মগজে যখন পাটক্ষেত আর সূর্যমুখী ক্ষেত একই

মিনাক্ষী রশীদ:

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের এই দেশে পুরুষদের অনুভূতি বোঝা দায়। নারীকে দেখে তাদের ধর্মানুভূতি হবে, নাকি যৌনানুভূতি হবে, আগে থেকেই ধারণা করা মুশকিল। কখন কাকে পর্দা পরাবে, আর কখন কার পর্দা খুলবে, সেটাও তাদের সুবিধাজনক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। এই সুবিধাবাদি বিকৃত রুচির ধর্মান্ধ কীটগুলোরই সাকিব আল হাসান এর বৌকে দেখলে পর্দার কথা মনে পড়ে, আর শিশুকন্যাকে দেখলে পর্দা খোলার কথা মনে হয়।

পাটক্ষেত নাকি সূর্যমুখীর ক্ষেত, সেটা মুখ্য বিষয় না। একটা শিশুকে নিয়ে সর্বোপরি একজন মানুষকে নিয়ে কেন এমন মন্তব্য হবে এবং সেটা দিনের পর দিন? অবশ্য প্রযুক্তিগত উন্নয়নের নামে কোটি কোটি মানুষের হাতে স্বল্পমূল্যে তুলে দেয়া হয়েছে মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট। ‘বানরের গলায় মুক্তার মালা’র মতোনই শোভা পায় এখন মোবাইল ফোনগুলো। তো, সেই মোবাইল ফোনের যে যথেচ্ছ ব্যবহার হবে, তা বলাই বাহুল্য। একটা জাতিকে প্রয়োজনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত না করে ছাড়া গরুর মতোন মাঠে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর এর ভয়াবহ পরিণাম ভুগছে শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধারাও।

খুব অল্পতে ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে আমাদের ফেইসবুকীয় সমাজপতিদের। একচুল পরিমাণ কথার এদিক ওদিক হলেই আয়মান সাদিক, তসলিমা নাসরিনদের মাথার দাম ধার্য করা হয়, জাফর ইকবাল স্যারকে নাস্তিক উপাধি দেয়া হয়, কিন্তু এই সমস্ত কীট যে দিনের পর দিন সমাজ দূষিত করছে, ধ্বংস করছে সেটা তাদের কোন অনুভূতিতেই নাড়া দেয় না।

পৃথিবীতে পুরুষ জীবিত থাকবে, আর শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে নারী ধর্ষণ হবে না, নারী নির্যাতন হবে না, সেটা অবশ্য কল্পনাতীত। নারী পর্দা করেও ধর্ষণের শিকার হয়, না করেও হয়। শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়, হয় বৃদ্ধাও। আলোতে বের হলেও হয়, অন্ধকারেও হয়। আসমান, জমিন, জল সব জায়গাতেই সবসময়ই হচ্ছে।

করোনার কারণে পুরুষ যতদিন ঘরে ছিল ততদিন নির্যাতনের চাপটাও ঘরে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি ছিল। করোনা হেল্প লাইন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গ্রুপগুলোতে চলেছে পুরুষ কর্তৃক মানসিক ধর্ষণ ….

অথচ কোন পুরুষ যদি তার মায়ের বয়সী, দাদীর বয়সী, বোনের বয়সী, মেয়ের বয়সী, সবচেয়ে কনিষ্ঠ মেয়ের বয়সীকে ধর্ষণ করলে যত না অপরাধ হয়, তার চেয়ে কোন নারী যদি বাপের বয়সী কাউকে প্রয়োজনে কান ধরায় সেটা অনেক বড় অপরাধ হয়। কারণ এই দেশে নারী শরীরের চেয়ে পুরুষের কানের মূল্য বেশি। আর তাই তো ধর্ষণের বিচারেও সব দোষ পড়ে নারীর পোশাকে, নয়তো নারী স্বাধীনতায়।

২০২০ এ পুরুষ সকল পর্দানশীল হয়েছে এবং ঘরে থাকছে বেশি, তাই তুলনামূলক ধর্ষণও কমেছে। এখন যেগুলো হচ্ছে সেটা ‘বেপর্দা পুরুষ’, ‘বিধিনিষেধ না মানা পুরুষ’ এর কারণে।

তাহলেই বোঝা যায় পর্দা করা আর ঘরে থাকার রীতি কাদের জন্য প্রযোজ্য! কাদের চোখে সমস্যা, কাদের মনে, কাদের শরীরে সমস্যা? তো, সেই চোখ আর শরীরগুলো ঢেকে দিলেই তো কেল্লাফতে। শুধু শুধু নারীকে আলগা কাপড় দিয়ে বন্দী করা কেন?

যুগ যুগ ধরে যেসব রীতিনীতি দিয়ে নারীদেরকে বাঁধা হয়েছে, সেসব দিয়ে যদি পুরুষদেরকে বাঁধা সম্ভব হতো, তাহলে ওদের মস্তিষ্কে পাটক্ষেতের পরিবর্তে অন্তত সূর্যমুখীর ক্ষেত পাওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.