আমরা এতো বিকারগ্রস্ত কেন?

জিন্নাতুন নেছা:

আচ্ছা আমরা জাতি হিসেবে কেন এতো সেক্স বিকারগ্রস্ত বলুন তো! মাথায় সারাক্ষণ যৌনাঙ্গ এবং পুরুষাঙ্গ, এর বাইরে কোন কিছুই চিন্তা করতে পারি না। এতোদিন বাসে, ট্রামে, রাস্তায় কোন নারীকে দেখলেই লিঙ্গ দাঁড়িয়ে যেতো। আর এখন ফেইসবুকে কোন নারীর ছবি দেখলেই একই ঘটনা ঘটে। আর সাথে সাথেই সেই লোলুপ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় কমেন্টের মাধ্যমে। যার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ছোট্ট শিশুরাও। মাঝে মাঝে মনে হয় এই আমরাই কী করে এই ধরনের পুরুষের সাথে একই পরিবারে বসবাস করছি, যারা কিনা আমাদেরই বাবা, আমাদেরই ভাই, আমাদেরই আত্মজ কিংবা আমাদেরই স্বামী!

হ্যাঁ, আমি এই ধরনের-ই বলছি! হ্যাঁ বলছি! তার কারণ হলো এই আমাদেরই বাবা/ভাই/স্বামী/আত্মজ এরাই অন্য কোন নারীর নিকট এরকম বিকারগ্রস্ত কোন পুরুষ!

ফেইসবুক জুড়ে সাকিব কন্যার সূর্যমুখী বাগানের ছবি আর তার নিচেই কিছু বিকারগ্রস্ত পুরুষের জঘন্য কমেন্ট আমাকে এমন ভাবনায় ভাবাচ্ছে।
আর মা হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বোন হিসেবে আমাকেই কেন যেনো বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে!
সত্যিই তো একজন ছোট ফুটফুটে শিশু, তার বয়স আর কতই বা হবে! একজন পুরুষ কতটা সেক্সিস্ট মানসিকতার হলে এরকম কমেন্ট করতে পারে, আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না!

ইদানিং ভার্চুয়াল ধর্ষণ বেড়ে গেছে বহুগুণ। আপনি ফেইসবুক, ইস্ট্রাগ্রাম কিংবা অন্য যেকোনো মাধ্যমে ছবি পোস্ট করলেই একদল আছেন যেন কোথাও লুকিয়ে থাকে তাদের স্বরূপ বুঝিয়ে দিতে! কিন্তু কেন! এইটা কি শুধুই তাদের সেক্সিস্ট লোলুপ দৃষ্টিভংগির বহিঃপ্রকাশ? নাকি পুরুষতান্ত্রিক চর্চার আস্ফালন! আমি তো বলবো দীর্ঘদিন ধরে মগজে সেঁটিয়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিকতার চর্চা এগুলো! জানান দিতে চায় আমরা পুরুষ! আমাদের লিংগ আছে! আমরা তা দিয়ে তোমরা নারী, তোমাদের যা ইচ্ছে তাই করতে পারি! ছি! কী হীন!
তাদের এই মানসিকতার বৈধতা দানের জন্য আবার নারীর চরিত্র নিয়ে ও টানা হেঁচড়া করতে কুন্ঠাবোধ করে না। নারীর পোশাক ছোট। নারী জিন্স, টিশার্ট পরিধান করে। রাত ১২ টায় রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে। সিগারেট ফুকায় কিংবা মদ পান করে। তাই নারী খারাপ! তাই নারী বেশ্যা! আরে নারী বেশ্যা নয়, বেশ্যা তোদের মত পুরুষের মগজ।

আচ্ছা সাকিব কন্যাকে নিয়ে সমস্যাটা কোথায় হলো? নিষ্পাপ, ফুটফুটে একজন শিশু। খুব সাধারণ একটা ছবি, সূর্যমুখী বাগানে। দেখলেই মনটা ভরে যায়। কিন্তু কিছু তথাকথিত ধার্মিক থেকে শুরু করে ছাত্র পর্যন্ত যাদের কিনা মাথায় সেক্স ভর করেছে ফুটফুটে শিশুটির ছবি দেখে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন কমেন্টের মাধ্যমে। এখন কী দিয়ে বৈধতা দেবেন আপনাদের এই লোলুপতার পুরুষগণ!
চারিদিকের এতো বিকারগ্রস্ত পুরুষ দেখে ছেলে সন্তানের মা হিসেবে আমাকে খুব ভাবাচ্ছে!ভয়ে কুকড়ে যাই মাঝে মাঝে আমি।কারণ এই পুরুষগণই তো কোন না কোন মা-বাবার সন্তান তাই না!
অভিভাবক হিসেবে এই ধরনের সন্তানের দায়ভার এড়াতে পারি না আমরা, ঠিক তেমনই রাষ্ট্র ও এড়াতে পারে না এই ধরনের পুরুষের বিকারগ্রস্ততার দায়ভার।

আশার কথা হলো সাকিব কন্যার ছবিতে এই ধরনের মন্তব্য করা পুরুষতান্ত্রিক পুরুষদের ঢাকা পুলিশ বাহিনী খুঁজছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। যদিও হয়তো আইন কেবল সেলিব্রেটিদের জন্য। কিন্তু তবুও বিচার হচ্ছে, কিংবা হবে। এটাই বা কম কিসে!

তবে সমাজের এই ধরনের বিকৃত মানসিকতার কেবল আইন দিয়েই দমন করা সম্ভব নয়। আইনের পাশাপাশি ঘরে ঘরে সন্তাদের মানবিকতার শিক্ষা দিতে হবে। নারী যে কোন বিশেষ কিছু না, বরং নারী এবং পুরুষ দুজনেই মানুষ, দুজনেই সমান, একই, শুধুমাত্র লিংগীয় বিভাজন ব্যতীত কোন পার্থক্য নেই, তা ছোট থেকেই সন্তানদের শিক্ষা দিতে হবে। সঠিক সেক্স এডুকেশন দিতে হবে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই। শিক্ষা ব্যবস্থায় সেক্স এডুকেশন অতিসত্ত্বর যুক্ত করতে হবে। তাছাড়া আপনার আমার সন্তানরা একটু বড় হলেই সস্তায় চায়না স্মার্টফোন কিনবে, আর নারীর ছবিতে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করবে আর পর্নোগ্রাফি দেখবে।।

লেখক পরিচিতি: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.