দম আঁকড়ে আছি, দম আঁকড়ে বাঁচি

ফাহমিদা জেবীন:

সম্ভবতঃ আব্বা আমার নাম রেখেছিলেন ‘ফাহমিদা’। যার অর্থ নাকি ‘বুদ্ধিমতি’। সম্ভবত বলছি কারণ এতো বছর পর আব্বাও কনফিউজ্ড। যাই হোক এ নিয়ে পতিদেব প্রায়ই (অনেকটা খোঁচা মেরেই) বলেন, তোমার নামের অর্থই তো বুদ্ধিমতি, তাই তোমার সব কাজে বুদ্ধিমত্তার ছাপ থাকতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় বহুবার আমি নিজের ঢোল নিজে পিটাতে গিয়ে বলতাম- “ফাহমিদা নাম দেখেই আমি এতো বুদ্ধিমান বুঝলি?”
বলতে না বলতেই আমার ভুল শুধরে দিয়ে দু’একজন বন্ধু বলে উঠতো, “আরে ব্যাকরণে ভুল, তুই কি বুদ্ধিমান নাকি বুদ্ধিমতি?” তৎক্ষণাৎ ওদের চুপ করিয়ে দিতে প্রসঙ্গটাই পাল্টে দিতাম। পরক্ষণে মনে মনে ভাবতাম বুদ্ধিমত্তার বাহক হবার বেলায়ও কেন এই জাতের (নারী-পুরুষ) প‍্যাঁচ? সেই থেকে আজ অবধি আমার বদ্ধমূল ধারণা কোথায় যেন এই বিষয়গুলো ইন্টাররিলেটেড হয়ে নারীকে অবলা ভাবের দিকে ঠেলে দেয়।

বেশ ক’দিন আগে জীবনবোধে ইরিত্রা মেহেরিন এর লেখা নারী সম্পর্কিত একটা পেইজ থেকে আমার নজর কাড়ে। লেখাটি ছিল অনেকটা এরকম- মেয়েরা খুব সস্তায় অন্যের ভালোলাগায় নিজের সত্তা হারায় তরল গতিতে। আর এটাই নাকি তাদের অবলা সেজে উঠার অন্যতম কারণ। কথাটির সাথে আমিও সহমত। আসলেই পার্টনারের (স্বামী-প্রেমিক) রঙে রঙিন হতে গিয়ে আমরা অজান্তে নিজেরাই নিজেদের হারিয়ে ফেলি। এটা ততদিন ভালো চলে, যতদিন পর্যন্ত অপরপক্ষের রেস্পন্স ভালো আসে। রেস্পন্সের ক্ষেত্রে তারতম্য তথা সমস্যা দেখা দিলে তখনই মূলতঃ শুরু হয় অর্ন্তদহন; দানা বাঁধে হাজারও অনুযোগ, অভিযোগ আর অসন্তোষের।

আমি তোমার জন্য কী করি নাই, তার বিনিময়ে তুমি কী করেছো?
তোমার সংসার করতে গিয়ে ক্যারিয়ার শেষ।
বাপের বাড়িতে এক গ্লাস পানিও ঢেলে খাইনি। আর এখন কিনা…
সব স্বপ্ন পানিতে ফেলেছি তোমার জন্যে।
তোমার জন্য আমি……………(এন্ডলেস)।

এ অধ‍্যায় শেষ হতে না হতে সন্তান আসার পর সন্তানটিকে মাথায় রাখি না উঁকুনে কামড়াবে, মাটিতে রাখি না পিঁপড়া কাটবে। গায়ে যেন এলার্জি না হয় তাই গোসলটাও করাই ফিল্টারের পানি দিয়ে। এভাবে তাকে অতি থেকে অতি যত্নে বড় করতে গিয়ে সে প্রায় অর্ধেক পঙ্গু বনে যায়। তার বয়সী সবাই যা যা অনায়াসে করে ফেলে, সেটার ধারে কাছেও যায় না সে। নিজের বই খাতা গোছানো, গোসল তো দূরে থাক, এক গ্রাস ভাতও নিজের মুখে পুরতে অক্ষম সে। তখন আচমকা অবচেতন অবস্থা হতে চেতনে এসে-

পঙ্গু হচ্ছিস, এখনও নিজের হাতে ভাতও খাওয়া শিখলি না?
তোর জন্য চাকরিটাও করতে পারলাম না।
ঘরে বসে বসে পঞ্চাশ থেকে নব্বই কেজি হয়ে গেছি।
না খেয়ে তোকে খাওয়াই, তারপরও মানুষের বাসায় গিয়ে খাই খাই করিস।
তোর জন্য আমি……………… (এন্ডলেস)।

কিন্তু কেন? কেন অমন শ্বাসরুদ্ধকর অভিযোগ নিয়ে ‘দায়িত্ব’ আর ‘ভালোবাসার’ প্রতিমূর্তি হয়ে আমরা তাদের মধ্যে বাঁচতে যাই? কেন ঝরঝরা ভাবে বাঁচি না? আপনি জব ক্যারিয়ার সব ছাড়েন, তবে তা হওয়া চাই নিজ দায়িত্বে। আর সন্তানটিকে বেড়ে উঠতে দিন অন‍্য দশটি শিশুর মতো স্বাভাবিক গতিতে। তার জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ (খেলনাসামগ্রী, খাদ্য) সব বাদ দিয়ে সে একটু-আধটু ব্যথা পাক, কাঁদুক, হাসুক, খেলুক, সবার সাথে মিশুক। তারপর তার শিক্ষাজীবন শুরু হলে কখনোই তাকে এই আশ্বাসে আশ্বস্ত করা উচিত হবে না যে তাকে প্রয়োজনে জায়গা-জমি বিক্রি করে হলেও উচ্চতর ডিগ্রী হাসিল করতে সহায়তা করা হবে। কারণ আপনি সর্বস্ব বিনিময় না করলেও এক্ষেত্রে সে হয়তো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট হাসিল করতে পারবে না ঠিক, কিন্তু বিশ্বাস করুন অশিক্ষিতও থেকে যাবে না। কোথাও না কোথাও, কোন না কোন সাবজেক্টে নিজের জায়গা সে ঠিক করে নেবে। সবাই করে নেয়।

এই প্র্যাকটিসগুলোর মধ্য দিয়ে আপনার সংস্পর্শে অপরপক্ষটি হালকা বোধ করবে আর আপনার মাঝেও থাকবে না কোন গ্লানি। তাদের জন্য আপনি যা-ই (বুঝে না বুঝে) করেন না কেন অনাকাঙ্খিতভাবে একটা অবাঞ্ছিত সময় ঠিক এসে যায়, যেখানে আপনাকে শুনতেই হয়, “কে বলছিল এসব করতে?” আর তখন এই সিম্পল একটি বাক্যই আপনার মাথার উপর থেকে আকাশ আর পায়ের নিচ থেকে মাটি একটা হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিতে যথেষ্ট। তবে এক্ষেত্রে যদি আপনার উপর বিধাতার অশেষ কৃপা থাকে তাহলে নাও শুনতে হতে পারে। তবে মনে মনে হলেও যে বলবে এটা নিশ্চিত এবং বলাটাই অতি স্বাভাবিক। আর তখন বেলাশেষের খেলায় আকাশ-বাতাস ভারী করা ঐ দীর্ঘনিশ্বাসগুলো পুড়িয়ে ফেলতে খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে আপনি হন্য হয়ে একটি ছোট্ট দিয়াশলাই খুঁজে বেড়াবেন। So, you have to honour yourself when you need a moment for yourself.

এখানে বলা ভালো, ঝরঝরা থাকার অর্থ এই নয় যে, আপনি সমস্ত দায়িত্ব এড়াবেন। ‘অতিরিক্ত’ শব্দটিকে বাদ রেখে সমস্ত দায়িত্বই করা সম্ভব। চার অক্ষরের এই শব্দটির জন্যই মূলতঃ আমাদের ভেতরবাড়িতে জন্ম নেয় এক অতিরিক্ত রিটার্ন পাবার বাসনা। যা বহুক্ষেত্রে বাসনাই থেকে যায়। কারণ আমাদের গল্প, উপন্যাস সর্বোপরি পরিবারেই অবধারিত কিছু অলিখিত নিয়ম চালু রয়েছে। যেমন স্বামী রাত দশটার পর ঘরে ফিরে স্ত্রীর কাছে ভাত চাইবে আর স্ত্রী নিজ হাতে স্বামীর প্লেটে ভাত তুলে দিয়ে বড় মাছের মাথা/মুরগীর রান কিংবা বড় মাছের টুকরাটিও তার প্লেটে তুলে দেবে। খাওয়া শেষে ঘুমাতে গিয়ে স্বামীটি স্বপ্ন দেখে তার স্ত্রী শাড়ি, চোখে কাজল, লিপস্টিক আর পায়ে নূপুর পরে আছে। এসব স্বপ্ন আর নিয়মের ইনফ্লুয়েন্স পেয়েই বেড়ে ওঠে সে। কখনও উচ্চশিক্ষা, চাকরির জন্য বিদেশগামী স্ত্রীকে এয়ারপোর্টে সি-অফ করছে কিংবা আর্মি অথবা নেভীর পোষাক পরিহিত অবস্থায় দেখে না। দেখে না স্ত্রীকে ভার্সিটি পৌঁছে দিচ্ছে, কিংবা রাত জেগে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে সহযোগিতা করছে।

একটা নরম, কোমল ভেদামাছ সর্বোপরি লইট্টামাছ টাইপ বউ-ই চায় সে। কঠোর নীতিতে অটল, জেদী, যুক্তিতে চোখ বাঁধা মেয়েকে কে চাইবে বলুন? ক’টা পুরুষ পারে নারীর ব্যক্তিত্বের সামনে বিচূর্ণ হতে; স্ত্রীর যুক্তির কাছে হাসিমুখে হেরে যেতে! সংখ্যায় দুই শতাংশ হবে কি? এই শতাংশ দুই অথবা তিন যাই হোক না কেন এক বৃহৎ গোষ্ঠীর তুলনায় তা খুবই নগণ্য। আর এই নগণ্য অংশের জন্যে পারিবারিক, সামাজিক সিস্টেমের পাশাপাশি আমাদের নমনীয়তা, কমনীয়তা, চির অবলা ভাব আর রিটার্ন পাবার অতি আকাঙ্খা কতটা দায়ী তা আমরা নিজেরাও জানি না। তাই সময়ের দাবি মেনে জেনে নেয়াটা খুব খুব খুবই জরুরি।

আমাদের সমাজে যেখানে ছেলেরা পরিচিত হয় তার নিজের বা বাবার স্ট্যাটাস দিয়ে, সেখানে একটা মেয়ের পরিচয় হয় তার স্বামীর স্ট্যাটাস দিয়ে। এছাড়া এই সমাজে একটা সিঙ্গেল মেয়ের একক জীবন-যাপন শুধু কঠিনই না; প্রায় অসম্ভব। তাকে কেউ বাড়িভাড়া দিতে চায় না, চাকুরির ক্ষেত্রে সুবিধা করতে পারে না। বদলী-প্রমোশন ক্ষেত্রে হাবুডুবু খায়, হেনস্থা হয় অফিস-আদালত সর্বত্র। মেয়েটি একা ঠিকঠাক সবকিছু সামলিয়ে চললেও এ নিয়ে বন্ধু, পরিবার-পরিজন কেউ উৎসাহ তো দেয়ই না, বরং এমন আচরণ করে যে, সে যেন একা থেকে পুরো সমাজটাকেই কলুষিত করছে। আরও একটা ব্যাপার দ্বিধাহীনভাবেই বলছি, সেটা হলো সিঙ্গেল মেয়েকে এ সমাজের কতিপয় পুরুষেরা ‘সরকারি সম্পত্তি’ মনে করেন। তবে এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার অবকাশ মূলত: এখানে নেই। শুধু বলতে চাই এ ট্যাবুগুলোর মধ্য দিয়ে একটা মেয়ে অন্যের খেয়াল-খুশির বাহক হবার ঠিকাদারি নিয়ে নেয়। যা অচিরেই ভেঙ্গে চুরমার হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের সমাজ আদৌ এ ট্যাবু ভাঙতে চায় কিনা এ বিষয়ে আমি বেশ সন্দিহান!

সবাই দুর্বলকে ভালোবাসতে ভালোবাসে। কিন্তু দুর্বলকে ভালোবেসে আদৌ কোন কৃতিত্ব আছে কি? অবশ্য সবলকে ভালোবেসে পোষ মানানোর জন্য উক্ত পুরুষকে সত্যিকার অর্থে যোগ্য, বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ও বিবেকবান হতে হয়। এমতা গুণসম্পন্ন পুরুষ বাছাইয়ে আমরা ভুল করে ফেলি। নিজেই নিজের সর্বসবলতার মূলোৎপাটন করে দূর্বলতা দিয়ে মনের মানুষটিকে আকর্ষিত করি। অতঃপর দিন শেষে আমরাই কিন্তু অবধারিত অগ্নিপরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। কারো কারো জন্য এমনও সময় আসে যেখানে দাঁড়িয়ে রক্তের অতি আপনকেও পাশে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। যে পরিবার হতে পারে শক্তি, ব্যর্থ দিন পার করার খুঁটি সেখানেও অচেনা বনে যেতে হয়। ঠিক ঐ মুহূর্তে ভেতরকার ‘দম’ হতে পারে অনেক বড় একটা পুঁজি। সেই কাঠগড়ায় অবস্থানরত আপনার জন্যে অনেক সময় শিক্ষাও হয়ে যায় অর্থহীন। কেননা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সার্টিফিকেট সর্বস্ব হওয়ায় আমরা সাক্ষরসম্পন্ন হলেও আলোকিত মানুষ হবার তাগিদে আমাদের কাঁখের কলসি ফাঁকা। তাই কিছু থাকুক আর না ই থাকুক; সবকিছু ছাপিয়ে থাকা চাই ‘দম’; ঠিক এরকম-

হাজারও কথার কচকচানি কানে না তোলার দম।
বিফল আর ব্যর্থ সময়ে অপমান-অপবাদ গায়ে না মাখার দম।
উট পাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে থেকেও নিজ সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার দম।
না মানে না- বলার দম।

কঠিন থেকে কঠিন সময়ে এই দমটাই পুঁজি। যার আসল আর সুদের হিসাব না মিললেও আগাগোড়া মোড়া অন্যের আঙ্গুলের ইশারার বলয়ে আটকা পরবেন না নিশ্চিত।

শেয়ার করুন:
  • 544
  •  
  •  
  •  
  •  
    544
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.