামাজিক নিগ্রহের শিকার হয়ে ভিক্টিম দুর্বল চিত্তের হলে অনেক সময় আত্মহননের পথ পর্যন্ত বেছে নিয়ে থাকেন, যা কখনোই কাম্য নয়। সে কারণে গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমের অবশ্যই দায় রয়েছে ভিক্টিমের মুখ ফোকাস না করার।

ভিক্টিমের বিনা অনুমতিতে তার নাম, পরিচয় বা মুখ প্রকাশ করা কখনোও কারোই ঠিক নয়। কেননা ব্যক্তিভেদে চাপ নেবার ক্ষমতাও ভিন্ন হয়। বিশেষ করে নারীদের আর্থসামাজিক অবস্থানের কারণে অনেকের পক্ষেই এই চাপ নিতে দৃঢ়তা অর্জন কষ্টসাধ্য। তবে তা কঠিন হলেও অসম্ভব মনে করার কিছু নেই। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের লক্ষ্যে নারীদেরকে নিজ দায়িত্বেই এই দৃঢ়তাটি অর্জন করতে হবে। নির্যাতিতাকে মুখ লুকিয়ে রাখা বা অন্তরালে থাকা থেকে বিরত থাকতে হবে।

অন্য যেকোনো নির্যাতনের মতোই যৌন নির্যাতনকে একটি নির্যাতন বলেই গণ্য করতে হবে। নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে অকপটে নিজেকে প্রকাশ না করে নির্যাতিতাই উল্টো যদি অপরাধীর মতো মুখ লুকিয়ে রাখে, তাতে করে সমাজের এই প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিটি বহাল থেকে যাচ্ছে যে নির্যাতিতার ‘সম্ভ্রমহানি’ হয়েছে। ভিক্টিম মুখ লুকিয়ে রাখার মানে ভিক্টিম নিজেকে সোকল্ড দূষিত বা অপবিত্র মনে করছে, সেক্ষেত্রে ধর্ষকবান্ধব সমাজ ধর্ষণের শিকার মেয়েদের দূষিত ঘোষণা করতে আরও বেশি প্রশ্রয় পায়। অথচ বলাই বাহুল্য যে লজ্জিত হবার কথা অপরাধীর, ভিক্টিমের কখনো নয়!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.