পিডোফাইলদের থেকে শিশুদের রক্ষা করুন

শাহমিকা আগুন:

সাকিব কন্যা নিয়ে বেশ কথা হচ্ছে। পিডোফাইল নিয়ে কিছু কথা বলতে ইচছে হলো।

আমি কাজ করি শিশু নিয়ে। সেটা শিশুদের নিয়ে এবং বড়রা যখন শিশু ছিল তখন তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা নিয়ে তা তাদের জীবনকে তছনছ করে দেয়। বেশ ক’বছর আগে কাজ করেছি লোকাল কাউন্সিলের সোসাল সারভিস এর সাথে ফ্রিল্যান্স পুষ্টিবিদ হিসেবে এলকোহলিক ও ড্রাগ এডিকট বাচ্চাদেরকে স্বাস্হ্যকর জীবনে ফেরত আনতে। সোশ্যাল সার্ভিসে কাজ করতে হলে কিছু বাধ্যতামূলেক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। তখন কিছু প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম ছিল একটি শিশু শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার কিনা তা কীভাবে বুঝে নিতে হবে, কারণ শিশুরা বলতে পারে না। আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশিক্ষণ ছিল পিডোফাইল কিভাবে চেনা যাবে। আমাদের দেখানো হয়েছিল অনেক নির্যাতিত শিশুদের ছবি, ভিডিও, নির্যাতনের ধরন। সে সময়টাতে আমার ছেলের মাত্র তিন বছর বয়স, আবার আমি কাজ করছিলাম বীরমাতা বীরাঙ্গনাদের জন্য। আমি আর নিতে পারছিলাম না। বাসায় এসে প্রচুর বমি করলাম। পিডোফাইল শব্দটির বর্বরতার গভীরতা যে কত বেশি, তা বুঝে ভেতরটা হিম হতে থাকলো। এরপর কাজের প্রয়োজনে বেশ কবার ট্রেনিং নিতে হয়েছে। বাংলাদেশে এমন কোন প্রশিক্ষণ আছে কিনা জানা নেই।

বহুল আলোচিত ওই ছবিটাতে একটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে। হাসছে ঠোঁট টিপে। সারা শরীর লম্বা জামা দিয়ে ঢাকা। তাতেই যে মন্তব্য এসেছে তা নিয়ে সবার টনক নড়েছে। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি, তাহলে আমি প্রথম ছবি এবং চার নম্বর ছবির মন্তব্যে তেমন কিছু খুঁজে পাচছি না। তাদের নিয়ে মানুষ খেপেছে শুধুমাত্র ‘পাটক্ষেত’ শব্দটি দেখে। পাটক্ষেত আমাদের কাছে সিমবলিক। বাংলাদেশী মাত্রই জানে পাটক্ষেতে একা গেলে কী হতে পারে! বাকি ছবির মন্তব্যগুলো ইংগিতপূর্ণ এবং এরা সন্দেহের তালিকায় চলে আসে।

একটি বিষয় হলো, এরা সবাই সূর্যমুখি বাগানকে পাট ক্ষেত দেখেছে। মানুষের মস্তিষ্ক তাকে তাই দেখায়, যা সে দেখতে চায়। একটি শিশুর একা ছবি দেখে এরা সরল শিশুতোষ সৌন্দর্য দেখেনি। ওরা শিশুটিকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছে। নিজের থেকে অথবা অন্য থেকে সেটা তো কথা না বলে বোঝা যাবে না। কেউ শিশুটিকে সেখানে শোয়া অবস্থায় কল্পনা করেছে। পিডোফাইলদের জন্য সবচেয়ে কঠিনতম সত্য হচ্ছে তারা বেশিরভাগই ছোটবেলায় নিজেরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। মানুষ ০-৭ বছরের মধ্যে তার অবচেতন মনে তৈরি হওয়া প্রোগ্রামিং থেকে পারতপক্ষে বেরুতে পারে না, ফলে সে বড় হয়ে তাই করতে থাকে, যা তার সাথে সে হতে দেখেছে।
তাই বলে কি এদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে? একেবারেই না।

বাংলাদেশে সবাই ভাবছে এই নোংরামি শুধু বাংলাদেশেই চলে। না। মোটেই না। ইউকে, ইউএসএ, ইউরোপে আরও বেশি চলে। পৃথিবীতে বিনা পুঁজির সবচেয়ে বড় ধান্ধা হলো শিশুদেরকে যৌন কাজে বিক্রি করা এবং যৌন কাজে ব্যবহার করা। শুধুমাত্র ইউএসএ’তেই আছে ৬৬০০০ শিশু পর্নো সাইট।
– কে এই সাইট প্রমোট করে? – গুগল।
কারা আছে এসব সাইটে?
– আইনজীবী, ব্যারিস্টার, শিক্ষক, সেলিব্রিটিসহ সব পেশার লোকজন। মাইকেল জ্যকসনের মতো এতো বড় শিল্পীও পিডোফাইল ছিল। ওয়েড রবসন এবং জেমস সেফচাক বড় হয়ে তাদের ওপর মাইকেল জ্যাকসনের করা যৌন নির্যাতন নিয়ে প্রকাশ্যে সরব হয়েছে। মাইকেল জ্যাকসন মরে গিয়ে বেঁচে গেছে গণরোষের হাত থেকে।

বাংলাদেশে অনেকে ঘেটুপুত্র কমলা দেখে লিখেছেন যে, সিনেমায় একটা শিশুকে যৌন কাজে ব্যবহার করা দেখানো হচ্ছিল, কিন্তু এতো সুন্দর করে দেখানো হয়েছিল যে, একেবারের জন্যও মনে হয়নি শিশুটির ওপর এমন হওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। কথা সত্যি। একজন পিডোফাইল তো শিশু যৌনতায় কোন রকম নোংরামি দেখে না। দেখলে সে শিশুদের সঙ্গে এরকম ঘৃণ্য কাজ করতে পারতো না। সিনেমায় শিশু শরীরের সঙ্গে যৌনতার সুখ খুব শৈল্পিকভাবে দেখানো হয়েছে, আর সবাই ওয়াও বলে বাহবা দিয়ে গেছে।

আমার কাজের অনেকগুলো বিষয় আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জীবন্মৃতো, আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষগুলোর ট্রমা রিলিজ করে আবার জীবনের পথে ফেরত আনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চলে আসে ছোটবেলার সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের কথা। নিজের মামা, চাচা, ভাইবোন থেকে শুরু করে বান্ধবীর বাবা, ভাই, শিক্ষক, পাড়ার ছেলে, কাজের লোক, লেবার, কে না আছে এসব নির্যাতকের তালিকায়। ভাববেন না শুধু মেয়ে শিশুদের সঙ্গেই এমন হয়েছে। ছেলে শিশুদেরকে যৌন নির্যাতন এর পরিমাণ আরও বেশি। শিশু শিশুই। ছেলে বা মেয়ে এখানে বিষয় নয়।

আমি সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিলাম আমার এক ইংরেজ রোগীর সেশনে। সবাই ওঁকে পাগল বলে। সে নিজেও নিজেকে ঘৃণা করে। তার অতিরিক্ত রাগ বা আনপ্রেডিকটেবল ব্যবহারের আসল কারণ পাওয়া গিয়েছিল, সে আট বছর বয়সে বাবাকে হারায় হঠাৎ করে। সান্ত্বনার জন্য বান্ধবীর বাড়ি নিয়ে যায়। ছোট বাচ্চা। বান্ধবীর বাবাকে আঁকড়ে ধরে বাবার মতো করে। বান্ধবীর বাবা তাকে সুযোগ পেয়ে যৌন নির্যাতন করে। ছোট মেয়েটির সামনে চৌঁচির হয়ে যায় পৃথিবীর সব বিশ্বাস। সে কখনও জীবনে কোন ধরনের সম্পর্কে জড়াতে পারেনি। কে কী মনে করবে ভেবে ভয়ে কাউকে বলতে পারেনি কী করেছিল সেই লোকটা তার সংগে! আমার আধ্যাত্মিক শিক্ষক তার বাবার দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে গর্ভধারণ করে তের বছর বয়সে পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। মারা যায়নি। কিন্ত পঁয়ষট্টি বছর বয়সেও একা আছে। একটা বিড়াল তার সঙ্গী।

শিশু যৌন নির্যাতনের ঘা সারাজীবন ধরে চলতে থাকে। শিশুটি হয়ে পড়ে অতিরিক্ত ভীত বা নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে, হঠাৎ করে বিছানায় পেশাব করে দেয়, বা আরও বেশি কৌতুহলি হয়ে পড়ে যৌনতার বিষয়ে। বা খুব রাগী আর জেদি হতে শুরু করে। একটা কোমলমতি শিশুর জীবন, মানুষের সঙ্গে তার সহজাত সম্পর্ক গড়ে তোলার দক্ষতা সবকিছু ধ্বংস করে দেয়।

আমি জানি না নিজের শিশু সন্তানের প্রতি সম্ভাব্য পিডোফাইলদের মন্তব্য দেখে বাবা হিসেবে বা সেলিব্রিটি হিসেবে বা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সাকিব আল হাসান কোন ধরনের উদ্যোগ নেবেন কিনা, নাকি মুখে কুলুপ লাগিয়ে বসে থাকবেন যেন তার ইমেজ না নষ্ট হয়ে যায় জনগণের কাছে। যদিও তার স্ত্রী শিশির এরই মধ্যে বয়ান দিয়ে ফেলেছেন এই বলে যে হাজার হাজার ভালো মন্তব্যের মধ্যে মাত্র চারটা খারাপ কমেন্টে তাদের কিছু যায় আসে না!

আসলে যার যেখানে ব্যবস্থা নেয়ার, তা সময়মতো নিলে, অনেক সহজেই কঠিন সমস্যা দানা বাঁধার আগেই রুখে দেওয়া সম্ভব।

তাই বলছিলাম যে পিডোফাইলদের চিনুন, চিনতে শিখুন এবং এদের ধরন বুঝুন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.