বাইক রাইডার মেয়ে, শ্বশুরের দেয়া মোটর সাইকেল – রোকেয়ার নারীস্থান?

সুচিত্রা সরকার:

প্রথমে দেখনদারি। অতঃপর গুণবিচারী।
ভালো লেগেছিলো বাইক চালানো বিয়ের কনেকে দেখে। কী সুন্দর, বাইক চালিয়ে কনে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি! পরে জানলাম, শ্বশুরবাড়ি নয়, পার্লার থেকে নিজ বাড়িতে, গায়ে হলুদের দিন।

তাও ভালো।

যে দেশে আজও বিয়ে মানেই মেয়েপক্ষের গাদা গাদা যৌতুক (যে যৌতুক দেয় না, তাকে বিবিধ উপায়ে অপমানের মধ্যে রাখা হয়), যে দেশে বিয়ে মানে গা ভর্তি গহনা, বিয়ে মানেই বর যেমনই হোক, মেয়েটিকে পরীর মতো হতে হবে (পার্লারে গিয়ে বিয়ের কনে শুধু শুধু টাকা দেয় না), যে দেশে আজো বিয়ে মানেই ঘরে একজন সেবাদাসী আনা, যে দেশে বিয়ে না হলে প্রকারান্তরে মেয়ের পরিবারকে একঘরে করে দেয়া হয়, সে দেশে একটা মেয়ে বাইক চালিয়ে মিউজিক বাজিয়ে রাস্তায়, সেই দৃশ্য তো ‘পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা’।

চৌদ্দ আনা তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি!
‘সময় নিউজ’ একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছে মেয়েটির। যার শিরোনাম, বাইক চালানো মেয়েটিকে শ্বশুর মোটর বাইক উপহার দিয়েছে।

দরাম করে নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখা ‘তৃতীয় নয়ন’ বন্ধ হয়ে গেল।

বেগম রোকেয়া আঠারোর শতকে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ লিখেছিলেন। যুগটা তখন ভয়ংকর ছিল নারীর জন্য। স্বাধীনচেতা নারী এরকম ভয়ংকর স্বপ্ন দেখতেই পারেন— নিজের অবদমিত ইচ্ছা পূরণ করতে! পুষে রাখা রাগের বন্দুকে বারুদ ভরতে ভরতে!

কিন্তু রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বাস্তবায়ন আমি চাই না। যে দেশের পরতে পরতে এই কথাটা লেপ্টে আছে যে, ঘরের হাঁড়িপাতিল ধোয়া, ঘর ঝাড়ু, রান্না—ইত্যাকার কাজ মেয়েদের, সে দেশে ছেলেদের এ কাজ করিয়ে দেখুন! তার বদলে মেয়েরা কেবল বাইরে রোজগার করুন!

ছেলেরা করবে ঘরের কাজ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকবে (মেয়েরা এখন যেমন ফুঁসছে)। সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে তারা। তারাও এরপর করবে পুরুষমুক্তির আন্দোলন।
দেখুন না, এখনই কেমন বিশ্ব পুরুষ দিবস পালন হচ্ছে (নারী দিবসের মূল মাজেজা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে তারও আগেই)।

তো, ব্যাপারটা কি এমন যে, এক লক্ষ বছর নারীরা মুক্তি চাইবে, পরের লক্ষ বছর পুরুষরা? সেটা একদমই বিবেচক আর সুসমাজ নয়।

ঘর বাহির, নিয়ম আচার, সকল কাজ সবার হতে হবে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে।

তাই যখন দেখলাম বাইকে চালানো মেয়েটিকে বাইক দিচ্ছে শ্বশুর, কেমন যেন যৌতুক যৌতুক মনে হলো। কত মেয়ের বাবা, পাত্রপক্ষকে মোটর সাইকেল, ট্রানজিস্টার দিতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়েছে।

বলতে পারেন, মেয়েটির কাজের সমর্থন করতেই শ্বশুর এই কাজ করেছে। সে জন্যই প্রতিবেদন।
আচ্ছা যদি সমর্থন না থাকতো? যদি শ্বশুর নাখোশ হতো?

প্রতিবেদনটা মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। নারীমুক্তির তৃতীয় নয়ন খুলে পড়লাম। নাহ! যা খুঁজছিলাম, তা পেলাম না বাইক চালানো মেয়েটার মাঝে। সেটা হচ্ছে প্রচলিত সমাজের বাইরে গিয়ে কিছু করা। সে বলছে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। তারা আগে থেকে জানতো। স্বামীরও কোনো আপত্তি নেই বাইক চালানোতে।

চলমান স্রোতের ভাবনা একেই বলে! তাদের ‘আপত্তি’, তাদের ‘মেনে নেয়া’ এই সমাজে এখনও অনেক বড় ব্যাপার।

আচ্ছা, যদি শ্বশুরবাড়ির লোকজন স্বাভাবিকভাবে না নিতো? যদি তারা আগে থেকে না জানতো বাইক চালানোর বিষয়টি? বা যদি স্বামীর আপত্তি থাকতো? কী করতেন তিনি?

বিপ্লব? বিদ্রোহ? যেকোনো উপায়ে বাইক চালানো জারি রাখা?

কী হতে পারতো তা বলা যাচ্ছে না, যেহেতু তার শ্বশুরবাড়ি বিষয়টা মানছে।

সুতরাং দিল্লী দূর অস্ত, বইনগো, দিল্লী দূর অস্ত!

২৭.৮.২০২০
দুপুর ৩.১২ মিনিট
লমোদা লেন

শেয়ার করুন:
  • 669
  •  
  •  
  •  
  •  
    669
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.