এই লজ্জা কার?

আলমগীর কবির কুমকুম:

একটু চিন্তা করে বলবেন এটা কোন যুগ? এই যুগে কি কোন মানুষের লাঠিয়াল বাহিনী রাখার প্রয়োজন পড়ে? আশা করি এই সভ্য যুগে কোন ব্যক্তির লাঠিয়াল বাহিনী রাখার প্রয়োজন পড়ে না এমন কথাই বলবেন আপনারা। একজন চেয়ারম্যান কত টাকা সম্মানী বা ভাতা পেয়ে থাকেন সরকারের কাছ থেকে? একজন চেয়ারম্যান এর একটি লাঠিয়াল বাহিনী রাখার প্রয়োজন কী? সেই চেয়ারম্যান এমন কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন যেখানে তার নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করে রাখতে হবে? আর সর্বোপরি কথা হচ্ছে এই লাঠিয়াল বাহিনীর পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে, সেই অর্থ তিনি কোথা থেকে পান?

আমি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং-এ গরু চুরির অভিযোগে কোমরে রশি বেঁধে এক মা ও মেয়েকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে সেই নির্যাতন প্রসঙ্গে কথা বলছি। গতকাল রাতে উক্ত এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম ও তার লাঠিয়াল বাহিনীর গল্প জানতে পারলাম। ইতোমধ্যে এই ইউপি চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম ফেসবুকে একটি লাইফ করে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যাচার করেছেন। সেই লাইভ ভিডিওটি আমি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে দেখেছি। এখানে আমার প্রশ্ন রয়েছে, প্রশ্নটি হচ্ছে পুলিশ এসে সেই মা ও মেয়েকে উদ্ধার করে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল এমনটাই জানা যাচ্ছে, কিন্তু পুলিশ কেন চেয়ারম্যান ও সেই লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন না? তাহলে কি এই চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম-এর কোন ক্ষমতার উৎস রয়েছে? যে কারণে পুলিশ বাহিনী তাকে ভয় পেয়ে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

এরপরে যে প্রশ্নটি আসে সেটি হচ্ছে একজন ইউপি চেয়ারম্যান কিভাবে একটি গ্রামে নিজস্ব আদালত বসিয়ে বিচার-সালিশ করে সামাজিকভাবে এদেশের সাধারণ নাগরিকদের হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে? এ দেশে কি এমন কোন আইন আছে যে একজন চেয়ারম্যান বিচার সালিশ করে কারো বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দন্ড বা ছাড়া পাবার জন্য কোন অর্থদণ্ড বা জরিমানা করতে পারে ? অথবা এ দেশে কি এমন কোন আইন রয়েছে যে আইনের মাধ্যমে একজন ইউপি চেয়ারম্যান কোন ব্যক্তিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে পারে ?

এর পরে গত রাতেই আরেকটি পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন এ “ধরনের ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক, এবং হৃদয়বিদারক ঘটনা, তদন্ত সাপেক্ষে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু একটি জিনিস এখানে খেয়াল করে দেখতে হবে, চলতি বছরে বাংলাদেশে কিন্তু এ ধরনের বিচার সালিশের নামে বিভিন্ন অঞ্চলে এধরনের ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক বেশ কিছু মানুষকে নির্যাতনের ঘটনার কথা জানা যায়।

কিছুদিন আগেও সাতক্ষীরা জেলার এক ইউপি চেয়ারম্যানের নির্যাতনে এক বাবার মৃত্যুর সংবাদও আমরা পেয়েছি। সেই ঘটনাটি ছিল যে ব্যক্তি ইউপি চেয়ারম্যানের নির্যাতনে মৃত্যু বরণ করে তার সন্তান সেই ইউপি চেয়ারম্যানের মাছের ঘেরে চুরি করে মাছ ধরতে গিয়েছিল এমন অভিযোগে তাকে নির্জাতন করা হয়। যে ঘটনাটি স্থানীয়রা মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। সেই ঘটনায় সেই ছেলেকে ইউপি চেয়ারম্যান ও তার দলবল ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করতে থাকে। এমতাবস্থায় মৃত ব্যক্তি তার সন্তানকে ইউপি চেয়ারম্যানের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য ছুটে যায়। কিন্তু ছেলেকে বাঁচাতে পারলেও তার জীবন রক্ষা পায়নি।

এসব বর্বোরোচিত ঘটনাগুলোর খবরে আসলে সমাজে বিভিন্ন ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির প্রভাব তৈরি করে ফেলছে। মূলত এ সমস্ত ইউপি চেয়ারম্যান কারা ? তারা কি জনগণের বন্ধু নাকি জনগণের শত্রু ? এরকম প্রশ্ন উঠে এসেছে অনেকের মাঝে। আমার জানামতে এদেশে ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য কোন প্রকার যোগ্যতার প্রয়োজন আছে বলে কারো জানা নেই, তবে এটুকু জানি শুধু মাত্র বাংলাদেশের নাগরিকত্ব থাকলেই যে কেউ একজন ইউপি চেয়ারম্যান হতে পারে। এদের নেই কোন অরিয়েন্টেশন। ভাবটা এমন যে একবার চেয়ারম্যান ইলেকশন করে পাশ করতে পারলে অথবা চেয়ারে বসতে পারলে সে যেন রাজ্যের ক্ষমতা হাতে পেয়ে গেলো। এদের বেশির ভাগই আবার জনগণের ভোট চুরি করে সেই চেয়ার দখল করে থাকে।

লেখক

মন্ত্রীমহোদয় মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আপনার কাছে দুইটি প্রশ্ন রইলো, এই যে আপনি বলেছেন তদন্ত করা হবে এবং দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে এই দুইটি শব্দের মাঝে কতটুকু দূরত্ব রয়েছে তা আমাদেরকে জানালে একটু ভালো হয়? আপনারা কাদের জন্য অপেক্ষা করছেন সেটা আমাদের জানা জরুরি? কারণ পুলিশ সদস্যরা নির্যাতিত মা ও মেয়েকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেও এমন জঘন্য ঘটনার সাথে জড়িত সেই চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যানের লাঠিয়াল বাহিনীকে কেন পুলিশ ছেড়ে দিয়ে আসলো? এই ঘটনা কি তদন্তের বাইরে বলা যায়? আপনারা দ্রুত তদন্ত করবেন ঘটনার নিষ্পত্তি করবেন বলে জানালেও যেহেতু পুলিশ ইউপি চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম ও তার লাঠিয়াল বাহিনী কে ছেড়ে দিয়ে এসেছে তাহলে সেই সমস্ত পুলিশদের বিরুদ্ধেও আপনার তদন্ত করা জরুরি। এটা অবশ্য জানা প্রয়োজন কেন সেই পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে মা ও মেয়েকে উদ্ধার করলো আর ইউপি চেয়ারম্যান ও তার লাঠিয়াল বাহিনী কে ছেড়ে দিল?

ফেসবুক সোশ্যাল মিডিয়া আমি তো আর অল্প কিছুদিন ব্যবহার করছি না, লেখালেখির বয়সটাও চলতি বছরে হিসেব করে দেখলাম কম হলো না। তাই অন্তত এটুকু বলতে পারি সোশ্যাল মিডিয়াতে এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদের ভিত্তিতে শেষ পর্যায়ে কী ঘটে সেটাও আমার জানা আছে। হয়তো অভিযুক্ত এই চেয়ারম্যান এভাবে প্রতিবাদ চলমান থাকলে একদিন গ্রেফতার হবে জানি। আদালতে যদি অভিযুক্ত এই চেয়ারম্যান এবং তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সেগুলো প্রমাণিত হয়, তাহলে হয়তো তাঁর জেল অথবা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে তাকে দণ্ডিত করা হতে পারে।

কিন্তু কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছেন একজন মা এবং তার মেয়ের উপরে এই যে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন, এইযে পৈশাচিক বর্বরতার সেই সাথে তারা যে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো, তার ক্ষতিপূরণ তাদেরকে দেওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। আমি জানি না কতকাল সেই মা আর সেই মেয়ে এই লজ্জা বয়ে বেড়াবে। আরেকবার ভেবে দেখুন এই লজ্জা কি শুধু সেই মা আর সেই মেয়ের নাকি এই লজ্জা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.