নারী, আশার প্রদীপটি জ্বালিয়ে রাখতে হবে

বাসন্তি সাহা:

শ্রাবণ শেষে বৃষ্টি নেই আমার ব্যালকনিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে রোদ্দুর। আমি শুয়ে শুয়ে কবিতা পড়তে পড়তে রোদ্দুরে আলো ছায়ার খেলা দেখছিলাম গতকাল। তারপর রোদে পোড়া দুপুর জুরিয়ে যখন শান্তি শান্তি বিকেলে নেমো এলো তখন আমি জানালায় দিকে তাকিয়ে গান শুনেছি।

গতকাল দিনটি আমি নিজের মতো করে কাটিয়েছি। একদম নিজের মতো। ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে গান শুনেছি। গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম থেকে উঠে রুক্ষ, ক্লান্ত হাত দুটো মেনিকিউর করেছি। অনেক যত্ন করে লোশন লাগিয়েছি। হাত দুটোকে বলেছি, আজ ভালো থেকো তোমরা। ক্লান্ত হতাশ পা দুটোকে বলেছি, বালিশের ওমে শুয়ে থাকো আজ। চোখ দুটোকে বলেছি, যখনই ঘুম আসবে তখনই ঘুমিয়ে পড়বে। কিছু ভাবার দরকার নেই। তারপর উঠে খেয়ে আবার কবিতার বই নিয়ে বসেছি।

কাল সারাদিন আমি কিছু করিনি। যখন বাচ্চাদের খাওয়াতে ওর বাবা হিমশিম খাচিছল তখনও আমি কবিতায় ডুবে ছিলাম। উঠে গিয়ে আর এককাপ চা নিয়ে এসেছি। ফিরে দেখিনি। আমার প্রতিদিনের সংসার যা নিয়ে সারা দিনরাত আমি ব্যস্ত থাকি, তা থেকে একদিনের ছুটি নিয়েছিলাম আমি গতকাল।

প্রতিটি নারী যদি মাসে অন্তত একদিন নিজের মতো একদম নিজের মতো করে কাটাতে পারতো! কেবল একটি দিন। নাকি স্বামী সন্তানের কষ্ট সহ্য হবে না ভেবে দৌড়ে গিয়ে রান্নার খুন্তি হাতে নিয়ে নেবে, অথবা বাচ্চারা একদিন ঠিকমতো না খেলে বুক ফেটে যাবে, ভাববে চুলোয় যাক গান শোনা, কবিতা পড়া, বাচ্চারা বরং পেট ভরে খাক। স্বামী দুপুরের পর একটু ভাতঘুম দিক ছুটির দিনটাতে। আমরা নিজেরাই কী মাঝে মাঝে মেরে ফেলি না নিজেদের ছোট ছোট ইচ্ছেগুলোকে?

মা মেয়েকে টিফিন বানিয়ে দেয় দু’ ধরনের স্কুলের পর কোচিং করে ফিরবে! মেয়ে বলছে, রোজ রোজ কি একই খাবার খাওয়া যায়? মা বেচারি ইউটিউবে দেখে চেষ্টা করে নতুন কিছু করার। স্বামী অফিসে যাবে। সব গুছিয়ে দিয়ে শেষে জুতোটাও পালিশ করে পায়ের কাছে এগিয়ে দিয়ে প্রথম থেকেই ভালো বউ হবার চেষ্টা করি! রাতেই জিজ্ঞেস করে রাখি কাল কী খাবে? কী রান্না করবো? সংসারে সবাইকে ভালো রাখার দায় যেনো জন্ম থেকে নিয়ে এসেছি আমরা।

আমাদের মা গরিব প্রজার মতো দাঁড়াতো বাবার সামনে,
কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ করে উঠতে পারতো না।
আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে মাকে আপনি বলার কথা আমাদের
কোনোদিন মনেই হয়নি। (হুমায়ুন আজাদ)

আমার একবন্ধু তার কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে নিজের পছন্দে কখনো রান্না করতে পারেননি। সে যে বাড়িতে তার মায়ের হাতের রান্নাগুলো খেতো, তা করতে পারেনি এ সংসারে। আর সবকিছু ঠিক আছে, কার কাছে গিয়ে বলবে আমার দুঃখ একটাই নিজের মতো করে নিজের পছন্দের রান্না আমি করতে পারি না। আর একজন কবিতা পড়তে পারে না। বাবা–ছেলে কেউ কবিতা পড়া পছন্দ করে না। একথা কাকে বলবে সুয়োরানীর দুঃখের মতো! নিজে কলসী কাঁখে জল আনতে পারে না। এটাই তার দুঃখ। মানুষ গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসবে। এটা আধুনিক মেয়েদের ঢঙ। স্বামী যা চায় তাইতো রান্না করবে। কবিতা পড়া পছন্দ না করলে পড়ার দরকার কী? এটা কি শাড়ি -জামা যে পরতেই হবে?।

আর যৌন জীবনের বঞ্চনা, সেখানে তো বিশাল ট্যাবু। কথাই বলা যাবে না। তুমি অক্রিয় না থেকে সক্রিয় হও। কিন্তু তোমার নিজেরটা নিয়ে কিছু বলো না। সমস্ত বিশ্বাস ভেঙেচুরে যাবে। তুমি খারাপ চরিত্রের মেয়ে হবে। তোমাকে মনিটর করা হবে। সহ্য করো। না হলে ধরণী দ্বিধা হও বলে পাতালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানার হাসবেন্ড যখন তার চোখ নষ্ট করে দিলো, অনেক পুরুষই বলেছে, হাসবেন্ড যখন চায় না তখন তার উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার দরকার কী? যেন উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে হাসবেন্ডের কথা শোনেনি বলে চোখে নষ্ট করে দেয়া ঠিকই আছে। স্বামীর এই কাজ কাজ করার একটা যথাযথ কারণ আছে।

আমরা নিজেরাই যেনো নিজেকে কোথায় ছোট করে নেই মাপে। কাজ করতে গিয়ে এক নারীর সাথে পরিচয়। ভাতের হোটেল চালাচ্ছেন। রান্না করছেন। খাওয়াচ্ছেন। বাজার কোনটা কী লাগবে হাসবেন্ডকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আবার টাকা-পয়সার হিসেবও রাখছেন। এর মধ্যে জামা পরিয়ে বই খাতা ধরিয়ে ছেলেকে স্কুলেও পাঠালেন। খেতে খেতে দেখছিলাম। খাওয়া শেষে উঠে হাত ধুয়ে তার কাছে গিয়ে বললাম। খুব তো দশভুজার মতো সব সামলাচ্ছেন, দেখেও কত ভালো লাগছে। কথাটা শুনে লজ্জার হাসি দিয়ে বললেন, ওর বাবাই সব করে। আমি মাঝে মাঝে রান্না করে দেই একটু। মনে মনে ভাবলাম, রান্নাই আপনার কাজ, বাকি যেগুলা করছেন তা কেবলই হাতে হাতে একটু এগিয়ে দেওয়া।

নারী, তুমি নিজে কবে তোমার সম্মান নিজে তুলে নিতে শিখবে? কেউ তোমাকে হাতে ধরিয়ে দেবে ছেলের হাতের মোয়ার মতো! কখনও নয়।

ও আমার দূরবর্তী মেঘ
দেখেছো কী পাখির মতো মেয়ে
জলের কাছে নিভৃতে তার চাওয়া
ডানার নিচে একটুখানি হাওয়া। (সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়)

নারীরা হবে কোমল পেলব। তারা খেলাধুলো করবে না। তারা রান্না করবে, সাজবে পায়ের নখ থেকে চুল পর্যন্ত। তাই মাঝে মাঝে দুএকজন ছালমা খাতুন আর মাবিয়া খাতুন উঁকি দিয়ে গেলেও ফেসবুকের পেজ ভরে উঠছে কেবল রান্না, মেকাপ শেখানো আর শাড়ি বিক্রির পেজে। মাঝে মাঝে নারীদের নিজের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জুডো, কারাটে, তায়কোয়ান্দে শেখানোর কথা হলেও সেটা কেবল একটা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। তবে নারীরা আজকাল ইয়োগার দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই, তবে তা কতটা নিজেদের আত্মশক্তিতে বলিয়ান করার জন্য সেটা নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে।

নারীর শ্রম এখনও গৃহশ্রমে বা অসংগঠিত খাতে নিয়োজিত। ২০১৬-১৭ সালের শ্রমজরিপে দেখা যায় অসংগঠিত খাতে ৯১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী নিয়োজিত। কৃষিখাত এখনও নারী নিয়োজনের প্রধান জায়গা। নারী শ্রম নিয়োজনের ১৮ দশমিক তিন শতাংশ হচ্ছে কৃষিখাত ও ৫ দশমিক ২ শতাংশ শিল্পখাতে এবং মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ সেবা খাতে। অর্থাৎ নারী শ্রমের বিপুল অংশই সংসারে অগণিত থাকছে। যার কোনো বিনিময় মূল্য নেই। যদিও পরিকল্পনা মন্ত্রী তার ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, দেশে উপার্জন শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশই নারী। কিন্তু এই শ্রমশক্তি অসংগঠিত খাতে নিয়োজিত। ফলে সংসারে তার কোনো কাজ নেই। নারী নিজেও মনে করে সে কিছু করে না।

প্রতিদিন জল তোলে, ঘর মোছে,
খাবার বানায়
হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে রাত হলে
ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে
সেও কি শ্রমিক নয়! (মল্লিকা সেনগুপ্ত)

নারীর এগিয়ে চলার পথ হবে মোম মসৃণ এটা ভাবার অবকাশ নেই, কিন্তু আশার প্রদীপটি জ্বালিয়ে রাখতে হবে, সেটা যতই টিম টিম করে হোক না কেন। নারী আপন নীড়ের খোঁজে প্রতিবাদী হোক। খুব খুব ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো, আনন্দগুলোকে মেরে না ফেলে উদযাপন করুক নিজের মতো করে। নিজের জীবনের ক্যানভাসটাকে নিজেই নিজের মতো করে রাঙিয়ে তুলুক রঙ ও রেখায়।

প্রকল্প পরিচালক
দর্পন সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র। ঢাকা।

শেয়ার করুন:
  • 415
  •  
  •  
  •  
  •  
    415
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.