করোনায় ‘নিউ নর্মাল’

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

সাল ২০২০, আমার পিএইচডির শেষ বছর। গত বছরের শেষের দিকেও পরিকল্পনা ছিল সব ছেড়েছুঁড়ে নিজের কাজে মন দেবো। জানুয়ারি থেকে আমার মেয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করবে। সেই হিসেবে আমার হাতে ম্যালা সময় থাকার কথা। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মেয়ে যদি স্কুলে থাকে, আমি একটা কেন দুইটা পিএইচডি থিসিস নামায় ফেলবো- এমনটাই চিন্তা ছিল আমার। কিন্তু যেমন চাওয়া তেমন পাওয়া হলো না। বছরটা শুরুই হলো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। কথায় আছে না, “অভাগী যেদিকে যায় সাগর শুকায় যায়”।

অস্ট্রেলিয়া জুড়ে হঠাৎ করে লকডাউন হয়ে গেল, যাকে সহজ বাংলায় আমি বলি গৃহবন্দী জীবন। ১০০ বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লুয়ের সময় অস্ট্রেলিয়া যেসকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, সেটা অনুসরণ করে সামাজিক দুরত্ব বজার রাখার লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ, চার্চ সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ হয়ে গেল। মেয়ের স্কুল চলে আসলো ঘরে। ১০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই মহামারির পরিকল্পনা কাগজে-কলমে খুজে পাওয়া গেলেও , ২০২০ সালে নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে স্কুলের পাঠ পরিকল্পনা যথেষ্ট সময়পোযোগী হয়ে উঠলো না। তাই, সপ্তাহের শুরুতে স্কুল থেকে যে পাঠ পরিকল্পনা হাতে পেতাম তা কোনভাবেই ঘরে বসে শেষ করা সম্ভব হচ্ছিল না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নানা ধরনের শিখন-শিক্ষণ উপকরণের অভাব অনুভব করছিলাম । সামাজিক মাধ্যমে এখানকার মায়েরা একেক পর এক পোস্ট দিতে শুরু করলো, হোম স্কুলিং করাতে যেয়ে কার কী দুর্দশা সেটা উল্লেখ করে।

ভাগ্যের জোরে নাকি একদল শিক্ষকের কঠোর পরিশ্রমে জানি না, এই অপ্রস্তুত অবস্থার উন্নতি হলো অচিরেই। সপ্তাহখানিকের মধ্যেই পাঠ পরিকল্পনার আমুল পরিবর্তন ঘটলো। স্কুল থেকে বাচ্চাদের জন্য ল্যাপটপ, সাথে নানা শিখন-শিক্ষণ উপকরণ বাসায় চলে এলো। পাঠ পরিকল্পনা এমনভাবে লেখা হলো যেন অভিভাবকরা শিক্ষণ থেকে মুক্তি পায়, আর শিশুদের সাথে শিখনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ পড়ানোর সুযোগ কম, ছেলে/মেয়ের সাথে পড়ার সুযোগ বেশি। তাই লকডাউনে সবাই যখন ঘরে বসে বসে কাজের অভাবে বিরক্ত হচ্ছিল, আমি তখন মেয়ের সাথে কে.জি. ক্লাসের পড়া পড়ছি। আমার থিসিস আর তার পড়া দুটোই চলছে সমান তালে -২০ মিনিট কে.জি. ক্লাসের পড়া, ৩০ মিনিট পিএইচডি। এভাবে সকাল ৯টা থেকে ৫টা। মাঝে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতিতে মা আর মেয়ে নাকে মুখে গিলছি। বাসায় বসে স্কুলের যে কাজ করতাম, সেটার ছবি তুলে বা ভিডিও করে সময় মতো স্কুলে পাঠাতে হতো, তাই লম্বা বিরতি নেবার কোন সুযোগ ছিল না। একইসময়ে একদিকে আমি ডান হাতে গপাগপ মুখে ভাত ঠুসতাম, অন্যদিকে বাম হাতে চামচ দিয়ে মেয়েকে গেলাতাম। কয়েকমাসেই এই দুই হাতে খাওয়া এবং খাওয়ানোতে আমি বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেললাম।

ভালো কী মন্দ জানি না। দুইজনের পড়াশুনা তবু একভাবে চলছিল। যেটা একেবারেই চলছিল না সেটা হলো আমাদের খেলাধুলা। পার্কে কিংবা মাঠে যাবার আমাদের যে একটা অভ্যাস ছিল, সেটা হঠাৎ করে ছাড়তে পারছিলাম না। ততদিনে ঘরের পাশের পার্কগুলোতে প্লে গ্রাউন্ড ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। গা ঝাড়া দেবার জন্য ঘরের মধ্যে ডিগবাজি খাওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না। উপায় না দেখে একদিন মেয়ের বাবাকে সাথে নিয়ে বাসার গ্যারেজ পরিষ্কারে হাত লাগালাম। গ্যারেজ থেকে গাড়িটা বের করে রাস্তায় রাখার ব্যবস্থা করলাম, আর গ্যারেজের ভিতরে সুন্দর করে পপ আপ টেন্টটা আর আমার প্রিয় হ্যামকটা সেট করে নিলাম। সেই থেকে এই গ্যারেজই আমাদের পার্ক, বাইরের জগত, কখনো কখনো ক্যাম্প গ্রাউন্ড। পড়াশুনা শেষ করে আমি আর মেয়ে কিছুক্ষণ হ্যামকে দুলতাম, কিছুক্ষণ টেন্টে গিয়ে শুয়ে থাকতাম, গল্প করতাম, হেড়ে গলায় গান জুড়তাম। তখন এই সামান্য পরিবর্তন আমাদের জীবনে একটা বিরাট বিনোদনের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।

এভাবে ফেব্রুয়ারি, মার্চ গড়িয়ে এপ্রিল এলো। গৃহবন্দী জীবনের আমরা প্রায় মানিয়ে উঠেছি। এও বুঝেছি এই অবস্থার চটজলদি কোন সমাধান আসছে না। বিভিন্ন জায়গা থেকে মৃত্যুর সংবাদ আসছে। আমেরিকা, লন্ডন থেকে বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজনরা ফোন করে যেসব গল্প বলছে, তাতে মৃত্যুচিন্তা মাথায় ঢুকে গেলো। গলা একটু খুশ খুশ করলেই মনে হতো, তাহলে কি এবার আমার পালা? মৃত্যু মানুষকে যতোটা না কষ্ট দেয় তার থেকে অনেক বেশি কষ্ট দেয় মৃত্যুচিন্তা। মরার আগেই বার বার মরছিলাম সেই সময়ে। মৃত্যুচিন্তা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে ঠিক করলাম ১৪ এপ্রিল আমরা বাসায় পহেলা বৈশাখ পালন করবো। মরেই যদি যাই, হাসতে হাসতে মরবো।

এক শনিবারে বাজার থেকে রঙ্গিন কাগজ কিনে আনলাম, আর ১৩ তারিখ রাতে কাগজ কেটে ঘর সাজালাম। ঘর সাজানোর পর পরই মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে গেলো। পরদিন সকাল থেকে ব্যাস্ত হয়ে গেলাম বৈশাখের রান্না নিয়ে। বৈশাখের রান্না আমার কাছে সহজ রান্না, ডাল, ভাত আর ভর্তা। গরম ভাতের সাথে আলু, বেগুন, ডাল, ডিম ভর্তা করে মেয়েকে বললাম, “লেটস সেলিব্রেট বাংলা নিউ ইয়ার”। মেয়ে আমার বুঝে, না বুঝে মহা খুশি! সেদিন আমি বুঝলাম, বেঁচে থাকা মানে জীবিত থাকা নয় আর জীবনে সুখটা শুধু নতুন কাপড় কিংবা বড় রেস্টুরেন্টেও লুকিয়ে থাকে না। বেঁচে থাকা মানে হলো যতোক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ জীবনটাকে উপভোগ করা। জীবনটা নিজের মতো করে উপভোগ করার মধ্যেই সুখ।

ধীরে ধীরে অন্ধকার কেটে আলোর দেখা মিললো। ভয়ংকর মহামারীর প্রকটতা কমতে থাকলো আমাদের শহরে। কোভিডের প্রথম ধাক্কার এই শহরটাতে সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৪৫ জন আক্রান্ত হয়েছিল। লম্বা সময় লকডাউনের পর আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এলো। কিছুদিনের মধ্যে ঘরে পাঁচজন আর বাইরে ১০ জন একসাথে অবস্থান করা যাবে, এরকম একটা নির্দেশনা জারি হলো। তাই গৃহবন্দী জীবন থেকে আমাদের সামান্য একটু হলেও মুক্তি মিললো।

এদিকে শীত চলে এসেছে। এবার শীতে বরফ দেখতে পাহাড়ে যাবো অনেক দিক আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম। মনে মনে খুব খশি হলাম। বছরের শুরুতে ভেবেছিলাম এবারও যাওয়া হবে না, কিন্তু হঠাৎ অবস্থার উন্নতিতে নতুন করে বুকে আশা জমলো। মনে মনে খুব চাইলাম যেন অবস্থার আর অবনতি না হয়। পাহাড়ে বরফ দেখতে যাওয়ার এই পরিকল্পনা করছি প্রায় দুই বছর ধরে। যাই যাই করে যাওয়া হচ্ছে না। এবারও যদি যেতে না পারি, এই জীবনে আর যেতে পারবো কি না কে জানে।

আলোর মুখ বেশিদিন দেখার সুযোগ ছিল না আমাদের। কোভিডের প্রথম ধাক্কার পর দ্বিতীয় ধাক্কাটা যে এতো চটজলদি শুরু হয়ে যাবে তা বুঝিনি। দ্বিতীয় ধাক্কায় অস্ট্রেলিয়ার জনবহুল শহরগুলোতে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো এই ভাইরাস। ভাগ্যক্রমে আমাদের শহরটি আকারে বড় হলেও জনসংখ্যা তুলনামূলক কম। তাই দ্বিতীয় ধাক্কার ভয়াবহতা অন্য শহরের তুলনায় আমারা কম অনুভব করলাম। তবে বড় শহরগুলোর ভয়াবহ চিত্র দেখে এবার আর সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন হলো না। স্ব-ইচ্ছায় গৃহবন্দী জীবনে ফিরে গেলাম। তাই অন্য সবার ক্ষেত্রে বন্দী দশার উন্নতি ঘটলেও আমার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এদিকে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার অনেকগুলো নতুন নিয়মকানুন জুড়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সরকার স্কুল, অফিস খুলে দিয়েছে। মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, মেয়ের বাবা অফিসে যাচ্ছে। কিন্তু আমি পারতপক্ষে বের হচ্ছি না- স্থিতি জড়তার মতো এই গৃহবন্দী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি । সবাই চলে গেলে নিজের ঘরে দরজা চাপিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসে কাটিয়ে দিচ্ছি সারাটা দিন।

সব মিলিয়ে প্রায় আট মাস হতে চললো আমার এই বন্দী দশার। এই আট মাসে অনেক কিছু দেখলাম, জানলাম, শিখলাম। নতুন করে বেঁচে থাকতে, জীবন উপভোগ করতে শিখলাম। আর দেখলাম উন্নত দেশের মানুষ ঘরে বসে থাকলে বা কাজ না করলে দেশটার অর্থনৈতিক অবকাঠামো কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। চোখের সামনে ছোট থেকে মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলো। বড় বড় ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো লোক কমিয়ে ফেললো। একটা বিরাট জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে গেলো। অনেকের কাজের সময় কমে গেলো, বেতন কমে গেলো। সবচেয়ে বেশি বেগতিক অবস্থায় পড়লো এই দেশের অস্থায়ী বাসিন্দারা। অস্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে সিংহভাগই হলো শিক্ষার্থী যারা চাইলেও অর্ধেক পড়া ফেলে বাড়ি ফিরে যেতে পারছিল না আবার এখানেও কাজ নাই। দেশটির সরকার বেকার নাগরিকের দায়িত্ব এড়াতে পারলো না। বেকার ভাতা চলতে থাকলো, কিন্তু অস্থায়ী বাসিন্দাদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালো। ঘোষণা দিলো, ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষার্থীদের কোন দায়-দায়িত্ব তারা নিতে পারবে না। অস্থায়ী বাসিন্দা/শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা কোনভাবেই এখানে থাকা খাওয়া জোটাতে পারলো না, জীবনের বিরাট ঝুঁকি নিয়ে ফিরে গেলো নিজের দেশে।

যদিও অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার নির্দয় আচরণ করেছে এই অস্থায়ী বাসিন্দা/শিক্ষার্থীদের সাথে, কিন্তু এই দেশের মানুষ এবং স্থানীয় সরকার কিন্তু ততোটা নির্দয় হতে পারেনি। কমিউনিটি প্রতিষ্ঠান, ইউনিভার্সিটি, এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে যে যেভাবে পেরেছে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। কাজের ব্যবস্থা হয়তে করে দিতে পারেনি, কিন্তু বিনামুল্যে খাবার দেয়া, প্রয়োজনে থাকার ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে যার পক্ষে যতটা সম্ভব ছিল করেছে, এখনো করে যাচ্ছে। তবু অনেকের জন্যই দেশটির অর্থনৈতিক ধসের কবল থেকে বিনা আঁচড়ে বের হয়ে আসা বেশ কঠিন ছিল। আমি বলবো, অস্ট্রেলিয়া যতোটুকু সামলে উঠেছে তা ঐ ৫৬ পাতার করোনা মোকাবেলার পরিকল্পনা। বছরের শুরুতে এরকম একটা সময়োপযোগী পরিকল্পনা দেশটির করোনাকালীন দুর্যোগের ভয়াবহতা অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছে। আসলে সঠিক পরিকল্পনা আর সেটার সঠিক অনুসরণে করোনার মতো কঠিন দুর্যোগও যে সামাল দেয়া যায়, সেটা এই শহরে না থাকলে আমি বুঝতাম না।

পরিশেষে বলতে চাই, এই ক্ষুদ্র শক্তিশালী ভাইরাস থেকে মানবজাতি কবে মুক্তি পাবে আমার জানা নাই। তবে নানা গবেষণাপত্র ঘেঁটে আমি জানতে পেরেছি, স্প্যানিশ ফ্লুয়ের একটি সফল ভ্যাকসিন আসতে সময় লেগেছিল প্রায় ২০ বছর। আশা করা যায় বিজ্ঞান এখন আরও আধুনিক হয়েছে, তাই আমাদের হয়তো ২০ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। কিন্তু ঠিক কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে সেটাও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। যতোদিন সব কিছু স্বাভাবিক না হচ্ছে, আর আমার থিসিস লেখা চলছে ততদিন পর্যন্ত এই গৃহবন্দী জীবনই হয়তো আমার ‘নিউ নর্মাল’।

Sabrina Syed
PhD Candidate
University of Newcastle
Newcastle, NSW
Australia

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.