কাঠগড়ায় নারীবাদ : আমরা কী ভাবছি!

উইমেন চ্যাপ্টার:

এই মুহূর্তে অনলাইনে বহুল আলোচিত বিষয়ের একটি হচ্ছে  নারীবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত মারজিয়া প্রভার বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগ। সিলেটে এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে একটি ঘটনাটি ঘটেছে গত ৩ আগস্ট। ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে গত তিনদিন আগে। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের লেখালেখি হচ্ছে। একদল প্রভার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, আর অন্যপক্ষ শুধুমাত্র প্রভার বিপক্ষেই যে বিষোদগার করছে তা নয়, বরং এই সুযোগে বাম দল এবং নারীবাদী আন্দোলনকেও তুলোধুনো করছে। নারীবাদকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি ঘটনা দিয়ে পুরো নারীবাদী আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

গত প্রায় সাত বছর ধরে একইসাথে অনলাইনে-অফলাইনে কাজের সুবাদে যারাই আমরা প্রভার সাথে সংশ্লিষ্ট, পরিচিত, ঘনিষ্ট, যারা তাকে জানি তার কাজের প্রতি নিষ্ঠার কারণেই, সেইসব প্রতিটা মানুষের ভিতরে নানারকম প্রতিক্রিয়া হয়েছে। অধিকাংশেরই একই প্রশ্ন, কী করে সম্ভব?

তবে পক্ষে-বিপক্ষের বাদানুবাদে মূল সত্যটা বুঝে উঠতেই কষ্ট হচ্ছে।

অন্যদিকে যেভাবে একটা মহল উঠেপড়ে লেগেছে এই কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে, তাতে এইটুকু অন্তত স্পষ্ট যে ঘটনা কেবল ওই একটি রাতের একটি ঘটনাতেই সীমিত নয়, এর ডালপালা আরও বহুদূর বিস্তৃত। সেই তদন্তটুকু করার ফুরসতও কেউ দিতে ইচ্ছুক না।

বাংলাদেশে এই এক সমস্যা, কোথাও কোনো ঘটনার সাথে নারীর সংশ্লিষ্টতা পেলেই নারীবাদের কাটাছেঁড়া শুরু হয়। কাঠগড়ায় উঠে সকল নারী অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে মাঠে থাকা আন্দোলনকর্মীরা। এটা সত্য যে নারীবাদের নাম নিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি অথবা লিঙ্গভিত্তিক আইনগুলির অপব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে এ যেমন সত্য, কোন শ্রেণির নারীরা এই অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত, সেই তথ্যও তো আজ আর অজানা নয়। তাই বলে সমস্ত নারীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, নারীবাদকেই নস্যাৎ করে দেওয়া বিবেচকের কাজ নয়।

এ নিয়ে কথা উইমেন চ্যাপ্টার কথা বলেছিল দীর্ঘদিন ধরে নারী অধিকার আদায়ে কর্মরত এবং অনলাইনে সক্রিয় কয়েকজনের সাথে। তারা তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এভাবে –

মনজুন নাহার

আমি মনে করি, বাম, ডান, নাস্তিকতা, আস্তিকতা, যে আদর্শের জন্যে লড়াই করি না কেন, তার জন্য ব্যক্তিকে হতে হবে সৎ। আর আমি যদি নারী মুক্তির আন্দোলনের কথা বলি তাহলে সেটি আরও স্পর্শকাতর বিষয়। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সবসময় নারী আন্দোলন, নারীর মুক্তিকে দেখে ঘৃণার চোখে। আমরা অনেক প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শের মানুষদের মাঝেও তা দেখি। এটা কেবল পুরুষ না, নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দু’পা এগুলে তিনপা পেছাতে হয় আমাদের। পরিবার, রাষ্ট্র সবই নারীর বিপক্ষে। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে আমরা যারা কথা বলি, কাজ করি তার একটা জবাবদিহিতা থাকা দরকার। তবে তার মানে এই নয় যে, তাদের কোন ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থাকবে না। তবে আমার কাজ যদি আমার কথার বিপরীত হয় তবে তার মাশুল সবাইকেই দিতে হয়। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা বিশ্ব নারীবাদী আন্দোলনকে হেয় করার চেষ্টা করছে। যে কারনে আমরা দেখি, র‌্যাডিকেল ফেমিনিজম নিয়ে যত আলোচনা গণমাধ্যমে এসেছে, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীদের আন্দোলন সেইভাবে প্রচারিত হয়নি। এটা অবশ্যই পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি।

যে প্রসঙ্গে এতোকিছু বলা, তা যদি সংক্ষেপে বলি, তা হলো, নেশা করা সবার জন্য খারাপ। নেশা মানুষকে দিকশূন্য করে দেয়। মেধাবীরা মেধাশূণ্য হয়ে পড়ে। তার জীবনের প্রত্যেকটি জায়গায় এর ছাপ পড়ে। সুতরাং এই সুযোগ সবাই নারী মুক্তির বিরুদ্ধে কাজে লাগাবে। যৌনতা ও নেশা দুটোই চরম আকর্ষণীয় আলোচনার বিষয়। আর তার সাথে যদি জড়িত থাকে নারীবাদীর নাম।
আমার মতে, এই রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে আরো আলোচনা হতে হবে, আর কেউ যদি অন্যায় করে বা জড়িত থাকে, তাকেও এর দায় নিতে হবে। আর আমাদের দাঁড়াতে হবে সত্যের পক্ষে। নারীমুক্তির স্বার্থে কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না।

 

শেখ তাসলিমা মুন

মানুষের ব্যক্তি আচরণে কোনদিন নারীবাদ হুমকির ভেতর পড়ে না। নারীবাদ কোন আইনি বা ধর্মীয় কিতাবও না যে তা একটু সুউচ্চ আসনে আসীন থাকার জন্য। পৃথিবীর সব দর্শনই কাটাছেঁড়া হবে। একটি কথা পরিষ্কার হতে হবে, যে কোন দর্শন এক জায়গায় থেমে থাকে না। পাথরে ক্ষত বিক্ষত হয়ে সামনে এগোতে হয় ইনোভেটিভ ওয়েতে। কারণ রাজনৈতিক বা অন্তর্জগত, কোন দর্শনই এক জায়গায় থেমে থাকে না। হেগেল, কান্ট,‌ রুশো, হাইডেগার, নীটসে, কিয়ার্কেগার্ড কেউ কারও থিওরিগুলোর চুল পরিমাণ পার্থক্যগুলোর কাটাছেঁড়া করতে ছাড়েননি। বিষয়গুলো বহুল পঠিত এবং গবেষণাভিত্তিক। সে অর্থে নারীবাদও কোন হোমজেন গ্রুপ নয়। হবে কি করে? নারীর আঞ্চলিক, ভৌগ্লিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, ভাষা, কোনকিছুই একটি মাত্র গ্রুপ নয়।
জানবেন, ‘পৃথিবীর সকল মেহনতি মানুষ এক হও’ বা ‘শোষিতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম’ বা ‘ব্ল্যাক লাইফ মেটারস’ আন্দোলনগুলো নিয়ে সামনে এগুনো যতটা সহজ, নারী আন্দোলন নিয়ে সামনে এগুনো সহজ নয়। কারন নারী ঐ সকল অধিকার বঞ্চিতদেরও সাপ্রেশনের ‘বস্তু’। একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুস লড়ে রাষ্ট্র, আইন, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। আর একজন কৃষ্ণাঙ্গী নারী লড়ে, রাষ্ট্র, আইন, ধর্ম, বর্ণবাদ এবং ঐ সাপ্রেসড কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষটি সাপ্রেশনের বিরুদ্ধে। কারন সে ঐ সকল ইন্সট্যান্সের সাপ্রেশনের ‘বস্তু’! উপরের সকল ইন্সট্যান্স তার অথরিটি।
নারীর যুদ্ধটা তাই একটি মাত্র গ্রুপে সীমাবদ্ধ নয়। আর তাই এর গতি অন্য সব আন্দোলনের মতো স্পিডি হয়ে উঠতে পারে না।
এমনকি নারীবাদীরা নিজের অজান্তে পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে বিষয়গুলোতে, ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। পথ সে কারনে আরও কঠিন হয়।
এবং মানুষ যখন চিন্তাশীল এবং নেচারালি অপিনিয়ন ক্ষমতায় সমৃদ্ধ, প্রতিটি বিষয়ে মানুষের পক্ষে একমত হওয়া সম্ভবও নয়।
প্রতিটি মানুষকে নিজের একটি ন্যায় অন্যায় বোধে চলতে হয়। সেটি কম শক্তিশালী নয়। আমাদের উচিত সেটি মাথায় রেখে কাজ করা।

 

সালমা লুনা

নারীবাদীরা নিশ্চয়ই কোন দেবদূত না। তারাও ভুল করে, করতেই পারে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তির দিকে আঙ্গুল না তুলে পুরো দোষটাই নারীবাদী এক্টিভিজমের উপর কেন আসে?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর আছে। নারীকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা বহু পুরনো। নারীবাদীতায় বিশ্বাসীরা তাই কোন ভুলভ্রান্তি করলে যারা দাবিয়ে রাখতে চায় তাদের খুব সুবিধা হয়। নারী স্বাধীন হলে যাদের সমস্যা, নারী তার অধিকারটি বুঝে নিতে চাইলে যাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, নারীকে যারা ঘরের কোনে সাজিয়ে রাখার পক্ষপাতি, মূলতঃ তারাই সবার আগে এধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তারা যে সুযোগটি খুঁজছিলেন, নারীবাদকে খারিজ করে দেয়ার, সেটি তারা পেয়ে যান। একজন নারীবাদীর পক্ষেই এ থেকে উত্তরণের পথ বের করা সম্ভব।

সত্যি বলতে তাকে পথ বের করতেই হবে। কীভাবে? নারীবাদিতা যদি একটা আদর্শ হয় তাকে অবশ্যই আগে সেই আদর্শকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে হবে এবং নিজের কর্মের মধ্যে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। নারীবাদিতা মানে অবাধ যৌনতা নয়, পরকীয়ার অধিকার নয়, অনাবশ্যক গায়ের কাপড় খুলে শরীর প্রদর্শন নয়। যৌনতা বিষয়ে ট্যাবু ভাঙ্গা মানে একের পর এক শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করা নয়। স্বাধীন যৌনজীবন মানে ঘরে স্বাভাবিক লোকদেখানো দাম্পত্য, স্বামী সন্তান রেখে মাঝে-মধ্যে স্বাদ বদলের জন্য পুরুষ বন্ধুর সাথে শরীর বিনিময় নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দাম জীবনযাপনের প্রদর্শনীও কোনভাবেই নারীবাদ বোঝায় না। বর্তমানে বাংলাদেশে নারীবাদ অনলাইন এবং অফলাইনে যে প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে, সেই প্রজন্ম অনেকটাই ভুল পথে চলেছে। তাদের কাছে নারীবাদ একটা বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী জীবন, মাদক আর অবাধ যৌনাচারের সমার্থক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে নারীবাদ বোঝাতে শো অফটাই মুখ্য এখন। তাইতো শখের বশে যে নারী বাইক চালিয়ে গায়ে হলুদের দিন পার্লার থেকে মহড়া করে বাড়ি ফেরেন, তাকেই নারীবাদের প্রতীক মনে করা হচ্ছে। অথচ বহু বছর ধরে সাইকেল থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ চালাচ্ছে নারী। গ্রামের প্রান্তিক যে মেয়েটি বাইসাইকেল চালিয়ে কয়েক মাইল দূরের স্কুলে রোজ যায়, পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে যে নারী বাণিজ্যিক গাড়ি চালায় বহুবছর ধরেই, যে নারী স্বামী মারা গেলে সংসার চালাতে সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে স্বামীর দোকানে গিয়ে বসে, সে কিন্তু বর্তমানের এই শো অফ করা নারীবাদীদের হিসেবের বাইরে রয়ে যায়। এবং এই শো অফের ফলে এরাই বেশি বিপদে পড়বে। সাধারণ লড়িয়ে নারীরা, যারা নারীবাদ বোঝে না, কিন্তু শত শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রতিমুহূর্তে টিকে থাকাটা বোঝে, মাশুল দিতে হবে সাধারণ সেই নারীদেরকে।

 

সুমু হক

কোন একটা ফিলোসোফিকে যখন না জেনে, কিংবা জীবনে ধারণ না করে, শুধু মুখে মুখে নিছক ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হিসেবে কিংবা জনপ্রিয়তা পাবার জন্যে আউড়ে বেড়ায়, তখন সেখানে অনেক ফাঁক থেকে যায়। একারণেই আমরা বারবার দেখি যে নিজেদেরকে নারীবাদী পরিচয় দিয়েও অনেকেই বারবার কার্যক্ষেত্রে নারীবাদী আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করে চলেছেন এবং নারীবাদ-বিরোধীদেরকে নারীবাদকে বিতর্কিত করবার সুযোগ করে দিচ্ছেন। নারীবাদ যেমন কোন “One Size Fits All” পোশাক নয়, এর যেমন অনেক অনেক বিভিন্নরকম ধারা, বিভিন্নরকম মতবাদ রয়েছে, তেমনি পাশাপাশি এটাও সত্য যে, যে কেউ নিজেকে নারীবাদী বলে দাবি করলেই সে নারীবাদী হয়ে যায় না।
নারীবাদ মানুষে মানুষে সমতার কথা বলে, গায়ের রং, লিঙ্গ, যৌনতার প্রবণতা নির্বিশেষে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে, কোন ব্যক্তির এই সত্যটুকু বোঝার ক্ষমতা না থাকলে তাকে নারীবাদী বলা শক্ত।
যে কোন যৌন শোষণ কিংবা যৌন সন্ত্রাসের ঘটনায় দল-মত -পরিপ্রেক্ষিত নির্বিশেষে, ঘটনার শিকার ব্যক্তিটির আচরণ যেমনই হোক না কেন (ট্রমা অনেক সময়ই মানুষের স্বাভাবিক সহজাত আচরণকে প্রভাবিত করে, একথা আমরা সবাই জানি) প্রথমেই যে ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তিটির কথা চুপচাপ শুনে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তারপর বিচারের জন্যে অপেক্ষা করা উচিত, এটা সুস্থ, সাধারণ চিন্তার যে কোন মানুষের জানা উচিত।
কেউ একজন নিজেকে নারীবাদী হিসেবে দাবি করলে এই সঠিক প্রক্রিয়াটি অনুসরণ না করে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারেন না যে আদৌ সেখানে কোন যৌন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছিলো কিনা!
অর্থাৎ আমি বলবো যে নারীবাদকে তিনি কেবল মুখস্থ করা নামতার মতো পড়েই গেছেন, ধারণ করে উঠতে পারেননি!

 

আফসানা কিশোয়ার লোচন

সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা নানা মানুষের সাথে আমাদের এক্টিভিজমের কারণে সংযুক্ত। এর ভেতর যদি কেউ কোনো ‘অন্যায়’ করে, সে দায়ভার ভার্চুয়াল মিউচুয়াল হিসেবে অবশ্যই আমাদের ঘাড়ে পড়ে না। আমরা তার অন্যায়কে প্রটেস্ট করতে পারি মাত্র। কারও সম্পর্কে কোন নেতিবাচক খবর দেখলেই, তার সাথে অমুকের মিউচুয়াল কেন, এ প্রশ্ন আসলে খুব বোকা বোকা। কোন ব্যাংকার চৌর্যবৃত্তিতে সহায়তা করলে যেমন সব ব্যাংকার চোর হয়ে যায় না, তেমনি একজন নারীবাদী ডাকাতি করলে সব নারীবাদী ডাকাত হয় না”।

 

 

প্রমা ইসরাত

কমলা ভাসিনের সাথে একবার সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো, আমি উনাকে প্রশ্ন করেছিলাম যে, “এক্টিভিজমের ক্ষেত্রে, যখন আপনি এক্টিভিস্ট তখন কি আপনার লাইফ স্টাইল, মানে পোশাক আশাক, মদ সিগারেট খাওয়া এগুলো ম্যাটার করে? বা এগুলোর সাথে নারীবাদ আন্দোলনের কোন সংঘর্ষ কি আছে?
কমলা ভাসিন উত্তর দিয়েছিলেন যে, এমনিতে কার জীবন যাপন কেমন সেটা তার ব্যক্তি স্বাধীনতা, কিন্তু যদি কোন মুভমেন্ট এ কেউ এক্টিভিস্ট হিসেবে থাকে, তাহলে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। কারণ আপনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুভমেন্ট চালিয়ে নেয়া, তো সেজন্য কিছু ক্ষেত্রে সচেতন থাকাটাই দায়িত্বশীল আচরণ”G

প্রভার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে যে, সে তার বন্ধুকে একটি ধর্ষণে সহযোগিতা করেছে, অভিযোগটি কেউ থানায় করেনি, করেছে ফেসবুকে। প্রভাও ফেসবুকেই তার পালটা বক্তব্য দিয়েছে, এবং আমিও এখন ফেসবুকেই লিখছি।

সমস্যাটা হচ্ছে, “সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল”, এবং মব অ্যাটাকে কাঠগড়ায় শুধু একা প্রভাই দাঁড়ায় নি, দাঁড় করানো হয়েছে পুরো নারীবাদ আন্দোলন কে, এবং আমরা যারা নারীবাদ নিয়ে কাজ করি লেখালেখি করি তাদের, এবং নারীদের। এদের মধ্যে, প্রভা এবং তার বন্ধুদের বাম সংগঠনের সাথে সংযোগ থাকার জন্য, যারা বাম আন্দোলনের সাথে জড়িত তাদেরকেও প্রশ্ন বিদ্ধ করা হচ্ছে। অবশ্যই এখানে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী যারা আছেন তারা কমেন্ট করছেন, সেই সাথে যারা নারীবাদ বিরোধী তারাও যুক্ত হয়েছেন।

এই ঘটনা টি নিয়ে আমি অনেক আপসেট। প্রভাকে ব্যক্তিগত ভাবে কেউ পছন্দ করুক না করুক, সে নারীবাদ আন্দোলনে একটা গ্রহণযোগ্য জায়গা করেছিলো। সেক্ষেত্রে তার আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন ছিলো।

ঘটনার তদন্ত হওয়া দরকার। কারণ, এখানে প্রত্যেকের বক্তব্যই অস্পষ্ট যা আমাদের সকলকেই আরো কনফিউজড করে দিচ্ছে, আরো সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ঘটনার কোন তদন্ত না করে, ফেসবুকে পাবলিক শেমিং করা এটাই প্রমাণ করে যে, অভিযোগকারীর উদ্দেশ্য শুধুই ফেসবুকে সম্মানহানী করা, নয়তো এই ইস্যু কে কাজে লাগিয়ে কোন “ফায়দা” হাসিল করা।
ধর্ষণ একটা ফৌজদারি অপরাধ, এর অভিযোগ এনে, আপোষ মীমাংসা করে ফেলা বা এটাকে উছিলা করে ব্ল্যাকমেইল করা এগুলোও অপরাধ।
আমি চাই ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত হোক, এবং অপরাধ ঘটলে তা অনুযায়ী আইনী পদক্ষেপ নেয়া হোক।

ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এটা আদালত না।
বিচারবিহীন ও বিচারবহির্ভূত আচরণের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.