পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং নারী জীবনের বাস্তবতা

সুমাইয়া ইসলাম তিথি:

সমাজ নারীর জীবনকে যেন সম্পর্কের দায়িত্বের ছকে বেঁধে দিয়েছে। সম্পর্কের পরিচর্যার দায়িত্ব সবসময় নারীর কাঁধেই দেয়া হয়। সমাজের প্রচলিত প্রবাদ “সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে” সংসারকে একই সুতোয় বেঁধে রাখতে নারীর উপরই যেন গুরু দায়িত্ব। পুরুষের দায়িত্ব কি শুধুই ভরণপোষণ? সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব যেকোনো স্বাবলম্বী নারীও তো নিতে পারে। তবে কেন সাংসারিক দায়িত্বগুলো একজন পুরুষ নিতে পারে না?

নারী হয়ে জন্মেছে বলেই ধরেই নেয়া হয় তার সুখ, স্বপ্ন, সম্মান, অপমান, পছন্দ থাকবে না। আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন স্বনির্ভর নারীকেও যেকোনো কাজে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবার বা স্বামীর অনুমতি নিয়েই করতে হয়। তাই সমাজে ছেলেরা বিয়ে করে আর মেয়েদের বিয়ে হয়।শি্ক্ষা, বিয়ে কিংবা পেশা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় কম স্বাধীনতা ভোগ করে।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় বিয়ের পর একজন নারীকেই তার পরিবার ছেড়ে অজানা লোকজনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। সামাজিকীকরণের সময় কন্যা সন্তানের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় মানিয়ে নেয়ার চর্চাটি। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নারীকে সবসময় সজাগ থাকতে হয় বিভিন্ন সম্পর্কে যেমন মা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, বাড়ির বৌমা হিসেবে, ভাবী হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে। ধরেই নেয়া হয় একজন বিবাহিত নারী তার বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়ির যত্ন ও সেবা করবেন। কিন্তু একজন বিবাহিত পুরুষের কাছ থেকে কি কখনো প্রত্যাশা করা হয় তিনি তার স্ত্রীর বাবা মায়ের খেয়াল রাখবেন? সমাজ কখনও পুরুষদের উপর এ দায় চাপিয়ে দেয় না। বরং যদি কোন পুরুষ স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব নেন তিনি সমাজের চোখে মহানুভব হয়ে ওঠেন। কিন্তু সংসারে একজন বৌমার দায়িত্ব হচ্ছে তার শ্বশুরবাড়ির সকলের খেয়াল করা। একজন কর্মজীবী নারীর ব্যস্ততার জন্য যখনই এ দায়িত্ব পালনে সামান্য ত্রুটি দেখা দেয়, তখনই সমাজে নিন্দার ঝড় ওঠে।

বিয়ের পর কর্মজীবী নারীদের সম্মুখীন হতে হয় এক নতুন বাস্তবতার। অনেক শাশুড়ি ঘরের বউকে দিয়ে চাকরি করাতে রাজি হন না। কারণ ধরে নেয়া হয় বাইরের কাজের চাপে সংসারে কাজগুলো করতে পারবে না। তাই অনেক নারীকেই চাকরি ছাড়তে চাপ দেওয়া হয়।

২০১৮ সালের সরকারি জরিপ মতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৬.৬৯ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। তবে এই মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৪৫.৪৯ শতাংশই এখনো রয়ে গেছে জাতীয় উৎপাদন ক্ষেত্রের বাইরে। যাদের সিংহভাগই নারী। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে নারী বৈষম্যের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর এসেছে ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা খুবই নিচের দিকে।

এতে আটটি সূচকে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের মেয়েদের পরিস্থিতি। সেখানে যেমন রয়েছে সম্পত্তির অধিকার, বিয়ে করা, বা সন্তান নেয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতর বিষয়, তেমন রয়েছে যে কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি লাভের সুযোগের মতো দিকগুলো।
সংসার নির্বাহের খরচ যেমন শুধু পুরুষদের উপরই চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়। তেমনি সাংসারিক কাজ বা শ্বশুর শাশুড়ির যত্ন নেয়ার দায়িত্ব শুধু নারীর একার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। ভরণপোষণ হোক বা অন্য পারিবারিক কাজ নারী-পুরুষ উভয়কেই দায়িত্বগুলো সমান ভাগে ভাগ করে নিতে হবে।

আমাদের সমাজে প্রায়ই হা-হুতাশ করা হয় যেসব পরিবারে পুত্র সন্তান নেই, বার্ধক্যে পিতামাতাকে কে দেখবে। আবার যখন নারীর সাবলম্বী হয়ে বাবা মায়ের অবলম্বন হয়ে উঠতে চায়, তখন এই সমাজ বিভিন্নভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিবাহিত স্বাবলম্বী নারী যখন তার নিজ বাবা মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে চান, তখন স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিষয়টি মানতে চায় না। এমনকি কখনো কোন বিবাহিত মেয়েকে দেখেছেন ইদ, পূজা কিংবা কোন উৎসবে বাপের বাড়ি এসে উদযাপন করতে? স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে ধরেই নেয়া হয় উৎসবের দিনগুলোতে বিবাহিত একজন নারী শ্বশুরবাড়িতে থেকেই উৎসব উদযাপন করবেন। একজন পুরুষ যদি তার বাবা মায়ের ভরনপোষণের দায়িত্ব নিতে পারেন, তবে তারও উচিত তার স্বাবলম্বী স্ত্রী যাতে তার নিজ বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারেন এ ব্যাপারে সহায়তা করা।

বাংলাদেশে পিতামাতার ভরণপোষণ সংক্রান্তে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মা-বাবারা সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ লাভের আইনি অধিকার লাভ করেছেন, যা ক্ষুণ্ন হলে যেকোনো মা-বাবা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন। ‘সন্তান’ অর্থে বুঝানো হয়েছে পিতার ঔরসে এবং মাতার গর্ভে জন্ম নেওয়া সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যা; কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় এবং গণমাধ্যমে আইনটিকে একপাক্ষিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। শুধুমাত্র ছেলে সন্তানদের দায়িত্বগুলো ফলাও করে প্রচার করছেন। তেমনি বলা হচ্ছে যেসব পুত্রবধূ শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকতে চায় না তাদের জন্য এ আইনটি নাকি অশনিসংকেত। কিন্তু আইনে স্পষ্ট বলা আছে পিতামাতার ভরণপোষণ না দিলে সন্তান অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবে; বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে।
এবং সন্তানের স্ত্রী, বা ক্ষেত্রমতো স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোন নিকট আত্মীয় ব্যক্তি এ কাজে বাধা দিলে তিনিও সমদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

শুধু নারীর স্বাবলম্বিতাই নয়, বিবাহিত নারী যেন বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে পারে বা নিতে শেখে সে ব্যাপারে সামাজিক দৃষ্টভঙ্গি বদলাতে হবে এবং শ্বশুর বাড়ির লোকজনদের সহযোগী মনোভাব পোষণ করতে হবে।

শুধু অর্থনৈতিক নয়, নিজ শরীর ও গর্ভধারনে নারীরা তেমন স্বাধীনতা পায় না। সংসারের শুরু থেকেই নারীর উপর সন্তান নেয়া বা গর্ভধারণ ধারনের জন্য এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়।কিন্তু একজন নারী যখন শারীরিক ও মানসিক ভাবে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত থাকে, ঠিক তখনই সন্তান নেয়া উচিত।

এমনকি সন্তান জন্মের পর তার লালনপালনের দায়িত্ব পুরোটাই মায়ের কাধেঁ নিতে হয়। এমনকি এ দায়িত্ব পালনে অনেক কর্মজীবী নারীদের চাকরি ছাড়তে হয়। কিন্তু সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব যেমন শুধু বাবার একার দায়িত্ব না, তেমনি বাচ্চার লালন পালন ও যত্ন নেয়ার দায়িত্বও মায়ের একার না। কারণ সন্তানটি কারও একার নয়। বরং সন্তানের বাবার উচিত এই সময়গুলোতে মা এবং সন্তানের যত্ন করা। সন্তানের দায়িত্বটি সমবন্টন করে নিলেই বাবা মা দুজনেই শিশুর যত্নের পাশাপাশি তাদের নিজ নিজ কর্মজীবনে বহাল থাকতে পারবেন।

সংসার বা সম্পর্কে নারী থেকে কেবল ত্যাগ, ধৈর্য, মানিয়ে নেয়া, সহনশীলতাই প্রত্যাশা করা হয়। একসময়ের ঘৃন্য সতীদাহ প্রথা বাতিল হলেও বর্তমান যুগে এসেও সমাজ প্রত্যাশা করে স্বামীর মৃত্যু মানেই একজন নারী সমস্ত সুখ স্বপ্ন বিসর্জন দিবেন। স্বামীর স্মৃতি আগলে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বাকি জীবন একাকি কাটিয়ে দিবেন। বাকিটা জীবনের একাকিত্ব যেন তার ভবিতব্য। নারীকে একাই সংগ্রাম করে যেতে হবে।
কিন্তু একজন বিপত্নীক এর ক্ষেত্রে সমাজের ভাবনা কি একই? না। তখন সমাজের ভাবনা একজন পুরুষ কী করে বাকিটা জীবন একা কাটাতে পারে! অন্তত সন্তান লালন-পালনের জন্য হলেও তার আরেকটা বিয়ে দরকার। দ্বিতীয় স্ত্রী বা সৎ মায়ের কাছ থেকে সমাজের প্রত্যাশার মাত্রাও যেন দ্বিগুণ। সৎ মা চরিত্রটাও আমাদের সমাজে নেতিবাচকভাবেই তুলে ধরা হয়। আশা করা হয় সৎমা অত্যন্ত স্নেহে তার স্বামীর প্রাক্তন স্ত্রীর সন্তানদের লালন পালন করবেন। কিন্তু সমাজ কখনোই প্রত্যাশা করে না একজন পুরুষ তার স্ত্রীর প্রাক্তন সংসারের সন্তানদের লালন পালনের ভার নেবেন। এ নিয়ে সমাজের কোন মাথাব্যথাও নেই। সমাজ কেবল নারীকে নেতিবাচক চরিত্রে উপস্হাপনে ব্যস্ত।

সমাজব্যবস্থা শুধু নারীর উপর করণীয় ও দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়। কিন্তু কখনো নারীর অবস্থান ও নারী জীবনের বাস্তবতা বুঝতে চায় না। নারীর প্রতি অন্যদের দায়িত্ব কী এ নিয়ে কোথায়ও কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর, বাড়ির মেয়ে, বৌমার প্রতি করণীয় সম্পর্কে আইন,ধর্ম, সমাজব্যবস্থায় সর্বত্রই ধোঁয়াশা। নারীর প্রতি হওয়া অসঙ্গতি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। এক্ষেত্রে নারীকে প্রথমেই নিজেকে পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত করতে হবে। নিজ পরিবারে নারীর সাথে হওয়া অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে।

লেখক পরিচিতি:

সুমাইয়া ইসলাম তিথি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.